২০০৬ সালে প্রথম চীনে গিয়েছিলাম কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির নানা দিক সরেজমিনে দেখতে। সে সময় আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে হুনান প্রদেশের সাংশান জেলার পাহাড়বেষ্টিত হ্রদে খাঁচায় মাছ চাষ বা কেইজ কালচার (Cage Culture)।
হ্রদের নীরব জলে ভেসে ছিল শত শত বাঁশের কাঠামো, নিচে মোটা জালের খাঁচা। হ্রদের পানিতে মাছ বড় হচ্ছে, আর তীরে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন।সেখানকার এক মাছ চাষি তিয়ান ইয়ান জিউয়ের কাছে জানতে পেরেছিলাম, এই চাষ পদ্ধতি স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে।চীনের হ্রদগুলো প্রাচীন ও প্রাকৃতিক। একসময় শুধুই সৌন্দর্যের অংশ ছিল, কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহারের উদ্যোগ ছিল না। ৩০-৪০ বছর ধরে সরকার প্রান্তিক মানুষের জন্য মাছ চাষকে উৎসাহিত করছে।প্রতিটি খাঁচার জন্য সরকার ভর্তুকি দেয়—প্রথম বছরে ৩০ আরএমবি (চীনা মুদ্রা), দ্বিতীয় বছরে ২০ আরএমবি ও তৃতীয় বছরে আবার ৩০ আরএমবি করে। বর্তমানে এক আরএমবি সমান বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৭.১৭ টাকা।আমি নৌকায় করে চাষিদের সঙ্গে হ্রদের মাঝখানে গেলাম। ৩ থেকে ১০ মিটার গভীর পানিতে বাঁশ ও জাল দিয়ে তৈরি খাঁচাগুলো একটার পর একটা সাজানো।প্রতিটি খাঁচায় ৫০-১০০টি করে মাছ ছাড়া হয়—মূলত কার্পজাতীয় মাছ। দেড় থেকে তিন বছরে মাছের ওজন হয় ৫ থেকে ১০ কেজি।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, একেকটি খাঁচা থেকে বছরে প্রায় ৬০০ আরএমবি আয় হয়, আর তিন বছরে প্রায় এক হাজার কেজি মাছ পাওয়া যায়, ওই সময় যার বাজারমূল্য প্রায় চার হাজার আরএমবি। আশ্চর্যের বিষয়, মাছের জন্য আলাদা কোনো খাবার দিতে হয় না। হ্রদের প্রাকৃতিক উপাদানই মাছের খাদ্য হিসেবে কাজ করে।ঢাকার কালীগঞ্জের বালু নদে জালের খাঁচায় মাছ চাষ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে। শুনে অবাক হলাম, চীনের এক চাষিও ১৯৯৮ সালে জীবিকার তাগিদে বাংলাদেশে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে এসেছিলেন। তিনিও বাংলাদেশের নদীতে জালের খাঁচায় মাছ চাষ দেখেছিলেন। দেশে ফিরে এই হ্রদে মাছ চাষ শুরু করেন। এখন তিনি সাংশান হ্রদের সবচেয়ে বড় মাছ চাষি—১৭০টি খাঁচা পরিচালনা করেন। হাসিমুখে বললেন, ‘বছরে অন্তত ৪০ হাজার আরএমবি লাভ হয়। সরকারের ভর্তুকি আর প্রকৃতির দান—দুটি মিলে আমরা এখন স্বাবলম্বী।’
হ্রদের পাশে প্রায় প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ এই চাষের সঙ্গে যুক্ত। কেউ ১০০টি, কেউ হাজারখানেক খাঁচা পরিচালনা করছেন। মানুষজন এখন সমৃদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী, সুখী।
হৃদয়ে মাটি ও মানুষে এই পর্ব প্রচারের পর মেঘনা নদীতে এমন কেইজ কালচারে মাছের চাষ শুরু হয়। নরসিংদীতে শত শত এখন এই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী। যাই হোক, চীনের সেই হ্রদ ঘুরে ফিরে যখন বাজারে পৌঁছলাম, চোখে পড়ল জীবিত মাছ বিক্রির প্রযুক্তি। দোকানের সামনে নিচু জায়গায় পানি দিয়ে মাছ রাখা, যাতে ক্রেতারা তাজা মাছ কিনতে পারেন। দূর থেকে মাছ আনার জন্য ভ্যানে পানিভর্তি ট্যাংক, ছোট মোটর ও ব্যাটারির সাহায্যে পাইপ দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা—অর্থাৎ চলমান অ্যাকোয়ারিয়াম! এই ছোট ছোট উদ্ভাবনগুলোই আমাকে সে সময় ভাবিয়েছে—বাংলাদেশে আমরা এমন উদ্যোগ কেন নিতে পারি না? এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাজারেই তাজা মাছ বিক্রির দৃশ্য চোখে পড়ে। চীন থেকে ঘুরে এসে সে সময় আমার মনে হয়েছিল এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম লেক আমাদের কাপ্তাই হ্রদ, যার আয়তন ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। অথচ নানা কারণে সেই হ্রদ হারিয়েছে তার প্রাচুর্য ও সম্ভাবনা। যদি এই কাপ্তাই হ্রদে পরিকল্পিতভাবে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু করা যায়, তাহলে দুইভাবে আমরা উপকৃত হতে পারি। প্রথমত, দেশের মৎস্যসম্পদের পরিমাণ বাড়বে; দ্বিতীয়ত, হ্রদপারের দরিদ্র মানুষ স্বাবলম্বী হবে। চীনের সাংশান হ্রদের বাস্তবতা প্রমাণ করে যখন সরকার সহায়তা দেয়, মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে পরিশ্রম করে, আর প্রকৃতির সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন প্রান্তিক মানুষও হয়ে ওঠে সাফল্যের গল্পের নায়ক।