কাল বাদে পরশু [১১ অক্টোবর] অপু বিশ্বাসের জন্মদিন। আবার আগামী মাসেই [৫ নভেম্বর] চলচ্চিত্রজীবনের দুই দশক পূর্ণ হবে তাঁর। দুটি উপলক্ষ হাতে নিয়ে কামরুল ইসলামের কাছে কথার ঝাঁপি খুলেছেন অভিনেত্রী
দ্বিতীয় ছবি ‘কোটি টাকার কাবিন’ [২০০৬] দিয়েই তারকা হয়ে ওঠেন অপু। পরের গল্পটা শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু কোনো ছবির ক্ষেত্রে প্রথম মনে হয়েছে, অভিনয়টা পরিপূর্ণ হলো? উত্তরের জন্য ভাবতে হয়নি, মুহূর্তেই বলে দিলেন চাষী নজরুল ইসলামের ‘দেবদাস’-এর কথা। “চরিত্রের জন্য আমি বরাবরই কাদামাটি। পরিচালক আমাকে যেভাবে উপস্থাপন করতে চান, সেভাবেই চেষ্টা করি। ‘দেবদাস’-এ চাষী আঙ্কেল আমাকে কাদামাটি থেকে গড়ে তুলেছিলেন। মনে আছে, পার্বতীর বিভিন্ন কান্নার দৃশ্যে আমার গ্লিসারিন ব্যবহার করতে হয়নি। চরিত্রের সঙ্গে এতটাই মিশে গিয়েছিলাম। এ রকম আরেকটা ছবির কথাও বলতে চাই—‘ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’। এটাতে অভিনয় করেও তৃপ্তি পেয়েছি”-বললেন অপু।
দুই দশকের ক্যারিয়ার অপুর। এর মধ্যে দ্বিতীয় দশকে বড় পর্দায় তাঁর তেমন উপস্থিতি নেই। কয়েকটি ছবি এসেছে বটে, কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তিটা ঘটেনি। প্রথম দশকের উজ্জ্বল অপু দ্বিতীয় দশকে এমন ম্লান হয়ে গেল কেন? এর জবাবে ইন্ডাস্ট্রির সামগ্রিক অবস্থার দিকেই আঙুল তুললেন অভিনেত্রী। পাশাপাশি নিজের ক্যারিয়ারে কিছুটা বাঁক-বদলের কথাও জানালেন। অপুর ভাষ্য, ‘এফডিসিতে ৯টা ফ্লোর ছিল, প্রথম দশকে সেই নয় ফ্লোরে একযোগে আমার ছবির শুটিং হয়েছে। আসলে আমি যখন যে কাজে ফোকাসড থাকি, সেখানে আমার উপস্থিতিই সবার চেয়ে এগিয়ে। ২০০৯ থেকে ২০১৬-এর শুরু পর্যন্ত নায়িকা বলতে অপু বিশ্বাসই ছিল। এরপর তিন বছরের একটা গ্যাপ। সন্তান হয়েছে, আমার শারীরিক পরিবর্তন ঘটেছে। সেখান থেকে ফিট হয়ে ফিরতে হয়েছে। ফিরেই নজর দিয়েছি পাবলিক রিলেশন, ব্র্যান্ড প্রমোশনে। এখন দেখুন, এই সেক্টরে আমার চেয়ে এগিয়ে কেউ আছে?’
তবু ছবির কথা তো থেকেই যায়। সেটা নিয়েও নিজের ব্যাখ্যাটা দিলেন, ‘গত কয়েক বছরে যেসব ছবি সফল হয়েছে, সেসব ছবির নায়ক-নায়িকার তো তিন বছরে কমপক্ষে ৩০টা ছবি আসার কথা। অপু বিশ্বাস তো করেছে। তারা কেন করতে পারেনি, এ প্রশ্নটা করা উচিত। তার মানে অপু বিশ্বাস কাজ করলে দর্শক থেকে শুরু করে সমালোচক, সবার মনোযোগ চলে আসে। ব্যাপারটা এমন, অপু কাজ করলেই ছবি হচ্ছে, না করলে হচ্ছে না।’
বড় পর্দা থেকে কিছুটা সরে গিয়ে অপু এখন প্রচারণামূলক কাজে সময় দিচ্ছেন। পাশাপাশি নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু নায়িকা অপুর যে ভাবমূর্তি, সেটার ভ্যালু এখনো চড়া। যেটাকে ‘ভাঙিয়ে’ ফায়দা নিচ্ছে অনেকে। এটাকে অবশ্য নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন না অপু; বরং তাঁর চাওয়া এমনই। যেহেতু পাবলিক রিলেশন সেক্টরে আছেন, তাঁকে ঘিরেই যেন মজমা জমে থাকে। আর যেদিন সিদ্ধান্ত নেবেন, শুধুই নিজের ব্যবসায় মনোযোগী হবেন; তখন থেকে পর্দার মানুষেরা তাঁর ছায়াও দেখবে না।
চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। ইন্ডাস্ট্রির ভালো-মন্দ অনেক কিছুই দেখেছেন। তাঁর পরামর্শের বাড়তি ওজন আছে। সুতরাং যে তরুণী এই মুহূর্তে ভাবছে চলচ্চিত্রের নায়িকা হবে, তাঁর জন্য অপুর পরামর্শ জানা যাক; ‘যে কাজটি করবেন, সেটার ব্যাকগ্রাউন্ড নিশ্চিত করতে হবে। আর দ্বিতীয় কথা, কাজে ফোকাস রাখা। যেটাই করবেন, প্রতি পূর্ণ মনোযোগী থাকতে হবে’—বললেন অপু।
এবার একটু ব্যক্তিজীবনের প্রসঙ্গে আসা যাক। গত কয়েক বছরে অপুর বিয়ে, সংসার, সন্তান, শাকিব খান—বিভিন্ন বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। বেশির ভাগ সময় চর্চার নৌকা ডুবেছে নেতিবাচক ঝড়ে। কখনো মনে হয় এসব এড়ানো যেত? অপুর জবাব, ‘মনে তো হয়ই। অপু বিশ্বাসের শুরুর দিকে তো ব্যক্তিগত কোনো চর্চাই ছিল না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর থেকে শুরু হয়েছে। যে প্রসঙ্গ থেকে শুরু হয়েছে, সেটা আমি চাইলেও হয়তো এড়ানো সম্ভব ছিল না। কারণ এই চর্চার সঙ্গে মিডিয়ার মানুষরাও রিলেটেড। তবু মাঝে মাঝেই মনে হয়, আমরাও তো মানুষ, আমাদেরও পরিবার আছে, মানসিক শান্তির দরকার আছে। দর্শককে আমি কাজ দিয়েছি, সেটা নিয়ে চর্চাটা হোক। কিন্তু যেটা দিতে চাইনি, সেটা নিয়ে এত চর্চা আসলে বিরক্তের কারণ। যাইহোক, এটার জন্য নিয়তিকে দোষ দেব। হয়তো আমার প্রাপ্যই ছিল এসব।’
মানসিক প্রশান্তির কথাটা বারবার উঠে আসছে। এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতা ক্রমে বাড়ছে। এত কাজ, এত চর্চার ভিড়ে নিজেকে শান্ত রাখার জন্য চেনা পথেই হাঁটেন অপু। সৃষ্টিকর্তার কাছে সঁপে দেন নিজেকে। ওই যে দিনভর ঘোরাঘুরি শেষে কাপড়ে ময়লা-দাগ লাগে, ধোয়ার পর সেটা মুছে যায়, পরিষ্কার হয়ে যায়। অপু মনে করেন, মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তেমনই। যত অবসাদ, অশান্তি থাকুক না কেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলে সেই ঝড় থেমে যায়। সেই সঙ্গে অপুর আরেকটা জাদু আছে, নাম জয়। হ্যাঁ, পুত্র জয়ের কথাই বললেন। ছেলের মুখটা দেখলে, তার সঙ্গে খুনসুটি করলে জগতের সব জটিলতা মুহূর্তেই ভুলে যান অপু।
আবার একটু কাজের কথায় ফেরা যাক। অনেক দিন তো হয়ে গেল, নতুন ছবির খবর নেই। অভিনয়টা কি ছেড়েই দিলেন? না, আশার বাণী পাওয়া গেল তাঁর কণ্ঠে। জানালেন, নতুন ছবিতে যুক্ত হয়েছেন। শিগগির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে সেগুলোর ঘোষণা আসবে। অপু বলেন, ‘এখন তো অনেক ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হয়। আমার কাছে অনেক ছবির প্রস্তাব আসে। কিন্তু চাইলেই যেকোনো ছবি করা তো সম্ভব না।’ আর প্রযোজনা? ‘লালশাড়ি’ [২০২৩] দিয়ে ছবি প্রযোজনা শুরু করেছিলেন। সেদিকে আপাতত আর ফিরছেন না। অভিনয় আর নিজের ব্যবসার দিকেই মনোযোগ রাখতে চান।
আলাপটা শেষ করা দরকার। কী দিয়ে করা যায়? যেহেতু তিনি বিশ্বাস, বিশ্বাসের কথা দিয়েই হোক। অপু কিসে বিশ্বাস করেন, ভাগ্য নাকি কাজে? অভিনেত্রীর সোজা উত্তর, ‘কাজে’।
অপুর চোখে নিজের সেরা ৫ ছবি

কোটি টাকার কাবিন [২০০৬]

দেবদাস [২০১৩]

এক বুক ভালোবাসা [২০০৮]

কে আপন কে পর [২০১১]

পিতা-মাতার আমানত [২০০৮]