সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

জনপ্রিয়তা, বইয়ের কাটতি এবং লেখকের কর্তব্য

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

রাজু আলাউদ্দিন

কেমন হবে একটি বই? তার লক্ষ্য কি জনরঞ্জন নাকি হবে এমন এক অন্বেষণ যেখানে পাঠক নিজের স্বপ্ন, ভয়, কল্পনা, ক্লেদ, ভীতি, অনির্বচনীয় উপলব্ধি আর হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে অভিভূত হওয়ার আনন্দ আবিষ্কার করবেন? এবং প্রশ্ন এটাও : বইকে আমরা দেব নাকি বইয়ের কাছ থেকে নেব? দেওয়া বলতে আপনার মূল্যবান সময় আর নেওয়া মানে একটি বইয়ের কাছে আমাদের প্রত্যাশা। আপনি যদি বলেন বই আপনি স্রেফ বিনোদনের জন্য পাঠ করেন—বেশ, এর চেয়ে যথার্থ উত্তর আর কী-ই বা হতে পারে! দুরধিগম্য, লেখকদের লেখক হিসেবে বিবেচিত হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো লেখকও আপনাকে এই পরামর্শই দেবেন: পড়াটা আনন্দের জন্য, যে-বই পড়তে ভালো লাগবে না, তা জোর করে পড়বেন না। অর্থাৎ আনন্দটাই মুখ্য। জগত্টা যদি আনন্দেরই না হবে, তাহলে এই জীবনের কিবা অর্থ।

