সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

গর্ব করার মতো এক অর্জন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে
অন্য জীবন
  • টাইম শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন ২০২৫
দেশের অনেক পথসঞ্চারী গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও ড. তাহমিদ আহমেদের নাম। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক তিনি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন শিশুদের অপুষ্টি এবং ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনা সহজ করে তুলতে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অনেক অর্জনের সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে তাঁর নাম।

টাইমের ‘সামাজিক প্রভাব’ ক্যাটাগরিতে ঠাঁই পেয়েছে আইসিডিডিআরবি এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির দীর্ঘদিনের যৌথ গবেষণার ফসল ‘এমডিসিএফ-২’ (মাইক্রোবায়োটা ডিরেক্টেড কমপ্লিমেন্টারি ফুড)। খাবার স্যালাইনের পর আইসিডিডিআরবির এটি আরেকটি যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে স্বীকৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সম্প্রদায়।ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘এই স্বীকৃতি আমাদের জন্য গভীর অনুপ্রেরণার উৎস। এমডিসিএফ-২ আমাদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে—স্থানীয়ভাবে তৈরি, সাশ্রয়ী সমাধান কোটি কোটি অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুকে কেবল বাঁচিয়ে রাখতেই নয়, বরং পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ দিতেও সাহায্য করতে পারে।

অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারকারী বিশেষ সম্পূরক খাদ্য এটা। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফরি গর্ডনের সঙ্গে যৌথভাবে ছোলা, সয়াবিন, চিনাবাদাম ও কাঁচাকলার গুঁড়ার বিশেষ সংমিশ্রণে এই সম্পূরক খাবার তৈরি করেছেন ড. তাহমিদ। উপাদানগুলো এমনভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে, যেন তা অন্ত্রের ভেতরে থাকা নির্দিষ্ট উপকারী জীবাণুগুলোকে পুষ্টি দিতে পারে। এই জীবাণুগুলো অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্নায়বিক বিকাশে সহায়তা করে।

পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো ড. তাহমিদরাই দেখিয়েছেন শিশুর খর্বকায় হওয়ার সঙ্গে অন্ত্রের কিছু জীবাণু জড়িত।

 

ড. গর্ডন বলেন, ‘বাংলাদেশি শিশুদের নিয়ে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে দেখা গেছে, এমডিসিএফ-২ এই শিশুদের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম পুনর্গঠনে সক্ষম এবং এর প্রভাব অন্ত্রের প্রাচীরের অনেক বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে প্রতীয়মান হয়, অন্ত্রে বিদ্যমান ট্রিলিয়ন জীবাণু শিশুর জন্ম-পরবর্তী বিকাশের বহু দিককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।’

যেভাবে এই উদ্ভাবনের সূত্রপাত

ড. তাহমিদ জানালেন, অপুষ্টির দুটি বড় ধরনের রূপ আছে। একটা খালি চোখে দেখা যায়, অন্যটা যায় না। যেটাকে অনুপুষ্টি বা মাইক্রোনিউট্রিয়ান্টের ঘাটতি বলে। যেমন—রক্তস্বল্পতা, শরীরে আয়োডিন ও অন্যান্য ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি। আরেকটি বড় ধরনের অপুষ্টি আছে, যেটা চোখে দেখা যায়। যেমন—হাড় লিকলিকে বা কৃশকায় শিশু, খাটো শিশু, আরেক ধরনের শিশু আছে, যাদের ওজন বাড়ছে না। সাধারণ শিশুর চেয়ে খর্বকায় শিশুর মৃত্যুঝুঁকি তিন থেকে চার গুণ বেশি। বেঁচে থাকলেও এসব শিশুর মস্তিষ্কের কোষ ভালোভাবে বিকশিত হয় না। ফলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কম হয়।

২০০০ সালের দিকে প্রথমবারের মতো আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধানের চেষ্টা করেন—কেন শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। আমেরিকার ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের অধ্যাপক জেফরি গর্ডন তখন স্থূলতা নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি দেখলেন, স্থূলতায় ভোগা মানুষের অন্ত্রে এক ধরনের জীবাণু (মাইক্রোবায়োটা) বেশি থাকে। ২০১০-১১ সালের কথা। একদিন মিটিংয়ের ফাঁকে নাশতা করার সময় ড. তাহমিদ তাঁকে বললেন, ‘তুমি স্থূলতা নিয়ে কাজ করছ। জীর্ণশীর্ণ, কৃশকায় শিশুদের নিয়েই আমার কাজ। আমার মনে হয়, যদি বিশেষ মাইক্রোবায়োটা স্থূলতার জন্য দায়ী হয়, তাহলে চিকন স্বাস্থ্যের জন্যও নির্দিষ্ট মাইক্রোবায়োটা দায়ী থাকতে পারে।’

