সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বৃক্ষপ্রেম

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে
  • মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা-বাগানের শ্রমিক বিষ্ণু হাজরা। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার বৃক্ষ রোপণ করেছেন তিনি। লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
বাবা ছিলেন চা-শ্রমিক। দৈনিক মজুরি পেতেন মাত্র ২৮ টাকা। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরাত। এক বেলা খেলে পরের বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না।

বিষ্ণু হাজরাও চা-শ্রমিক। তাঁরও লক্ষ্য এক লাখ গাছ লাগানো।১৯৯৭ সাল থেকে বৃক্ষরোপণ শুরু বিষ্ণুর। তখন তিনি নবম শ্রেণির ছাত্র
টিউশনের টাকায় গাছ কিনে লাগাতেন। অতটুকুন বয়সে সুযোগ পেলেই কখনো বাইসাইকেল, কখনো হেঁটে বেরিয়ে পড়তেন গাছ নিয়ে।ছোটবেলায় ভাবতেন, গাছ বড় হলে বিক্রি করে অনেক টাকার মালিক হবেন। পেট ভরে পোলাও-কোরমা খাবেন। শখগুলো পূরণ করবেন।অর্থাভাবে এসএসসির আগেই পড়াশোনার ইতি টানতে হয়েছিল। পরে শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন চা-বাগানে। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, রাস্তার দুই পাশে, স্কুল, হাসপাতালসহ যেখানে গাছ লাগানোর মতো জায়গা চোখে পড়ে, সেখানেই বিষ্ণু গাছ লাগিয়েছেন। তিনি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা-বাগানের বাসিন্দা। দিনে চা-শ্রমিক, রাতে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। পরিবারে মা, স্ত্রী, দুই ছেলে আর এক ভাই আছে। বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। বোনের বিয়ের খরচ জোগাড় করতে গিয়ে তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। কেউ টাকা ধার দিতেও রাজি হয়নি। এই অবস্থায় তিনি পুকুরপারে লাগানো আটটি গাছ বিক্রি করেন। আবার নিজের ঘর তোলার সময় কাঠ কেনার টাকা ছিল না। তখন দুই দফায় আটটি গাছ বিক্রি করে নতুন ঘর তোলেন। বিষ্ণু বলছিলেন, ‘চরম বিপদের সময় মানুষ পাশে এসে না দাঁড়ালেও গাছগুলো দাঁড়িয়েছে। নীরবে তারা সাহায্য করেছে। গাছগুলো না থাকলে কী করতাম, জানি না।’
অবশ্য বিক্রি করা গাছের জায়গায় তাঁর লাগানো নতুন গাছগুলো সুন্দরভাবে বেড়ে উঠেছে। ঔষধি, বনজ, ফলদ—সব ধরনের গাছই লাগান বিষ্ণু। শুধু তা-ই নয়, গাছের সঙ্গে লাঠি বেঁধে দেওয়াসহ যত্নেও ত্রুটি রাখেন না।

বেশ কয়েকবার পেশা বদলেছেন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সংবাদপত্রের হকার। তখন সংবাদপত্র পড়ার কারণে তাঁর বোধের জগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তিনি দেখতে পান, সবুজের অভাবে জলবায়ু পরিবর্তনে কী ভয়াবহ অবস্থা হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতে। বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। ফলে বৃক্ষরোপণে তাঁর তৎপরতা আরো বাড়ে। শুরুতে নিজের টাকায় কেনা গাছ লাগানো শুরু করলেও এখন অন্যরা গাছ উপহার দিলে তা-ও লাগান। কেউ গাছ কেনার টাকা দিলে সেটি দিয়ে গাছ লাগিয়ে আবার তাঁকে জানানও। বৃক্ষের প্রতি তাঁর এই অগাধ প্রেম অনেকে ভালো চোখে দেখেননি। তারা বিষ্ণুকে পাগল বলে উপহাস করত। তবু থেমে থাকেননি বিষ্ণু। ২০২১ সালে ভাড়াউড়া চা-বাগানের বধ্যভূমির রাস্তার পাশে তিনি শোভাবর্ধনের জন্য ২৫টি কৃষ্ণচূড়াগাছের চারা রোপণ করেছিলেন, কিন্তু রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা সেগুলো গোড়া থেকে ভেঙে ফেলল। পরদিন ভোরে ভাঙাচোরা গাছ দেখে বিষ্ণু হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে লাগলেন। বললেন, ‘জীবনে এত কষ্ট আমি আর পাইনি। ভালোবাসার গাছগুলোকে কেন তারা নষ্ট করল? প্রতিটি গাছ আমার কাছে সন্তানের মতো।’

কারো জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী, বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানে গাছের চারা উপহার দেন বিষ্ণু। একসঙ্গে তিনটি চারা। এ পর্যন্ত ২৫টি বিয়েতে বর-কনেকে গাছের চারা উপহার দিয়েছেন। শুধু চারা দিয়েই থেমে যান না, পরে খোঁজখবরও নেন। বৃক্ষপ্রেম বিষ্ণুর বুকজুড়ে। বৃক্ষ নিয়ে একটি কবিতাও লিখেছেন। মানুষকে গাছ উপহারের সঙ্গে তিনি নিজের রচিত কবিতা উপহার দেন, যেখানে গাছের উপকারিতা বলেছেন সব আবেগ ও ভালোবাসা ঢেলে দিয়ে।

চা-শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্টের কথা কে না জানে! তাই নিজেদের সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে তিনি যুক্ত হয়েছেন অলাভজনক চা-শ্রমিকদের সেবক সংগঠনে। এর মাধ্যমে তিনি চা শ্রমিকদের না পাওয়ার বেদনাগুলো তুলে ধরেন। তাঁর ইচ্ছা, ভবিষ্যতে একটি নার্সারি করবেন। সেখান থেকে সবাইকে সুলভ মূল্যে চারা উপহার দেবেন।

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com