তবু প্রাপ্তি হিসেবে আপনি ওই ক্ষণস্থায়ী বিনোদনের কথা বলতে পারেন, তারও নিশ্চয়ই গুরুত্ব ও মূল্য আছে। কিন্তু আমি আপনাকে এমন কিছু বইয়ের নাম বলতে পারি যেগুলো আপনার কাছ থেকে যা নেয়, তা সহস্র গুণে ফিরিয়ে দেয়। বইটিতে বিনোদন বা আনন্দ নিশ্চয়ই এক অক্ষর, কিন্তু এর অক্ষর থেকে অঙ্কুরিত হবে চারা, চারা থেকে বেরোবে অর্থের ডালপালা, আপনার মনের মধ্যে জন্ম নেবে আর্গাসের মতো শত চক্ষু, যা ওই মনোরঞ্জনী গ্রন্থগুলোর নেই। মনোরঞ্জনী গ্রন্থগুলো জনপ্রিয় হয় পাঠককে আরাম দেওয়ার জন্য, এক নিঃসাড় ও অসার আরাম, যা থেকে জন্মায় না কিছু; এ ধরনের বই পাঠককে নির্মাণ ও সৃষ্টি করার জন্য নয়, আপনাকে তছনছ করার জন্যও নয়।
কিন্তু অন্য যে বইগুলোর কথা বলছি, যেগুলো কালের উজান ঠেলে আপনার হাতে এসে পৌঁছায়, সেগুলো আপনার মধ্যে তৈরি করবে পাঠের ক্ষত, কিন্তু তা বরণীয়। কেননা জ্ঞান থেকেই বেদনার শুরু। কিন্তু এই ক্ষত ও বেদনা ফ্রান্সিস্কো দে কেবেদোর সেই কবিতার মতো : ‘এ তো সেই ক্ষত এক; ব্যথা দেয় কিন্তু তা পাবে নাকো টের।’ আপনার গহিনে সৃষ্ট এই ক্ষত আপনাকে সারিয়ে তোলার জন্য। এ এমন এক অসুস্থতা যে শুধু সুস্থতারই জন্ম দেয়।
এ হবে এমন এক বই, যা আপনাকে ও পরিপার্শ্বকে, ব্যক্তি ও সমষ্টিকে ঘূর্ণিপাক ও পঙ্ক থেকে উদ্ধার করে আপনার হাতে তুলে দেবে তাদের আসল চেহারা। আপনি হয়তো ভয় পাবেন, আপনি হয়তো অভিভূত হবেন, আপনি হয়তো বিস্মিত হবেন, কিংবা আপনার মধ্যে ঘটবে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। আপনি অবাক হয়ে ভাববেন ‘কেমনে পশিল প্রাণের পর/কেমনে পশিল গুহার আঁধারের প্রভাত পাখির গান’। এ রকম বই-ই শুধু আপনাকে জাগ্রত করতে পারে এই উপলব্ধিতে যে ‘যেসব গান আমরা শুনি, আমরা নিজেরাই হয়ে উঠতে পারি সেই গান।’ এ রকম বই আপনার সঙ্গে শুধু কথাই বলে না, আপনাকেই সে গানে রূপান্তরিত করে। এমন কোনো বইয়ের কথা কি আপনি কখনো ভেবেছেন, যা আপনাকে শুধু বিনোদনই নয়, বরং বিনোদনের পাশাপাশি আরো স্থায়ী ও মূল্যবান কিছু দিতে পারে, যা আপনাকে বিনোদনের মাধ্যমেই সমৃদ্ধ করবে আত্মাকে, আপনার অনুভূতিকে করে তুলবে আরো বেশি সংবেদনশীল এবং উপলব্ধিকে করবে সমৃদ্ধ? নিম্নমানের একটি বই আপনাকে তার স্তরে নামাবে, ঠিক যেমনটা বলেছিলেন নির্বোধকের সম্পর্কে মার্ক টোয়েন : ‘Never argue with stupid people, they will drag you down to their level and then beat you with experience.’ একটি বোকা বইয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। কিন্তু উন্নত একটি বই আপনাকে যুক্ত করবে শিখরছোঁয়া এমন সব রুচি ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে, যেখান থেকে আপনি দেখতে পাবেন বিশ্বসংসার, জীবনের সংকট ও সমৃদ্ধি কিংবা এই দুয়ের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সহাবস্থান, আপনি সহস্র শিখায় জ্বলে উঠবার এক অভিজ্ঞতায় অভিভূত হবেন। আপনার হাতে তা তুলে জীবনের জ্বলন্ত বরফ, কালো জ্যোত্স্না, অসহ্য সুষমা, আর জ্ঞানের আনন্দসঞ্চারী বেদনা। একজন জোনাথন সুইফট-এর Gulliver’s Travels আপনাকে শুধু উপরোক্ত জিনিসগুলোই দেয় না, আপনাকে দেয় উদ্ভট কাহিনির বিনোদনও। বরার্ট লুইস স্টেভেন্সন-এর The Strange Case Of Dr. Jekyll And Mr. Hyde আপনাকে শুধু কাহিনির চমৎকারিত্বেই মুগ্ধ করবে না, আপনার হাতে তুলে দেবে সেই আশঙ্কাগুলোও যা আপনাকে সতর্ক করবে। কাফকার Metamorphosis-এর কথা আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে। আপনি যদি শুধু কাহিনির অদ্ভুতত্বেই আস্থা রাখতে চান, তাহলে The Metamorphosis- এর চুম্বকীয় শক্তিকে এড়ানো অসম্ভব। কিন্তু  The Trial কিংবা ঞযব Castle আপনাকে নিয়ে যাবে বাস্তবের ভূতুড়ে জগতে। সেখানে ফ্যান্টাসি নেই, আছে ফ্যান্টম, বাস্তবের ভূত। উদ্ভট কল্পনায় ঠাসা কাফকার ছোটগল্প বা প্যারাবলগুলোর কথা আর না-ই বা বললাম। কিন্তু এই বইগুলো শুধুই বিনোদনের অস্থায়ী আবেদনেই নিঃশেষ হয়ে যায় না, আপনাকে মুখোমুখি দাঁড় করাবে এমন সব আবিষ্কারের সামনে, যেখানে আপনি নিজেই সহস্র শিখায় প্রজ্বলিত হবেন। এই বইগুলো হয়তো আপনাকে পুড়িয়ে মারবে, কিন্তু ফিনিক্স পাখির মতো আপনার হাতে তুলে দেবে আপনারই ভস্মজাত এক নতুন জীবন, ভিটা নোভা। দান্তের কম্মেদিয়া দিভিনা প্রথমে আপনাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে, তারপর আপনাকে করবে পরিশুদ্ধ আর অবশেষে আপনার হাতে তুলে দেবে আবিষ্কারের নতুন স্বর্গ, পারাদিসো। এখন আপনিই বলুন, আপনি কী চান?লেখক কী লিখবেন