সেই থেকে যৌথভাবে কাজ শুরু করলেন এই দুই বিজ্ঞানী। মিরপুরের বস্তিতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী শিশু এবং আইসিডিডিআরবিতে ভর্তি হওয়া তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটা নমুনা সংগ্রহ করলেন। বিশ্লেষণে দেখা গেল, স্বাস্থ্যবান শিশুদের মলের মধ্যে বৈচিত্র্যময় ব্যাকটেরিয়া প্রচুর। অন্যদিকে অপুষ্টির শিকার শিশুদের অন্ত্রে মাইক্রোবায়োটা অপরিণত এবং কম বৈচিত্র্যপূর্ণ। বুঝলেন, মাইক্রোবায়োটা বা জীবাণুর সঙ্গে অপুষ্টির একটা সম্পর্ক আছে। এখন এটা কারণ, না ফল তা জানার জন্য আফ্রিকার মালাবিতে গবেষণা করলেন। সেখানেও বাংলাদেশি বাচ্চাদের মতো মাইক্রোবায়োটার একই রকম প্যাটার্ন দেখা গেল। বুঝলেন, মাইক্রোবায়োটার দুর্বলতা হচ্ছে অপুষ্টির কারণ। পরে নিজের ল্যাবরেটরিতে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করলেন জেফরি গর্ডন। দেখা গেল, যে ইঁদুরগুলো মিরপুরের মাইক্রোবায়োটা পেল তাদের ওজন সমানভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে সেসব ইঁদুর অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মাইক্রোবায়োটা পেল তাদের ওজন কমে গেল। পরে ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের পুষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত করলেন। এ ধরনের ভালো ব্যাকটেরিয়া যদি শরীরের মধ্যে বেশি হয়, তাহলে শিশুদের বৃদ্ধি ভালো হবে।

 

জেফরি গর্ডন

অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহজ হাতিয়ার

বিশ্বব্যাপী শিশুদের জীবন রক্ষা ও বিকাশের পথে অপুষ্টি এখনো একটি বিরাট বাধা। পাঁচ বছরের কম বয়সী মোট শিশুমৃত্যুর প্রায় অর্ধেকের জন্য এটা দায়ী।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলতে পারে—এ রকম সমস্যারও একেবারে সামনের দিকে আছে শিশু অপুষ্টি। অপুষ্ট মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়া বেশির ভাগ শিশুও হয় অপুষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, অপুষ্ট শিশুদের পরিপাকতন্ত্র সুগঠিত না হওয়ায় তাদের শরীরে খাবারের পুষ্টি পূর্ণমাত্রায় শোষিত হয় না। এর ফলে শিশুরা খর্বকায় এবং কৃশকায় হয়।

‘এমডিসিএফ-২’ উদ্ভাবনের মাধ্যমে অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য পৃথিবীকে সহজলভ্য একটি হাতিয়ার উপহার দিয়েছেন ড. তাহমিদ ও ড. গর্ডন। সাশ্রয়ী বলে বিশ্বজুড়ে সব অপুষ্ট শিশুই এর উপকার পাবে।

তাঁদের গবেষণালব্ধ তথ্য নিয়ে প্রথম দুটি আর্টিকল ছাপা হয় বিখ্যাত ‘সায়েন্স’ জার্নালে। এই উদ্ভাবনকে ২০১৯ সালের বিশেষ ১০টি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির একটি বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল সায়েন্স সাময়িকী।

 

টাইমের ওয়েবসাইটে ড. তাহমিদের উদ্ভাবনের খবর

জেনেভার চেয়ে তোমাকে এখানেই বেশি দরকার

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ড. তাহমিদ। জন্ম ময়মনসিংহে। ১৯৮৩ সালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে ঈশ্বরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ পান। বছরখানেক পর চলে আসেন ঢাকায়। মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগ দেন আইসিডিডিআরবিতে।

বয়স্কদের অগ্ন্যাশয়ে (প্যানক্রিয়াস) কলেরা কী প্রভাব ফেলে তা নিয়েই গবেষণাজীবন শুরু করেছিলেন ড. তাহমিদ। পিএইচডি করেছেন জাপানের ইউনিভার্সিটি অব সুকুবায়। দেশে ফিরে শিশু ও নারীর অপুষ্টি, নিউমোনিয়া, টিবি, কলেরা ইত্যাদি নিয়ে কাজ করলেন।

তীব্র অপুষ্টি ও রাতকানা রোগের শিকার শিশুদের নিয়েও গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণার ফল মা এবং অল্পবয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর সরকারি কার্যক্রম জোরদারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। এক পর্যায়ে ডায়রিয়া এবং তীব্র অপুষ্টি নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট একটি চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করলেন। পরে ল্যানসেটে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রশংসা করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুষ্টি বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দলের সদস্য হয়ে কাজ করেছেন সুদান, দক্ষিণ সুদান, লেবানন, আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, মায়ানমার এবং উত্তর কোরিয়ায়। ২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন। আইসিডিডিআরবির তত্কালীন নির্বাহী পরিচালক বললেন, ‘জেনেভার চেয়ে তোমাকে এখানেই বেশি দরকার।’ পরে দেশেই থেকে গেলেন ড. তাহমিদ। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০২১ সালে আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব নেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে হার্ট অ্যাটাক, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগ এবং এর চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। শিশুপুষ্টি নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য গত বছর বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে ‘গোলকিপারস চ্যাম্পিয়ন ২০২৪’ সম্মাননা পেয়েছিলেন ড. তাহমিদ।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com