সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

যুগের আলো সৈয়দ মনজুুরুল ইসলাম

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩১ বার পড়া হয়েছে

মোহীত উল আলম

অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আকস্মিকভাবে মারা গেলে আমরা হকচকিত হয়ে পড়ি। তাঁর জানাশোনার বৃত্তের মধ্যে যাঁরা তাঁর কাছাকাছি বয়সের আমরাও একটু ভীত হয়ে পড়ি। বয়স হিসেবে মনজুর ভাই আমার পাক্কা দুই বছরের বড়, কিন্তু একাডেমিক্যালি তিন বছরের। কিন্তু তাঁর সঙ্গে নানাভাবে গত কয়েক দশক নিকট-সংযুক্ত ছিলাম বলে, তাঁর অত্যন্ত স্নেহধন্য ছিলাম বলে, সে রকম পরিণতি নিয়ে আমার মনেও ভীতি সংক্রমিত হয়।

মনজুর ভাই একজন কম্পিলিট প্যাকেজ ছিলেন : চিন্তায়, জ্ঞানে, বুদ্ধিতে, কল্পনাশক্তিতে, প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে এবং সঙ্গ দানে। তাই যতই ঘণ্টা অতিবাহিত হচ্ছে তাঁর মৃত্যুর পর ততই তাঁর শূন্যতা হৃদয়ে মোচড় দিয়ে উঠছে। এ রকম হতোদ্যম মন নিয়ে যখন আজকে, ১৩ অক্টোবর সকালে, প্রাতর্ভ্রমণে বের হলাম দেখা হয়ে গেল নিয়মিত হাঁটার সঙ্গী অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের হেমাটোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে। তিনি জানালেন যে আজকে ছিল বিশ্ব থ্রম্বসিস দিবস, সে জন্য তিনি আমাদের বুড়োদের নিয়ে পার্কে একটু দৌড়ানোর ব্যবস্থা রেখেছেন, যেটি তিনি ভিডিও করে তাঁর নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে পাঠাবেন।
বংশগতভাবে এই রোগে শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে।আমার মনে পড়ছে, আশির দশকের শেষের দিকে মনজুর ভাইয়ের আপন মেজো ভাই, যাঁর নাম এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না, তিনি অগ্রণী ব্যাংকের চট্টগ্রামস্থ হেড অফিসে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সে সুবাদে মনজুর ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কাজে এলে ভাইয়ের বাসায়ই উঠতেন। তখন মনজুর ভাইয়ের বৃদ্ধা মা ওই ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন। আমি একবার ওই বাসায় গিয়ে মনজুর ভাইকে আনতে যাই। মনজুর ভাইয়ের বৃদ্ধা মাকে দেখে খুব শ্রদ্ধা হলো। কিন্তু মনজুর ভাইয়ের এই ভাইটাও সম্ভবত চাকরিরত অবস্থায় মারা যান। তাঁর সর্বজ্যেষ্ঠ ভাই সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তিনিও খুব বেশি আয়ু পাননি।মনজুর ভাইয়ের হঠাৎ হৃত্স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে গোপন কোনো মানসিক চাপের ইমপ্যাক্ট আছে বলে মনে হয়। জুলাইয়ের পটপরিবর্তনের পর স্বাভাবিকভাবে মনজুর ভাই নিশ্চয় উপদ্রুত ছিলেন মানসিকভাবে। আমি লক্ষ করছিলাম যে সাংস্কৃতিক জগতে তাঁর পদচারণ প্রায় মিনিমাম পর্যায়ে এসে গেছিল। তাঁর সজ্জনদের কাছে শুনেছি আড্ডায় তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রায় নিষ্ক্রিয়।