কী লিখবেন একজন লেখক? তিনি কি মনোরঞ্জনের তাগিদে লিখবেন নাকি পাঠককে শিক্ষিত করে তোলার জন্য লিখবেন? নিজের সম্প্রদায়, গোটা মানবজাতির কাছে তাঁর আছে অঘোষিত ও অকথিত এমন এক দায়বদ্ধতা থাকে, যা তাকে জনপ্রিয়তার প্রলোভন থেকে বিরত রাখবে। পাঠককে মনোরঞ্জনের মাধ্যমে যে জনপ্রিয়তা অর্জিত হয় তার আয়ু অতিশয় হ্রস্ব। কার্লোস ফুয়েন্তেস এই ক্ষণস্থায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন : “কিন্তু বর্তমান সংকটের ফলাফল যা-ই দাঁড়াক আমাদের লেখকরা নিজেদের সস্তা করে তুলবে না কিংবা এমন অপ্রযুক্তির হাতে নিজেকে সঁপে দেবে না যে লেখার মান নামিয়ে তারা অধিক পাঠক আকৃষ্ট করতে পারবে। সে পথ ভঙ্গুর, অল্পক্ষণের। একটা বেস্ট সেলার সহজেই লেখা যেতে পারে এবং কারা সেসবের পাঠক, তারা পরবর্তীকালে কী আচরণ করবে বলে দেওয়া যায়। এমনকি

‘Gone with the Wind’ বইটি যদি দৈবাৎ কখনো ফিরেও আসে, আমি বাজি ধরে বলতে পারি ১৯৩৩ সালে যে বইটি বেস্ট সেলার হয়েছিল, হার্ভে এলেনের সেই ‘Anthony Adverse’ উপন্যাসটির নাম লোকে আর মনে রাখবে না, পাঠক কোনো দিনই সেটা আর হাতে তুলে নেবে না।” (অনুবাদ : শিবব্রত বর্মণ, The Novel in the Americas, Raymond Leslie Williams, University Press of Colorado, 1992, p 3) সুতরাং হঠাৎ ওপরে ওঠা মানে হচ্ছে দ্রুত পতন। জনপ্রিয় হওয়াটা প্রকৃত লেখকের লক্ষ্য হতে পারে না। কখনো কখনো কোনো ভালো সাহিত্য যে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে না, তা নয়। তবে তা খুবই ব্যতিক্রম, প্রায়শই এক দৈব ঘটনার মতো। আমরা যেগুলোকে মাস্টারপিস বলে অভিহিত করি তা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছে, এমন নজির খুবই কম। আর যখন তা হয়েছে, তা অন্য কোনো চমকের হাত ধরে হয়েছে। কিন্তু চমক শিল্পের মূল শক্তি বা পরিচয় নয়। লক্ষ্য তো নয়ই। সাহিত্যের কাজ নয় চমক তৈরি করে জনপ্রিয়তার সেই পরিমণ্ডলে প্রবেশ করা, যেখানে তার দেওয়ার কিছু নেই। সাহিত্যের কাজ জনপ্রিয়তার স্রোতে ভেসে যাওয়া নয়, বরং স্রোতের অসারতা ও প্রথার অন্ধত্বকে অস্বীকার করা। আবারও ফুয়েন্তেসের কাছে ফিরে গিয়ে শুনব প্রথা ও জনপ্রিয়তার অসারতাকে উপেক্ষা করে ভিন্নপথে হাঁটার মন্ত্র : “বেশিদিন আগের কথা না, নামজাদা হিস্পানি ঔপন্যাসিক হোসে মারিয়া গেলবেনসু ‘হালকা’ বা ‘আনন্দদায়ক’ সাহিত্যের প্রচলিত প্রত্যাশাকে নাকচ করে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন, সাহিত্য আসলে এলিটবাদী ক্রিয়া, এটা নিঃসঙ্গ এবং দূরবর্তী সৃষ্টিপ্রক্রিয়া। এর উপাদান হলো স্বপ্ন, ভীতি, ভূতপ্রেত, অনুতাপ, প্রত্যাশা আর কৌতুকবোধ।” গেলবেনসু বলেছেন, সাহিত্য সৃষ্টি গণতান্ত্রিক হতে পারে না, বরং গণতান্ত্রিক হওয়া হবে সাহিত্যকে স্বীকার করে নিলে, আর সেটা একমাত্র সম্ভব, তার ভাষায়, ‘এমন এক শিক্ষার মাধ্যমে যা সত্যিকার অজ্ঞানতা দূর করতে পারে।’  তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, নিষ্ক্রিয়তা, মিডিওক্র্যাসি আর অজ্ঞানতা দিয়ে গণতন্ত্র হয় না। পুরোদমে গণতান্ত্রিক হওয়া হবে উঁচুস্তরের শিক্ষা আর প্রাণময়তা দেখাতে পারলে। অর্থাৎ একজন গণতান্ত্রিক পাঠককে হতে হবে এমন এক সুশিক্ষিত অতিপ্রত্যাশী পাঠক, যার পাঠক্রিয়া সাহিত্যসৃষ্টির সমান্তরাল হয়ে দাঁড়ায়, যার প্রত্যেক শব্দের পাঠ সাহিত্য লেখার মতো সৃষ্টিশীল কাজের পর্যায়ে উন্নীত হয়। সাহিত্যকে গণপ্রিয়তার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে সাহিত আর গণতন্ত্র দুয়েরই মানহানি ঘটানো। এ কাজ করতে গিয়ে যদি সৃষ্টিশীলতা ভোঁতা হয়ে যায়, গণতন্ত্রেরও সমাধি রচিত হলো।

