মোহীত উল আলম
মনজুর ভাই সাহিত্যিক ছিলেন, ভালো কথক ছিলেন, ইংরেজি-বাংলা উভয় ভাষাতেই ছিলেন সড়গড়, কিন্তু তাঁর সব কিছু ছাপিয়ে উঠেছিল শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর গৌরবজনক উপস্থিতি। ওপরের স্তরের শিক্ষকদের মানসগঠনে দুটো পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়া কাজ করে। শিক্ষকের পরিপূর্ণ মর্যাদা তিনি পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে এটা নিশ্চিন্তভাব তিনি কখনো পাননি। প্রকৃত শিক্ষকের অন্তরাত্মা থাকে অতিশয় সংবেদনশীল। প্রতিটা ঘটনা, প্রতিটা আচরণ, প্রতিটা অ্যাকশন একজন মর্যাদাবান শিক্ষকের মনে গভীর প্রতিঘাত করে। বোঝা যায় না, স্পষ্ট ধরা পড়ে না, কিন্তু মর্মে মর্মে একজন মর্যাদাবান শিক্ষক জর্জরিত হতে থাকেন, তাঁর ভেতরটা কুঁকড়ে কুঁকুড়ে ওঠে। মনজুর ভাইয়ের নিশ্চয় তাঁর সম্পর্কে নানা হন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পণ্ডিত মশাই’ শীর্ষক গল্পটি পড়া ছিল। যেটিতে লেখক সমাজে শিক্ষকের করুণ দশা ফুটিয়ে তুলতে দেখিয়েছিলেন স্কুল পরিদর্শনে যে সাহেব ইন্সপেক্টর এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে এসেছিল তাঁর পোষা আলসেশিয়ান কুকুরটিও। সাহেব চলে যাবার পর প্রধান শিক্ষক ছাত্রদের উদ্দেশ করে বললেন, ওরে যে কুকুরটি দেখেছিস, আর তোদেরকে পড়িয়ে মাসের শেষে আমি যে বেতন পাই, সেটি ওই কুকুরকে পুষতে যে টাকা খরচ হয় তার এক পায়ের খরচের সমান। বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের অবস্থান চরম অবহেলা, উপেক্ষা ও বঞ্চনার। ওই চারপেয়ে কুকরের একটা পায়ের সমান। এই পর্যুদস্ত পরাজিত ও সম্মানহীন সম্প্রদায়ের একজন সর্েবাত্কৃষ্ট সুসম্পন্ন প্রতিনিধি হয়েও মনজুর ভাই যে ভেতরে ভেতরে পুড়তেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর সমাধিপর্বে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন, মনজুর ভাইয়ের বাবাও একজন শিক্ষক ছিলেন।
উত্তরাধুনিক চেতনা হচ্ছে বস্তুনির্ভর চেতনা। বস্তুবাদী চেতনার দৃঢ় প্রত্যয় হচ্ছে বস্তুজীবন-নিরপেক্ষ হয়ে প্রতিভার বাঁধা-বন্ধনহীন বিকাশ হতে পারার সম্ভাবনার কথাটা যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে বেশি মিথ। আমাকে মনজুর ভাইয়ের মতো সিলেট বাড়ি, সে রকম একজন অধ্যাপক জানিয়েছেন মনজুর ভাইয়ের ঢাকায় আবাস হিসেবে নিজস্ব কোনো বাসা নেই।
মনজুর ভাইয়ের ওপর দুদিন আগে প্রকাশিত আরেকটি লেখায় আমি জানিয়েছিলাম যে অধ্যয়নিক দিক ও সৃজনশীল দিক বিবেচনা করলে বুদ্ধদেব বসু ও মনজুর ভাইয়ের মধ্যে সমান্তরাল খুঁজে পাওয়া সম্ভব। দুজনেই ইংরেজি সাহিত্যের দুর্ধর্ষ ছাত্র ছিলেন, দুজনেরই পরীক্ষার ফলাফল প্রবাদপ্রতিম। দুজনেই সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। তফাতটা হলো, বুদ্ধদেব বসু সাহিত্যে পূর্ণ সময় দেওযার জন্য অধ্যাপনার চাকরি ছেড়েছিলেন, আর মনজুর ভাই দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন।
তার পরও একটা অবধারিত পার্থক্য হয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে, মনজুর ভাই যখন সৃজনশীল লেখায় নেমেছেন তার কিছু আগে থেকে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সাহিত্যাকাশ দখল করে ফেলেছেন। তিনিও যেহেতু ঢাবির শিক্ষক ছিলেন মনজুর ভাইয়ের মতো, তাই মনজুর ভাইয়ের পক্ষে প্রতিযোগিতাটা খুব কাছে থেকেই টের পাওয়ার কথা।
হুমায়ূন আহমেদের সাবলীল গল্প বলার কায়দার কাছে মনজুর ভাইয়ের আগাগোড়া এক্সপেরিমেন্টাল বলার ধরন, যেমন—‘আধখানা মানুষ’ উপন্যাসটি, যেখানে পরাবাস্তববাদ এবং কাফকার মতো অতি সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশনানির্ভর বর্ণনা আছে, সে ভাষা টিকিয়ে রাখা কঠিন ছিল। ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ইংরেজি গল্পের বই ‘দ্য মার্মেনস প্রেয়ার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’-এর গল্পগুলো পড়লে অনুভব হয় যে প্রতিটি গল্প যেন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্তে এসে যাচ্ছে, কিন্তু হৃদয়ের উষ্ণতার যে পরশ পাঠকের মর্মে পৌঁছে মানুষকে উদ্বেলিত করে, কাঁদায়, যন্ত্রণাদগ্ধ করে—সে আবেদন তাঁর গল্পগুলোতে খানিকটা অবসিত। বা আমরা অন্যভাবেও বলতে পারি যে মনজুর ভাইয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক গল্প বলার কৌশলের সমজদার হবে সেই পাঠকশ্রেণি বাংলাদেশে এখনো তৈরি হয়নি। একটা কঠিন কথা বলি, বাংলাদেশের পাঠকসমাজ গড়পড়তা অচিন্তক, অসহিষ্ণু, অস্থির, খুব ঠুনকো জীবনবোধ নিয়ে চলে সে রকম একটা সমাজ। হুমায়ূন আহমেদের মানুষের জীবন-বীক্ষণ রীতি খুব তরতাজা হলেও তা কখনো গভীর নয়, সে জন্যই হয়তো এই অগভীরতার জন্যই হয়তো তিনি কিংবদন্তি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
মনজুর ভাই শেষ একটি ভাষণ দিয়েছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এবং বলেছিলেন, শিক্ষার সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির শিক্ষার মেলবন্ধন না হলে একটি জাতি আধুনিক হতে পারে না। অতীব সত্য কথা। আমাদের অভিভাবক-উপদ্রুত সমাজে শিক্ষা মানে হলো ‘পড়, পড়, পড়’, গান-বাজনা-খেলাধুলা হারাম। হারাম সাহিত্য, তথা ‘আউট বই’, আর সংস্কৃতি মানে হলো যে যত লেখাপড়ায় খারাপ সে যেন তত ভালো কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, শিল্পী কিংবা খেলোয়াড়। শিক্ষার জগত আর সংস্কৃতির জগতের মধ্যে এই দ্বিধাবিভক্তি জাতিকে খেয়ে ফেলছে। তার সঙ্গে যদি সমাজে নারীর ইতরায়নের ছবিটি যুক্ত করি, তাহলে বলতে হবে মনজুর ভাই হয়তো এই অভিশপ্ত পরিণতি দেখতে পাবেন না বলেই এক অর্থে ভাগ্যবান। মনজুর ভাই বলেছেন, পুরুষ নিয়ন্ত্রিত বিজ্ঞান থেকে পৃথিবী যে প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েছে, তাতে হয়তো মেয়েরা খানিকটা স্বাধীনতা ভোগ করছে। আমি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে বলতাম, ওই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণও কিন্তু পুরোপুরি পুরুষের হাতে।
যা হোক, একটা হালকা কথা বলে আলোচনাটা শেষ করি। মনজুর ভাই কোথাও কোথাও বলেছেন যে তিনি আমাকে খুব পছন্দ করেন এবং আমাকে বলতেন ‘কাজের ছেলে’। আমার সত্তর বছর পূর্ণ করা উপলক্ষে প্রকাশিত সম্মাননা গ্রন্থ ‘নিজেকে করো উন্মোচন’-এ মনজুর ভাইয়ের লেখায় আমার ছোটগল্প নিয়ে তাঁর প্রশংসার কথা আমি পড়েছি। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। একবার মনজুর ভাই আমার বাসায় কোনো একটা দাওয়াতে এলে আমার স্ত্রী খুকুকে বললেন, ‘খুকু, মোহীতের গল্প-উপন্যাসে তোমার কথা কয়বার এসেছে?’
খুকু বলেছিল, ‘একবারও না।’
মনজুর ভাই বুঝে গিয়েছিলেন যে ভালোবাসা এ রকমেরই।মনজুর ভাইয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা আমি বয়ে বেড়াচ্ছি কেঁদে কেঁদে। তাঁর অবারিত স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলাম চিরদিনের জন্য।