মনজুর ভাই সাহিত্যিক ছিলেন, ভালো কথক ছিলেন, ইংরেজি-বাংলা উভয় ভাষাতেই ছিলেন সড়গড়, কিন্তু তাঁর সব কিছু ছাপিয়ে উঠেছিল শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর গৌরবজনক উপস্থিতি। ওপরের স্তরের শিক্ষকদের মানসগঠনে দুটো পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়া কাজ করে। শিক্ষকের পরিপূর্ণ মর্যাদা তিনি পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে এটা নিশ্চিন্তভাব তিনি কখনো পাননি। প্রকৃত শিক্ষকের অন্তরাত্মা থাকে অতিশয় সংবেদনশীল। প্রতিটা ঘটনা, প্রতিটা আচরণ, প্রতিটা অ্যাকশন একজন মর্যাদাবান শিক্ষকের মনে গভীর প্রতিঘাত করে। বোঝা যায় না, স্পষ্ট ধরা পড়ে না, কিন্তু মর্মে মর্মে একজন মর্যাদাবান শিক্ষক জর্জরিত হতে থাকেন, তাঁর  ভেতরটা কুঁকড়ে কুঁকুড়ে ওঠে। মনজুর ভাইয়ের নিশ্চয় তাঁর সম্পর্কে নানা হন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পণ্ডিত মশাই’ শীর্ষক গল্পটি পড়া ছিল। যেটিতে লেখক সমাজে শিক্ষকের করুণ দশা ফুটিয়ে তুলতে দেখিয়েছিলেন স্কুল পরিদর্শনে যে সাহেব ইন্সপেক্টর এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে এসেছিল তাঁর পোষা আলসেশিয়ান কুকুরটিও। সাহেব চলে যাবার পর প্রধান শিক্ষক ছাত্রদের উদ্দেশ করে বললেন, ওরে যে কুকুরটি দেখেছিস, আর তোদেরকে পড়িয়ে মাসের শেষে আমি যে বেতন পাই, সেটি ওই কুকুরকে পুষতে যে টাকা খরচ হয় তার এক পায়ের খরচের সমান। বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের অবস্থান চরম অবহেলা, উপেক্ষা ও বঞ্চনার। ওই চারপেয়ে কুকরের একটা পায়ের সমান। এই পর্যুদস্ত পরাজিত ও সম্মানহীন সম্প্রদায়ের একজন সর্েবাত্কৃষ্ট সুসম্পন্ন প্রতিনিধি হয়েও মনজুর ভাই যে ভেতরে ভেতরে পুড়তেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর সমাধিপর্বে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন, মনজুর ভাইয়ের বাবাও একজন শিক্ষক ছিলেন।

উত্তরাধুনিক চেতনা হচ্ছে বস্তুনির্ভর চেতনা। বস্তুবাদী চেতনার দৃঢ় প্রত্যয় হচ্ছে বস্তুজীবন-নিরপেক্ষ হয়ে প্রতিভার বাঁধা-বন্ধনহীন বিকাশ হতে পারার সম্ভাবনার কথাটা যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে বেশি মিথ। আমাকে মনজুর ভাইয়ের মতো সিলেট বাড়ি, সে রকম একজন অধ্যাপক জানিয়েছেন মনজুর ভাইয়ের ঢাকায় আবাস হিসেবে নিজস্ব কোনো বাসা নেই।

মনজুর ভাইয়ের ওপর দুদিন আগে প্রকাশিত আরেকটি লেখায় আমি জানিয়েছিলাম যে অধ্যয়নিক দিক ও সৃজনশীল দিক বিবেচনা করলে বুদ্ধদেব বসু ও মনজুর ভাইয়ের মধ্যে সমান্তরাল খুঁজে পাওয়া সম্ভব। দুজনেই ইংরেজি সাহিত্যের দুর্ধর্ষ ছাত্র ছিলেন, দুজনেরই পরীক্ষার ফলাফল প্রবাদপ্রতিম। দুজনেই সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। তফাতটা হলো, বুদ্ধদেব বসু সাহিত্যে পূর্ণ সময় দেওযার জন্য অধ্যাপনার চাকরি ছেড়েছিলেন, আর মনজুর ভাই দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন।

তার পরও একটা অবধারিত পার্থক্য হয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে, মনজুর ভাই যখন সৃজনশীল লেখায় নেমেছেন তার কিছু আগে থেকে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সাহিত্যাকাশ দখল করে ফেলেছেন। তিনিও যেহেতু ঢাবির শিক্ষক ছিলেন মনজুর ভাইয়ের মতো, তাই মনজুর ভাইয়ের পক্ষে প্রতিযোগিতাটা খুব কাছে থেকেই টের পাওয়ার কথা।