লাতিন আমেরিকায় মাঝে মাঝে এ কথাও শোনা গেছে যে লেসামা লিমার ‘Paradiso wKsev Hopscotch’- এর মতো উপন্যাসগুলো অশিক্ষিত বা আধা শিক্ষিত পাঠকদের মধ্যে গৃহীত হতে পারে না। এর প্রতিক্রিয়ায় আমি সর্বদা বলেছি, আমাদের অশিক্ষিতরা তাহলে কী পড়বে যখন তারা আর অশিক্ষিত থাকবে না? তারা ‘Superman’ নাকি ‘Don Quijote’ পড়বে? তারা কি শেকসপিয়ারের পাঠক হবে নাকি হবে Hola পত্রিকার পাঠক? (অনুবাদ : শিবব্রত বর্মণ, ঞযব Novel in the Americas, Raymond Leslie Williams, University Press of Colorado, 1992, p 4) লেখকের জন্য জনপ্রিয়তা একটি ফাঁদ। এটি এমন এক প্রলোভন, যা লেখককে গণরুচির কাছে আত্মসমর্পণের নমনীয়তার দিকে নিয়ে যায়। কেন এই প্রলোভন এড়ানো উচিত তা বুঝবার জন্য মেক্সিকোরই আরেক লেখক অক্তাবিও পাসের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে পারি : “কয়েক বছর আগে আঁরি মিশো আমাকে বলেছিলেন : আমি শুরু করেছিলাম কবিতার ছোট্ট পুস্তিকা দিয়ে। দুই শ কপির মুদ্রণ ছিল সেটা। পরে দুই হাজার কপিতে উত্তীর্ণ করি, আর আজ তা পৌঁছেছে ২০ হাজার কপিতে। গত সপ্তাহে এক প্রকাশক আমাকে আমার পুস্তক সংগ্রহের এক লাখ কপি মুদ্রণের এক প্রস্তাব নিয়ে এলো। আমি তা প্রত্যাখ্যান করে বললাম : শুরুর দিককার সেই দুই শ কপিতে ফিরে যেতে চাই।” ভুলভাবে পরিচিত হওয়ার চেয়ে পরিচিত না হওয়াটা বরং বেশি ভালো—মিশোর এই কথার সঙ্গে একমত না হওয়া কঠিন। অনেক আলো আসলে অত্যধিক ছায়ার মতোই: দেখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তা ছাড়া রচনাকর্মের উচিত নিজের রহস্যকে অক্ষুণ্ন রাখা। এটা ঠিক যে বিজ্ঞাপন রহস্যকে উধাও করে দিতে পারে না, হাজার হাজার বছর পর এবং হাজার হাজার সংস্করণ (Edition) হওয়ার পর হোমার হোমারই থেকে যাচ্ছে। না, উধাও করে না বটে, তবে স্বাদের অবনতি ঘটায়। এটি সার্কাসের দর্শকদের কাছে বিজ্ঞাপনে পরিণত করে, যিশুখ্রিস্টকে বানায় মিউজিক বল (Music-ball) -এর তারকা, las meninas কে রূপান্তরিত করে নিরচ্ছিন্ন ভক্তির প্রতীকে আর মার্ক্সের বইগুলোকে একই সঙ্গে পবিত্র এবং দুষ্পাঠ্য (সমাজতান্ত্রিক দেশে কেউ এগুলো পড়ে না, বৃথাই সবাই এগুলো নিয়ে কসম খায়।) করে তোলে।  বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অবনতিটা হচ্ছে কর্মকাণ্ডের এমন এক স্তর যাকে আমরা কাটতি বলি। মিঠাইয়ে পরিণত হওয়া এই রচনাগুলো আক্ষরিক অর্থে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত পাঠকরা উপভোগ না করে বরং গেলে।

