সাহিত্যে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর নাম ঘোষণা করে রয়াল সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ম্যাটস মালম বলেন, ‘তাঁর সৃষ্টিকর্ম মনোমুগ্ধকর ও দূরদর্শী, যা মহাপ্রলয়ের আশঙ্কার মধ্যেও শিল্পের শক্তিকে প্রতিবিম্বিত করে।’
নোবেল কমিটি বিবৃতিতে বলেছে, লাসলো ক্রাসনাহোরকাই মধ্য ইউরোপীয় পরম্পরার একজন মহান মহাকাব্যিক লেখক, যাঁর ধারায় বিস্তার রয়েছে কাফকা থেকে থমাস বার্নহার্ড পর্যন্ত এবং যিনি অসংগতি ও অতিমাত্রায় অতিরঞ্জনের জন্য পরিচিত। তবে তাঁর কাজের পরিধি আরো বিস্তৃত।
ক্রাসনাহোরকাইয়ের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মেলানকোলি অব রেসিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধের বিষণ্নতা’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। উপন্যাসটিতে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের চিত্র আঁকা হয়েছে। পাহাড়ে অবস্থিত একটি ছোট শহর কার্পাথিয়ানে প্রবেশ করে একটি প্রেতাত্মাসদৃশ সার্কাসদল, যার মূল আকর্ষণ একটি বিশাল তিমির মৃতদেহ। এই উদ্ভট ও আশঙ্কাজনক ঘটনা শহরের ভেতর নানা রকম ধ্বংসাত্মক শক্তিকে উসকে দেয়। সহিংসতা, অরাজকতা এবং সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা শহরটিকে নিয়ে যায় স্বৈরাচারী অভ্যুত্থানের দ্বারপ্রান্তে। লেখক চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে নৃশংস দ্বন্দ্ব, যা থেকে কেউই মুক্ত নয়।
তৃতীয় উপন্যাসে এসে লেখক বেছে নেন হাঙ্গেরির সীমানার বাইরের প্রেক্ষাপট। ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ (১৯৯৯ সালে প্রকাশিত, ইংরেজি অনুবাদ ২০০৬) নামের উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন সাধারণ আর্কাইভ কর্মচারী, যিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্তে নিউইয়র্কে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ‘সেইবো দেয়ার বিলো’ ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়।
২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘হারশট ০৭৭৬৯’ বইটিকে সমকালীন জার্মান সাহিত্যের একটি অনন্য উপন্যাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কভিড মহামারির ঠিক আগে দেশটির সামাজিক অস্থিরতার চিত্র সেখানে ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসের গল্প এগিয়েছে জার্মানির ছোট শহর থুরিঙ্গেনের সামাজিক অরাজকতা, হত্যা আর জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে। ২০২৫ সালে ‘হারশট ০৭৭৬৯’ উপন্যাসের জন্য তিনি সুইডেনের ‘কুলতুরহুসেট সিটি থিয়েটার’ আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এর পর থেকেই তাঁর নাম নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার জল্পনা শুরু হয়। সুইডিশ মিডিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমি মিথ্যা বলব না। মনে মনে নোবেল পুরস্কারটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার অনেক আগে থেকেই ছিল। যদি আমি এটি পাইও, তাহলে খুবই অবাক হব।’
ক্রাসনাহোরকাইয়ের সর্বশেষ ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস ‘জস্মলে ওদাভান’ পাঠককে আবার হাঙ্গেরিতে ফিরিয়ে নেয়। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ৯১ বছর বয়সী আংকল জোজসি কাদা সিংহাসনের গোপন দাবিদার, কিন্তু সে বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে থাকতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যায়।
ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাস, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ প্রধানত জার্মানিতে পরিচিত। দেশটিতে তিনি দীর্ঘ সময় বসবাস করেছেন। হাঙ্গেরিতে তাঁকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবিত লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক দিন ধরেই নোবেল পুরস্কারের জন্য আলোচিত শর্ট লিস্টে ছিলেন তিনি। এ বছর গেমিং কম্পানিগুলোর তালিকায়ও তাঁর নাম শীর্ষে ছিল। আমেরিকান সাহিত্য সমালোচক সুসান সোন্ট্যাগ ক্রাসনাহোরকাইকে সমসাময়িককালের সাহিত্যে ‘সর্বনাশের মহাকর্তা’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন।
ক্রাসনাহোরকাইকে একজন মন্ত্রমুগ্ধকর লেখক বলে অভিহিত করেছেন তাঁর উপন্যাসের ইংরেজি ভাষার অনুবাদক কবি জর্জ সির্তেস। তাঁর কথায়, ‘তিনি আপনাকে এমনভাবে আকৃষ্ট করেন যে তিনি যে জগতের চিত্র আঁকেন, তা বারবার আপনার ভেতরে প্রতিধ্বনিত হয়, যতক্ষণ না তা আপনার নিজের শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠে।’
সমালোচকদের জন্য কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হলেও ক্রাসনাহোরকাই একবার নিজের লেখার শৈলীকে বর্ণনা করেছিলেন ‘পাগলামির সীমা পর্যন্ত বাস্তবতার পরীক্ষা’ হিসেবে। দীর্ঘ বাক্য ও কম অনুচ্ছেদ ব্যবহারের জন্য লেখককে অনেক সময় ‘অতি মনোযোগী’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে একটি ডিপ্লোমা, একটি স্বর্ণপদক এবং এক কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার। রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ আগামী ১০ ডিসেম্বর নোবেল দিবসে স্টকহোম কনসার্ট হলে বিজয়ীকে এই পুরস্কার প্রদান করবেন।