পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে বায়ুদূষণ। বিশ্বে এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশের বেশি ঘটছে দূষিত বাতাসের কারণে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।
শুধু মৃত্যু নয়, বায়ুদূষণ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা ডেকে আনছে, যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করছে।স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে এ অবস্থাকে ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বেলজিয়ামভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ)।
বাংলাদেশ সময় গত বুধবার রাতে প্রকাশিত জেডসিএর নতুন গবেষণা প্রতিবেদন ‘স্ট্রাকচারাল ডিপেনডেন্সিস পারপেচুয়েট ডিসপ্রোপোরশনেট চাইল্ডহুড হেলথ বার্ডেন ফ্রম এয়ার পলিউশনে’ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নত দেশের শিশুদের তুলনায় স্বল্পোন্নত দেশের শিশুদের বায়ুদূষণে মৃত্যুঝুঁকি ৯৪ গুণ বেশি। গবেষকরা এর জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা, দূষণনির্ভর অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও অপ্রতুল নীতিগত উদ্যোগকে দায়ী করেছেন।
প্রতিবেদন তৈরিতে বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও নাইজেরিয়ার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, শিল্প-কারখানার নির্গমন, ইটভাটা ও গৃহস্থালির ধোঁয়া, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র এবং যানবাহনের দূষণ শিশুদের ওপর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতি ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু : ২০২১ সালে বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৯ হাজারের বেশি শিশু বায়ুদূষণ সম্পর্কিত কারণে মারা গেছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতি ঘণ্টায় দুই শিশু মারা গেছে। ঢাকা ও অন্যান্য শহরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রাম থেকে আসা মানুষের চাপ বাড়ছে, ফলে ইটভাটানির্ভর নির্মাণশিল্প বেড়ে গিয়ে বায়ুদূষণের বড় উৎস হয়ে উঠেছে।এসব ইটভাটা থেকে নির্গত সূক্ষ্ম বস্তুকণা শিশুদের নিউমোনিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গৃহস্থালি দূষণেও ঝুঁকিতে শিশু ও মা : বাংলাদেশ পরিচ্ছন্ন রান্নার প্রযুক্তি ব্যবহারে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে। এখনো বহু পরিবার কাঠ, কয়লা ও গোবর পোড়ানো চুলা ব্যবহার করে। ফলে গৃহস্থালি দূষণ বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করছে, যার প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও ছোট শিশুদের ওপর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী—উচ্চ দূষণকারী জ্বালানি ব্যবহারকারী মায়েদের নবজাতকের ওজন কম হওয়ার ঝুঁকি ২.৬ গুণ বেশি।দূষিত বাতাস চলাচল করে এমন ঘরে থাকলে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি চার গুণ বেশি। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা কঠিন জ্বালানির ধোঁয়ার মধ্যে থাকলে তাদের মানসিক বিকাশে বিলম্বের ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ বেশি।বিশুদ্ধ বাতাস : সবচেয়ে শক্তিশালী টিকা : নাইজেরিয়ার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জায়নব ইয়ারো বলেন, ‘একটি শিশুকে দেওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী টিকাগুলোর একটি হলো বিশুদ্ধ বাতাস। বিশ্বজুড়ে দূষিত বায়ু শিশুদের বেড়ে ওঠা, শেখা ও বিকশিত হওয়ার সুযোগ নীরবে কেড়ে নিচ্ছে। যখন একটি শিশু নিঃশ্বাস নিতে পারে না, এটি শুধু চিকিৎসা নয়, একটি সামাজিক ও পরিবেশগত অবিচারও।’
বিনিয়োগে বিপরীত চিত্র : প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বাবদ ব্যয় হয়েছে বছরে গড়ে ৫৯৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ এর ১ শতাংশেরও কম অর্থ ব্যয় হয়েছে বায়ুদূষণ মোকাবেলায়। গবেষকরা বলেন, ‘পুঁজির এই ভুল বণ্টন দূষণনির্ভর কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করছে এবং শিশুদের অসুস্থ করে তুলছে। এই নির্ভরতা ভাঙতে হলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশগত ন্যায়ের সমন্বিত রূপান্তর প্রয়োজন।’
সমাধানে যা করা যেতে পারে : প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে—ইটভাটা প্রযুক্তি উন্নত করলে স্বাস্থ্য খাতে সাশ্রয় হবে, যা বিনিয়োগ ব্যয়ের তুলনায় বেশি লাভজনক। পরিচ্ছন্ন রান্নার চুলায় সম্পূর্ণ রূপান্তর ঘটাতে পারলে প্রতিবছর ১৬ হাজারেরও বেশি শিশুমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর বাধ্যতামূলক।
প্রতিবেদনটির প্রধান গবেষক জোয়ান বেন্টলি-ম্যাকক্যুন বলেন, ‘বায়ুদূষণ এখন কেবল পরিবেশগত নয়, ন্যায্যতার প্রশ্ন। শিশুরা মারা যাচ্ছে এমন এক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে, যা তারা তৈরি করেনি।’