হুমায়ূন আহমেদের সাবলীল গল্প বলার কায়দার কাছে মনজুর ভাইয়ের আগাগোড়া এক্সপেরিমেন্টাল বলার ধরন, যেমন—‘আধখানা মানুষ’ উপন্যাসটি, যেখানে পরাবাস্তববাদ এবং কাফকার মতো অতি সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশনানির্ভর বর্ণনা আছে, সে ভাষা টিকিয়ে রাখা কঠিন ছিল। ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ইংরেজি গল্পের বই ‘দ্য মার্মেনস প্রেয়ার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’-এর গল্পগুলো পড়লে অনুভব হয় যে প্রতিটি গল্প যেন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্তে এসে যাচ্ছে, কিন্তু হৃদয়ের উষ্ণতার যে পরশ পাঠকের মর্মে পৌঁছে মানুষকে উদ্বেলিত করে, কাঁদায়, যন্ত্রণাদগ্ধ করে—সে আবেদন তাঁর গল্পগুলোতে খানিকটা অবসিত। বা আমরা অন্যভাবেও বলতে পারি যে মনজুর ভাইয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক গল্প বলার কৌশলের সমজদার হবে সেই পাঠকশ্রেণি বাংলাদেশে এখনো তৈরি হয়নি। একটা কঠিন কথা বলি, বাংলাদেশের পাঠকসমাজ গড়পড়তা অচিন্তক, অসহিষ্ণু, অস্থির, খুব ঠুনকো জীবনবোধ নিয়ে চলে সে রকম একটা সমাজ। হুমায়ূন আহমেদের মানুষের জীবন-বীক্ষণ রীতি খুব তরতাজা হলেও তা কখনো গভীর নয়, সে জন্যই হয়তো এই অগভীরতার জন্যই হয়তো তিনি কিংবদন্তি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

মনজুর ভাই শেষ একটি ভাষণ দিয়েছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এবং বলেছিলেন, শিক্ষার সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির শিক্ষার মেলবন্ধন না হলে একটি জাতি আধুনিক হতে পারে না। অতীব সত্য কথা। আমাদের অভিভাবক-উপদ্রুত সমাজে শিক্ষা মানে হলো ‘পড়, পড়, পড়’, গান-বাজনা-খেলাধুলা হারাম। হারাম সাহিত্য, তথা ‘আউট বই’, আর সংস্কৃতি মানে হলো যে যত লেখাপড়ায় খারাপ সে যেন তত ভালো কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, শিল্পী কিংবা খেলোয়াড়। শিক্ষার জগত আর সংস্কৃতির জগতের মধ্যে এই দ্বিধাবিভক্তি জাতিকে খেয়ে ফেলছে। তার সঙ্গে যদি সমাজে নারীর ইতরায়নের ছবিটি যুক্ত করি, তাহলে বলতে হবে মনজুর ভাই হয়তো এই অভিশপ্ত পরিণতি দেখতে পাবেন না বলেই এক অর্থে ভাগ্যবান। মনজুর ভাই বলেছেন, পুরুষ নিয়ন্ত্রিত বিজ্ঞান থেকে পৃথিবী যে প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েছে, তাতে হয়তো মেয়েরা খানিকটা স্বাধীনতা ভোগ করছে। আমি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে বলতাম, ওই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণও কিন্তু পুরোপুরি পুরুষের হাতে।

যা হোক, একটা হালকা কথা বলে আলোচনাটা শেষ করি। মনজুর ভাই কোথাও কোথাও বলেছেন যে তিনি আমাকে খুব পছন্দ করেন এবং আমাকে বলতেন ‘কাজের ছেলে’। আমার সত্তর বছর পূর্ণ করা উপলক্ষে প্রকাশিত সম্মাননা গ্রন্থ ‘নিজেকে করো উন্মোচন’-এ  মনজুর ভাইয়ের লেখায় আমার ছোটগল্প নিয়ে তাঁর প্রশংসার কথা আমি পড়েছি। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। একবার মনজুর ভাই আমার বাসায় কোনো একটা দাওয়াতে এলে আমার স্ত্রী খুকুকে বললেন, ‘খুকু, মোহীতের গল্প-উপন্যাসে তোমার কথা কয়বার এসেছে?’

খুকু বলেছিল, ‘একবারও না।’

মনজুর ভাই বুঝে গিয়েছিলেন যে ভালোবাসা এ রকমেরই।মনজুর ভাইয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা আমি বয়ে বেড়াচ্ছি কেঁদে কেঁদে। তাঁর অবারিত স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলাম চিরদিনের জন্য।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com