এক সকালে নৌকায় চেপে চাঁদপুরে ডাকাতিয়া নদী থেকে মেঘনার দিকে যেতে যেতে দেখেছি পাড়ে বসে ব্যস্ত হাতে বাসনকোসন ধুয়ে নিচ্ছেন নারীরা। আরেক সকালে ঢাকাতে বুড়িগঙ্গা থেকে তুরাগে যেতে যেতেও দেখলাম নারীর সেই কর্মযজ্ঞ। রাণীশংকৈলে কুলিক নদীর জলে উল্টেপাল্টে বাঁশের ফালি ধুয়ে নিতে দেখলাম এক নারীকে। খুলনায় কাজীবাছা নদী, রূপসা নদীর আশপাশের নারীরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন আইলা ঝড়ে লন্ডভন্ড পরিবার, গ্রামকে স্বাবলম্বী করতে। বন্যাকালে পত্রিকায় দেখেছি বুকসমান পানিতে হেঁটে-ভেসে দুই হাতে হাঁস-মুরগি আগলে শুকনো আশ্রয়ে ওঠার চেষ্টারত নারীকে। বুকের ওপর সন্তানকে চাপিয়ে বেনোজল পেরিয়ে যেতে যেতে প্রতিবার ক্যামেরাবন্দি হয় কোনো এক নারী।
২০০৩ সালে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবে ৮০০ জনের মৃত্যুশোক এখনও কাতর করে ভোলাবাসীকে। দেশে লঞ্চডুবির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ দুর্ঘটনায় অন্তত ১১০ জন নারী নিহত হয়েছিলেন। তারা কেউ গৃহিণী, কেউ গৃহপরিচারিকা, কেউ শিশু-বৃদ্ধ। ২০০৪ সালের ২৩ মে মেঘনা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় মাকে হারিয়েছেন নোঙর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সুমন শামস।
দক্ষিণের নারীদের এক অংশ নদীতে রেণু পোনা আহরণকে জীবিকা করেছেন। অনেক নারী মাছ ধরে উপার্জন করেন। বিশেষ করে আইলা-পরবর্তী সময়ে উপকূলীয় এলাকায় পানি হয়ে উঠেছে লবণাক্ত। এই নোনাজলে নারীর শাড়ি-কাপড় টিকছে না যেমন; তেমনি হচ্ছে চর্মরোগ, গর্ভপাত এবং স্পর্শকাতর অঙ্গে বাড়ছে সংক্রমণ। জরায়ু ফেলে দিতে হচ্ছে অসুখে অথবা দালালের খপ্পরে পড়ে। নারীর সংসারজীবনেও এসবের প্রভাব পড়ছে। এমন বৈরী বাতাসেও নদীবর্তী নারী ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে চলেন নদী-প্রকৃতিকে সাথী করেই। কারণ নারী নদীকে চিনেছেন গভীরভাবে। তাই সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নদী নিয়ে কাজ করতে গেলে যে নদীনীতি জরুরি, তা নারীকে প্রাধান্য দিয়ে রচনা করা সমীচীন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নারী সবখানেই নদীবর্তী। সেই নিরিখে নদী ও নারীর বয়ে চলায় প্রাথমিক পঞ্চনীতি প্রস্তাবনা সবার দৃষ্টিসীমায় তুলে ধরতে চাই।
কৃষিশুমারি করে ‘গরু ও ছাগলের সংখ্যা বেশ বেড়েছে’ জানা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওয়েবসাইটেও এ পরিসংখ্যান মেলে। অথচ দেশে মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ সাঁতার জানে তা জানা যায় না। ফলে কোন বয়সী, পেশাজীবী, অঞ্চলের নারী কোন দক্ষতা স্তরে সাঁতার জানেন, তাও বলা যাচ্ছে না। এ জন্য প্রতিবছর জাতীয় সাঁতারশুমারির উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে সাঁতারে দক্ষ নাগরিকদের অনলাইন নিবন্ধনও চালু করা যায়। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সমন্বয় করলে এ ধরনের ডেটাবেজ আরও সমৃদ্ধ হবে। সুইমিং পুলে সাঁতরানো আর নদীতে সাঁতরানোর জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক-মানসিক দক্ষতার স্তরও এক ধরনের নয়। এ জন্য সাঁতারের দক্ষতা স্তর ও এর সংজ্ঞা নির্ণয় করতে হবে বিশেষজ্ঞ দিয়ে। দেশে ডুবুরি সংখ্যা এমনিতেই কম। ডুবুরি সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি এ পেশায় নারীর প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান করতে হবে।
