- ঝুঁকিপূর্ণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা
বছর বছর বন্যা, নদীভাঙনের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিলীন হয়ে যায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘর-বসতি। নতুন চরে বসতি গড়ে উঠলেও তা কয়েক বছরের বেশি স্থায়ী হয় না। এমন চিত্র বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলে। চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে প্রধান বাধা, এখানকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা।ফলে সামান্য জ্বর বা পেটের পীড়া, অনেক সময় হয়ে পড়ে মৃত্যুর কারণ।
চরাঞ্চলের বাস্তবতা : ২০২৩ সালে এলসেভিয়ার প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামোর বড় ঘাটতি আছে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চলে। অন্যদিকে এমসিপি ডিজিটাল হেলথের তথ্য মতে, বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও শহরের তুলনায় তাদের স্বাস্থ্যসেবা খুবই সীমিত। এমন বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে চরবাসীর ভাগ্য উন্নয়নের উদ্দেশ্যে ফ্রেন্ডশিপের যাত্রা শুরু।আমরা বিশ্বাস করেছি, চিকিৎসকের কাছে যেতে না পারলে, চিকিৎসাকেই পৌঁছে দিতে হবে চরবাসীর কাছে।
এক স্বপ্নের নৌযাত্রা : ১৯৯৪ সালে ফ্লেশ ডিওর নামে ৬০ বছরের পুরনো এক ফরাসি তেলবাহী জাহাজ প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছায় বাংলাদেশে। এই ফ্লেশ ডিওরকেই আমরা রূপান্তর করলাম ভাসমান হাসপাতালে। ১৯৯৫ সালে মাদার তেরেসা এসে হাসপাতালটিকে আশীর্বাদ করেন, যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয় এক নতুন বার্তা, আর আমাদের আত্মবিশ্বাসকে করে আরো সুদৃঢ়।ইউনিলিভার বাংলাদেশের সে সময়ের কমার্শিয়াল ডিরেক্টর সঞ্জীব মেহতা, মার্কেটিং ডিরেক্টর জেফ ফ্রেজার এবং সিনিয়র ব্র্যান্ড ম্যানেজার (বর্তমানে ইউনিলিভার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান) মোহাম্মদ জাভেদ আখতার, আমাদের অসম্ভব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করেন। এই সাফল্য আমাদের আত্মবিশ্বাসকে আরো বাড়িয়ে দেয়। তার ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু করে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল (এলএফএইচ)। এর প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের উদ্দেশে। আর প্রথম গন্তব্য ছিল ধলেশ্বরীর তীরে বকতার চর।
সেদিন বহু মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন চিকিৎসা সেবা নিতে। প্রথম দিনই বকতার চরে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা নেন অন্তত ৮০ জন স্থানীয় বাসিন্দা।আস্থার প্রতীক লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল : সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল শুধু স্বাস্থ্যসেবা দেয়নি। এটি চরবাসীর কাছে হয়েছে আস্থা ও মর্যাদার প্রতীক। মাত্র ১৮ সদস্যের টিম দিয়ে শুরু হয়েছিল এলএফএইচের যাত্রা। ২০২৫ সাল পর্যন্ত লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল চিকিৎসা দিয়েছে প্রায় ৭.৯ লাখ রোগীকে। আর স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে ১৩ লাখ স্থানীয় বাসিন্দাকে এবং ১৮ হাজারের বেশি সার্জারি বা অস্ত্রোপচার হয়েছে এ হাসপাতালে। ফ্রেন্ডশিপের স্বাস্থ্যসেবার বিশেষ কিছু সেবা হচ্ছে সার্ভিক্যাল ক্যান্সার এবং এর প্রাথমিক চিকিৎসা, বার্নস, ক্লেফট লিপ, ছানি, অর্থোপেডিকস এবং প্রসূতি জটিলতার চিকিৎসা। প্রতিবছর এলএফএইচের মাধ্যমে আয়োজন করা হয় ৩০ থেকে ৩৫টি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ক্যাম্প, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নামকরা চিকিৎসকরা এসে স্থানীয় চিকিৎসক দলের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।বর্তমানে ফ্রেন্ডশিপের স্বাস্থ্যসেবা খাতের রয়েছে সাতটি ভাসমান হাসপাতাল, ৭৫০টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক এবং আট শতাধিক কমিউনিটি মেডিক। স্বাস্থ্যসেবার পুরো পদ্ধতিটি পর্যবেক্ষণ করা হয় একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। আর এভাবেই গড়ে উঠেছে আমাদের তিন স্তরের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। যেমন—ভাসমান হাসপাতাল থেকে সেকেন্ডারি কেয়ার, স্যাটেলাইট ও বোট ক্লিনিক থেকে প্রাইমারি কেয়ার, আর কমিউনিটি মেডিক ও নদী অ্যাম্বুল্যান্সের মাধ্যমে ঘরে ঘরে জরুরি সেবা। এমন স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত আছে টিকা কার্যক্রম, পুষ্টি শিক্ষা, ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন। বলা যায়, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ১০ শতাংশ নাগরিককে স্বাস্থ্যসেবা দিতে সক্ষম হয়েছে ফ্রেন্ডশিপ। সংখ্যার হিসাবে যা এক কোটি ৭০ লাখ।
স্বাস্থ্যসেবা থেকে সামগ্রিক উন্নয়ন : ভাসমান হাসপাতাল মডেলকে কেন্দ্র করে ফ্রেন্ডশিপ এখন শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, টেকসই জীবন-জীবিকা, নাগরিক অধিকার এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণে কাজ করছে। জীবন বাঁচানোয় সহায়তা, দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু কর্মসূচি, গণমানুষের ক্ষমতায়ন—এই চারটি প্রতিজ্ঞাকে সামনে রেখে সেবা দিয়ে যাচ্ছে ফ্রেন্ডশিপ। ভাঙনপ্রবণ জনপদে চালু হয়েছে সহজ স্থানান্তরযোগ্য বিদ্যালয়, গ্রামের কৃষক ও জেলেদের দেওয়া হচ্ছে আধুনিক প্রশিক্ষণ। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ম্যানগ্রোভ পুনঃবনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দেওয়া হচ্ছে আইনগত সহায়তা এবং নিজেদের অধিকার জানা ও দাবি করার মাধ্যমে আদর্শ নাগরিক হওয়ার শিক্ষা। পাশাপাশি হস্তশিল্প ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে শিল্পীদের আত্মপরিচয় ও মর্যাদাকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এভাবে বছরে ফ্রেন্ডশিপের সেবা পাচ্ছেন প্রায় ৭৫ লাখ প্রান্তিক বাসিন্দা। এভাবে ফ্রেন্ডশিপ হয়ে উঠেছে এক ‘মর্যাদাভিত্তিক উন্নয়ন মডেল’।
‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধা বঞ্চিত হতদরিদ্র বাসিন্দাও সর্বোচ্চ মান ও মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য’—এ বিশ্বাস নিয়েই ২৫ বছর আগে শুরু হয় ফ্রেন্ডশিপের যাত্রা। আজ আমার মনে পড়ে সেই মুহূর্ত, যখন অস্ত্রোপচারের পর প্রথমবার সন্তানের মুখ স্পষ্ট দেখতে পেলেন বহুদিনের ছানি সমস্যায় জর্জরিত এক বৃদ্ধা। তাঁর অশ্রুসজল চোখ যেন বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি। এমন অসংখ্য মুহূর্তই আমাদের পথচলাকে করছে অর্থবহ।’
লেখক : ফ্রেন্ডশিপের (এনজিও) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক