সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

নিভে গেল বাতিঘরের আলো

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৮ বার পড়া হয়েছে
  • ইমদাদুল হক মিলন
  • খুব কাছের সবাই সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে ‘মনজুর ভাই’ বলতেন। আমি ‘র’টা বাদ দিয়েছিলাম। বলতাম ‘মনজু ভাই’। কেন বলতাম তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।ব্যাখ্যা আবার একটু আছেও। বলতে ভালো লাগত। ওই নিয়ে তিনি কখনো কোনো কথা বলেননি। ফোন তুলে ‘মনজু ভাই’ বললেই তিনি হাসিমুখে বলতেন, ‘বলো, মিলন’।

    ছাত্রদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে, কথা বলতে শুরু করলে, মনে হয় আমি এক গভীর আনন্দের জগতে বিচরণ করছি। এই আনন্দের কোনো তুলনা হয় না।’আহা, তাঁর সেই গভীর আনন্দের ভুবন ছেড়ে এভাবে চলে গেলেন তিনি! ভাবলেই মনে হয়, ক্লাসে ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাঁর সেই বিখ্যাত বাচনভঙ্গিতে, সরস ভাষায় নন্দনতত্ত্বের গভীর গভীরতর দিক নিয়ে কথা বলছিলেন। ক্লাসের সময় কখন শেষ হয়ে গেছে টের পাননি। মনে পড়তেই হাত তুলে ছাত্রদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। সেই ক্লাস রুমটিতে আর কখনোই তাঁর ফেরা হবে না, ভাবলেই বুকটা হু হু করে ওঠে।মনজু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো কম। ফোনে কথা হতো প্রায়ই। ফোনে আন্তরিকতা যতটা প্রকাশ পায়, তার পুরোটাই অনুভব করতাম তাঁর কথায়। তবে দেখা হলেই আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরতাম। তাঁর সেই উষ্ণ আলিঙ্গন, তাঁর সেই স্পর্শের মধ্য দিয়ে অনুভব করতাম, একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ গভীর ভালোবাসায় আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন। তাঁর সামনে দাঁড়াবার পর অনেক দিন আমার মনে হয়েছে, আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি বিশাল এক মহীরুহের সামনে। অথবা এক পর্বতের সামনে। অথবা এক বাতিঘরের সামনে। মহীরুহ তার শীতল ছায়ায় আমাকে স্নিগ্ধ করছে। পর্বত বুঝিয়ে দিচ্ছে তার উচ্চতা। আর বাতিঘরের আলোয় আমি পথ দেখতে পাচ্ছি। যেন বিশাল সমুদ্রে ভাসতে থাকা আমাকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে সেই বাতিঘর।

    আমার কাছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মানে এ রকম এক ব্যক্তিত্ব। এ রকম এক কিংবদন্তি। শিক্ষক হিসেবে তাঁর তুলনা তিনি নিজে। ছাত্রদের ভালোবাসায় সব সময়ই তিনি ছিলেন মাথার ওপর। অসীম জ্ঞানের অধিকারী। যেমন শিক্ষক হিসেবে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, তেমনি লেখক হিসেবেও তা-ই। আর তাঁর পড়াশোনা অতুলনীয়। বিশ্বসাহিত্যটা ছিল তাঁর নখদর্পণে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোথায় কী লেখা হচ্ছে, মনজু ভাইয়ের মতো সেই খবর জানা মানুষ আমি আর দেখিনি। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কোনো তরুণ অথবা তরুণতর মেধাবী লেখকটি কী লিখছেন সেই খবরও তাঁর জানা ছিল। ভালো লেখার প্রশংসা প্রাণ খুলে করতেন। সাহিত্য পুরস্কারের বিচারক থাকতেন অনেক জায়গায়। দুয়েক জায়গায় আমিও তাঁর সঙ্গী হয়েছি। তখন লক্ষ করেছি, কতটা মন দিয়ে একেকটা বই তিনি পড়েছেন। সেই বই নিয়ে অসামান্য মতামত ব্যক্ত করেছেন। ফাঁকিজুঁকি জিনিসটা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের চরিত্রে ছিল না।

    কত দিনকার কত স্মৃতি মনে আসে। হুমায়ূন আহমেদের দখিন হাওয়ার ফ্ল্যাটে নিয়মিতই আড্ডা দিতাম আমরা। মনজু ভাই মাঝে মাঝে আসতেন। হুমায়ূন ভাই খুব ভালোবাসতেন তাঁকে। আর তাঁকে না ভালোবেসে তো থাকা যায় না! নিজের অজান্তেই তিনি সবার ভালোবাসা আদায় করে নিতেন। হুমায়ূন ভাই নিজে খুব রসিক মানুষ ছিলেন। মনজু ভাই নিজেও তা-ই। হাসি-আনন্দ আর রসিকতায় আমাদের সেই সন্ধ্যা বা রাতগুলো অনন্য হয়ে যেত। সেই আড্ডায় অবধারিতভাবে থাকতেন অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম। হুমায়ূন ভাইয়ের পাশের ফ্ল্যাটেই তিনি থাকেন। মনজু ভাইয়ের প্রতি আলাদা এক টান ছিল মাজহারের। সে-ই টান যে কী গভীর ছিল, লিখে বোঝানো যাবে না। মনজু ভাই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পর প্রথমেই ছুটে গিয়েছিলেন মাজহার। শেষ দিনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত তিনি ছিলেন মনজু ভাইয়ের পাশে। হুমায়ূন ভাইয়ের ক্ষেত্রেও মাজহার তা-ই করেছিলেন। মাজহারের ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই। ভালোবাসার মানুষটির জন্য তিনি সব করতে পারেন।

    মনজু ভাইও খুব ভালোবাসতেন মাজহারকে। একটি দিনের কথা মনে আছে। বিকেলবেলা কোথায় যেন দেখা হলো আমাদের। সম্ভবত মাজহারের অফিসে। বোধ হয় ‘এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার’ সংক্রান্ত কোনো মিটিং ছিল। ওই শেষ করে ঢাকা ক্লাবে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিলাম আমরা। সে রকম আনন্দময় সন্ধ্যা এই জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না।

    তখনো মনজু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী পাতাটি ছিল খুব প্রিয়। সেখানে নিয়মিত পড়তাম সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কলাম ‘অলস দিনের হাওয়া’। সমসাময়িক কালের বিশ্বসাহিত্য নিয়ে লেখা ‘অলস দিনের হাওয়া’ ছিল অসামান্য। ওই লেখার জন্য আমরা অপেক্ষা করতাম। পৃথিবীর কত কত লেখক আর তাঁদের বইয়ের কথা যে জেনেছিলাম ‘অলস দিনের হাওয়া’ পড়ে।

    কলকাতার লেখকরা বাংলাদেশের লেখকদের তেমন খোঁজখবর রাখেন না। মনে আছে, বিশ-পঁচিশ বছর আগে কলকাতায় গিয়েছি। আদি নিবাস বিক্রমপুরে ছিল, এমন একজন লেখকের সঙ্গে পরিচয় হলো। তাঁর নাম প্রফুল্ল রায়। বিক্রমপুরের রাজদিয়া গ্রামের লোক। তাঁর বিখ্যাত বই ‘কেয়াপাতার নৌকো’। দেশভাগের পটভূমিতে লেখা। অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক। তাঁর কাহিনি নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে। যেমন—‘এখানে পিঞ্জর’। এই সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলেন অপর্ণা সেন। আর তাঁর ‘চরাচর’ গল্পটি চলচ্চিত্রায়ণ করেছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। পরিচয়ের মুহূর্তেই প্রফুল্ল রায় আমাকে বললেন, ‘তোমাদের দেশের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম খুব ভালো গল্প লেখেন। তোমার সঙ্গে নিশ্চয় তাঁর পরিচয় আছে। দেখা হলেই তাঁকে আমার শুভেচ্ছা জানাবে। বলবে, কলকাতায় তাঁর একজন বড় ভক্ত আছে।’

    ঢাকায় র্িফরে মনজু ভাইকে কথাটা আমি বলেছিলাম। শুনে তিনি হাসলেন। ‘প্রফুল্লবাবু আমাকে একবার চিঠি লিখেছিলেন। ভদ্রলোক খুবই বিনয়ী।’ শুধু ওটুকুই। তার পরই কথা ঘুরে গিয়েছিল অন্য দিকে। নিজের প্রশংসা শুনে কখনো তিনি কাতর হতেন না। বরং লাজুক হতেন, প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতেন।

    একবার মাজহার তাঁর একটি গল্পের বইয়ের প্রকাশনা উৎসব করল। তিনি ও সব ব্যাপারে কখনোই আগ্রহী হতেন না। তবু মাজহার তাঁকে রাজি করালেন। জাতীয় জাদুঘরের হলটিতে অনুষ্ঠান হচ্ছে। মঞ্চে মাথা নিচু করে বসে আছেন তিনি। আমি বসে আছি পাশে। বুঝতে পারছিলাম মনজু ভাই খুবই লজ্জা পাচ্ছেন। ভাবি ছিলেন দর্শক সারিতে। একজন আলোচক তাঁর গল্প নিয়ে আলোচনা করছেন। গল্পটি আমারও পড়া। আলোচনা শুনতে শুনতে আমি মনজু ভাইয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ‘ও আপনার গল্পটি বোঝেনি। না বুঝেই আলোচনা করছে।’ তিনি আমার সঙ্গে একমত হলেন। আবার আমাকে সাবধানও করলেন। ‘খবরদার এ নিয়ে কথা বোলো না। বেচারা লজ্জা পাবে।’

    এই ছিলেন মনজু ভাই। মানুষকে দুঃখ দিতেন না। লজ্জা তো নয়ই। যা ভালো না লাগত ওই নিয়ে কথা বলতেন না। চুপ করে থাকতেন অথবা কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতেন।

    লেখক হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একেবারেই অন্য রকম। অন্য কারো সঙ্গেই তাঁর লেখা মেলে না। বেশ সাদামাটা মেদহীন গদ্য লিখতেন। তবে তাঁর গদ্যভাষার অপূর্ব সৌন্দর্য ছড়িয়ে থাকত গল্পের ভেতরে। আপাতদৃষ্টিতে সহজ সরল সাধারণ জীবনের গল্প লিখতেন। কিন্তু গভীর মনস্ক পাঠক তাঁর লেখার ভেতর থেকে উদ্ধার করেন অন্য এক তাৎপর্য। উত্তর আধুনিকতা থাকে তাঁর গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এ ক্ষেত্রে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একক কৃতিত্বের অধিকারী। তাঁর গল্প শুধু তাঁরই গল্প। ও রকম গল্প অন্য কারো পক্ষে লেখা সম্ভব না। তাঁর প্রায় সব গল্পই আমি পড়েছি। ‘থাকা না থাকার গল্প’, ‘কাঁচভাঙা রাতের গল্প’, ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’, ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’, ‘সুখ দুঃখের গল্প’, ‘বেলা অবেলার গল্প’। কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন। ‘আধখানা মানুষ’, ‘দিনরাত্রিগুলি’, ‘আজগুবি রাত’, ‘তিন পর্বের জীবন’, ‘কানাগলির মানুষেরা’। ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছিলেন, ‘যোগাযোগের গভীর সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা একা লোক’। তাঁর প্রতিটি লেখাই আমাকে মুগ্ধ করেছে। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘নন্দনতত্ত্ব’ বইটি। প্রবন্ধ লিখেছেন অনেক। অত্যন্ত চিন্তাশীল ও ভাবনার উদ্রেক করা সেই সব প্রবন্ধ। শিল্পী সুবীর চৌধুরীর সহযোগে ‘রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্প প্রসঙ্গ’ তাঁর আরেকটি অসামান্য গ্রন্থ। ৭৪ বছরের জীবনে নিজের শিল্প দক্ষতায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কিংবদন্তি হয়ে গেছেন।

    আমার ‘নূরজাহান’ উপন্যাসটি তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘নূরজাহান’ নিয়ে। সাড়ে বারো শ পৃষ্ঠার উপন্যাস মনজু ভাইয়ের মতো ব্যস্ত মানুষ ও রকম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে পারেন এ আমার ধারণাই ছিল না। কিন্তু তাঁর প্রবন্ধটি পড়ে অনুভব করলাম, সত্যি তিনি তিন পর্বের উপন্যাসটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন। না পড়লে ও রকম লেখা সম্ভব না।

    মনজু ভাইয়ের মধ্যে কোনো ফাঁকিজুঁকি ছিল না। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টাই কাজের মধ্যে থাকতেন। পরিমিতি বোধ ছিল অসামান্য। নিজের ইচ্ছের বাইরে কিছুই করতেন না। যা করতেন ভালোবেসে করতেন। সানজিদা ভাবি অসুস্থ দীর্ঘদিন ধরে। প্রায়ই মনজু ভাই তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যেতেন। সকালবেলা ভাবিকে নাশতা করিয়ে ওষুধ খাইয়ে কাজে আসতেন। অতি ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর দুপুরের ওষুধের কথা মনে করিয়ে দিতেন। বাইরে বেশি রাত করতেন না। ৮টার মধ্যে বাড়ি ফিরে ভাবিকে সময় দিতেন। কোনো দায়িত্বে অবহেলা করা মনজু ভাইয়ের চরিত্রে ছিল না। তাঁকে নিয়ে ভাবলে আমার শুধু একটা কথাই মনে হয়, সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন সম্পূর্ণ মানুষ। তাঁর চলে যাওয়া মানে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গন অনেকটাই শূন্য হয়ে যাওয়া। বিশাল বৃক্ষ কাটা পড়লে যেমন শূন্য হয় অনেকটা জায়গা, মনজু ভাইয়ের প্রয়াণে তেমন শূন্য হলো আমাদের ভুবন। হৃদয়জুড়ে থাকা এ রকম ভালোবাসার মানুষটির বিদায় আমৃত্যু ব্যথিত করবে আমার মতো অনেককে। তাঁর কথা ভেবে হু হু করবে বুক। আমাদের আনন্দময় সন্ধ্যাগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠবে।

    কোনো কোনো বেদনা একজীবনে কাটানো যায় না। মনজু ভাইয়ের চলে যাওয়া তেমন এক বেদনা। আমার এই জীবনে এই বেদনা আমি কখনো কাটাতে পারব না।

    মনজু ভাই, চোখের জলে তোমাকে বিদায় জানালাম।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com