দুই. নৌপথে অন্তঃসত্ত্বার ভ্রমণ নীতিমালা
উড়োজাহাজ ভ্রমণে অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ নিয়ম প্রযোজ্য। যেমন বাংলাদেশ বিমান, টার্কিশ এয়ারলাইন্স, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ওয়েবসাইটে আকাশপথে ভ্রমণে গর্ভকালের কোন ধাপ নিরাপদ হবে সেসব পরামর্শ আছে। চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স সেবা নেওয়ার বিষয়েও বলা হয় সাধারণত। কিন্তু নৌপথে অন্তঃসত্ত্বা নারীর ভ্রমণে বাংলাদেশে বিশেষ কোনো সতর্কতা দেখা যায় না। সচেতনতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে নারীর অন্তঃসত্ত্বাকালে পারাপারের নৌকা, পর্যটন নৌকা, লঞ্চ, জাহাজ ভ্রমণে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, প্রদর্শন প্রচারণা এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।
স্যানিটারি প্যাড পরে না বৃষ্টিতে ভেজা যায়, না নদীতে নামা যায়। প্রতিমাসে পাঁচ থেকে সাত দিন নারীর এই অস্বস্তি বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয়। বিশ্বে আধুনিক ও পরিবেশ সচেতন নারীরা ঝুঁকছেন মেনস্ট্রুয়াল কাপে। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে মেনস্ট্রুয়াল কাপের সচেতনতা বাড়াতে হবে। নৌপথে দুর্ঘটনার কথা বিবেচনায় রাখলে সতর্কতা হিসেবে মেনস্ট্রুয়াল কাপ কার্যকর।
চার. নদীবর্তী নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য
বন্যায় সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা কার্যক্রমে স্বভাবতই শুকনো খাবার ও ওষুধ থাকে। এর সঙ্গে সরকারি পর্যায় থেকে নীতিগতভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন যোগ করতে হবে। যদিও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকাকালীন নারীর পক্ষে স্যানিটারি ন্যাপকিনে পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা সহজ নয়। বরং মেনস্ট্রুয়াল কাপ ঝঞ্ঝাট অনেকটা কমাবে। দক্ষিণের নারীদের বেলাতেও জরায়ু সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে মেনস্ট্রুয়াল কাপ। গ্রামে যারা নোনাপানিতে মাসিকের কাপড় ধুয়ে থাকে, মেনস্ট্রুয়াল কাপে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মেনস্ট্রুয়াল কাপ পরার প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানোর নীতিমালা নিতে হবে।
পাঁচ. নদীবর্তী নারীর জীবিকা সংরক্ষণ আইন
নদী দখল, দূষণ বেড়ে চলার বিপরীতে জীববৈচিত্র্য-মৎস্যসম্পদের বিপন্ন হওয়াতে নারীর জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারপরও নদীভাঙন, বন্যা ও পলি জমা চ্যালেঞ্জের মুখেও নারীরা এসব অঞ্চলে কৃষিকাজে অংশ নেন। নদীবর্তী অঞ্চলে কৃষিতে সবজি বপন, নিড়ানি, আগাছা পরিষ্কারে কাজ করছেন নারী। নারী কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় ভাসমান কৃষিও বাড়ানো সম্ভব।
প্রসঙ্গত, এসব নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সফলতা পেতে জরিপ, গবেষণা, পরিসংখ্যান, লেখচিত্রে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ আবশ্যক। ধারাবাহিক গবেষণা ছাড়া নদী ও নারীর সম্পর্কে সমতা বিধান সম্ভব হবে না আদৌ।