সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

পারিবারিক সহিংসতা ও নারীর অধিকার

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার পড়া হয়েছে

নারীকে বলা হয়– ‘সহ্য করো, সংসার তো ভেঙে যাবে!’ এই সহ্য করার সংস্কৃতি নারীকে নীরব করে তোলে। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর না হওয়ার কারণে অনেক নারী পরিবার ছেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন না। ফলে নির্যাতন চলতেই থাকে। :  শাহিনা ফেরদৌসী, সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা একটি পুরোনো ও গভীর সামাজিক সমস্যা। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতা এমন এক ধরনের সহিংসতা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘরের ভেতরে ঘটে এবং সামাজিক মানদণ্ড ও কুসংস্কারমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আড়ালেই থেকে যায়। নারীকে তারই পরিবারে মানসিক, শারীরিক, আর্থিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় প্রতিনিয়ত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো–এই অপরাধের বড় অংশই বিচারহীন থেকে যায়। ফলে, ভুক্তভোগী নারী তাঁর অধিকার ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং সহিংসতার চক্র ভাঙার পরিবর্তে সেটি আরও পোক্ত হয়।
নানা কারণে বাংলাদেশে বিচারহীনতার একটি সাংস্কৃতিক রূপ তৈরি হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী অভিযোগ করতে গেলেও নানা সামাজিক বাধা, পারিবারিক চাপ, আর্থিক নির্ভরতা ও আইনি জটিলতার কারণে পিছিয়ে আসেন। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা সালিশি প্রথার মাধ্যমে বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করার চেষ্টা হয়। এর ফলে অপরাধী দায়মুক্তি পেয়ে যায় এবং নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ রয়েছে। এর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে আছে মূলত কাগজে-কলমে। মামলা করতে গিয়ে নারীকে যে প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়, তা প্রায়ই নির্যাতনের দ্বিতীয় ধাপ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় থানা কর্তৃপক্ষ মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে অথবা ‘পারিবারিক বিষয়’ উল্লেখ করে তা এড়িয়ে যায় বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। এছাড়াও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা ভুক্তভোগীকে আরও নিরুৎসাহিত করে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ সময়ে অন্তত ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছেন ৩২২ জন নারী, যার মধ্যে অন্তত ১১৩ জনকে হত্যার অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে। এ সব সহিংসতায় যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া-সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়ে জানা যায়, মোট মামলা হয়েছে ৬৪টি, বাকি ৬৯টি হত্যায় মামলার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সংগঠনটির পরিসংখ্যান বিষয়ে জানা যায়, ১০টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তার মানে এই পরিসংখ্যান থেকে পারিবারিক সহিংসতার সংখ্যাগত ধারণা পেলেও প্রকৃত সহিংসতার সংখ্যা বাস্তবে অনেক বেশি হতে পারে। সহিংসতার সব সংবাদ গণমাধ্যমে নাও আসতে পারে।
নারী অধিকার বাস্তবায়নে সমস্যার একটি বড় অংশ নিহিত রয়েছে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। এখনও অনেক পরিবারে নারীর প্রতি সহিংসতাকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘পারিবারিক বিষয়’ হিসেবে দেখা হয়। নারীকে বলা হয়– ‘সহ্য করো, সংসার তো ভেঙে যাবে!’ এই সহ্য করার সংস্কৃতি নারীকে নীরব করে তোলে। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর না হওয়ার কারণে অনেক নারী পরিবার ছেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন না। ফলে নির্যাতন চলতেই থাকে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আইন প্রণয়ন করা নয়, বরং সেই আইন কার্যকর করার জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ভুক্তভোগী নারীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয় করা প্রয়োজন।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি মানবাধিকার ও নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এ সকল সংগঠন নারী ভুক্তভোগীদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা, সেফ হোম ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করতে পারে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচার, সামাজিক প্রচারণা এবং তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করে যৌথভাবে সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
নারীকে নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেওয়া মানে কেবল একজন মানুষকে রক্ষা করা নয়, বরং একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা। এখনই সময়–রাষ্ট্র, সমাজ ও সব নাগরিক মিলে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com