কিছু অতি প্রতিভাবান লোক দুর্ভেদ্য লেখার সহজতার বিরোধিতা করেন। এটি আত্মঘাতী। কোনো কাজের প্রকৃত প্রতিরক্ষা হলো এমন একটি লেখা দিয়ে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করা এবং তাকে বিরক্ত করা, যা নানা উপায়ে পড়া যায়। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে ‘Finnegans Wake’; এই বইটির জটিলতা অর্থের অগম্যতার ওপর নির্ভর করছে না, বরং এর বহুমুখী অর্থের ওপর নির্ভরশীল : প্রতিটি বাক্য এবং প্রতিটি শব্দ অর্থের এক পুঞ্জীভূত রূপ, একরাশ অর্থগত বীজ, যা জয়েস আমাদের কানে বপন করেন এই আশায় যে সেগুলো আমাদের মাথায় অঙ্কুরিত হবে। গ্রিক পুরাণের ইক্সিয়ন তার প্রতিফলন, বিবর্তন এবং পরিবর্তনসহ রীতিমতো বইয়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যে লেখা টিকে থাকে- যাকে আমরা ক্লাসিক বলি—তা এমন এক লেখা, যা কখনো নতুন অর্থ তৈরি থেকে বিরত থাকে না।

মহৎ কাজগুলো ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের মধ্যে নিজেদের পুনরুৎপাদন করে, এবং এভাবে চলতে থাকে। স্ব-উৎপাদনের ক্ষমতা থেকে অর্থসমূহের বহুত্বের জন্ম নেয় এবং এর ফলে তৈরি হয় পাঠের বহুস্তর। সংবাদপত্রের সর্বশেষ সংবাদ পড়ার উপায় মাত্র একটাই, কিন্তু  সের্ভান্তেস পড়ার উপায় অনেক। সংবাদপত্র বিজ্ঞাপনের সন্তান এবং এটি তাকে গিলে খায়: সংবাদপত্রের এমন একটি ভাষা যা ব্যবহৃত হয় এবং যখন ব্যবহার করা হয়, এই ব্যবহারের ফলে যখন জীর্ণ হয়ে যায় তখন এটি শেষ হয় আবর্জনার পাত্রে গিয়ে; ‘দন কিহোতে’ এমন একটি ভাষা, যা ব্যবহারের ফলে নিজেকে পুনরুৎপাদন করে এবং হয়ে ওঠে অন্য কিছু। এটি এক অস্পষ্ট স্বচ্ছতা : একটি অর্থ অন্যান্য সম্ভাব্য অর্থগুলোকে দেখতে দেয়।”  (IN/MEDIACIONES, Octavio Paz, Seix Barral, 1979,  p 119-120)

জনপ্রিয়তা বা বইয়ের কাটতির অন্য এক অর্থের, কিংবা যাকে অনর্থই বলতে পারি, ইঙ্গিত দিয়েছেন হোর্হে লুইস বোর্হেস নিজেরই অভিজ্ঞতা থেকে— “অনেক বছর আগের কথা, আমার ‘Historia de la Eternidad’ বইটির ৩৭ কপি বিক্রি হয়েছে এক বছরে। ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক ক্রেতার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জানানো বা মাফ চাওয়া উচিত ছিল। এই ৩৭ জন ক্রেতা অনুমান করা সম্ভব, মানে ৩৭ ব্যক্তির ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, তাদের জীবনযাপন, ঠিকানা ইত্যাদি। অন্যদিকে একটা বই যখন এক হাজার বা দুই হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়, তখন সংখ্যাটা এতই বিমূর্ত হয়ে পড়ে যেন একটি কপিও বিক্রি না হওয়ার মতোই ব্যাপার।” (অনূদিত কথাসমগ্র, রাজু আলাউদ্দিন, কথাপ্রকাশ, ২০১৫, পৃ ৪০)

সত্যিকারের লেখক কি চাইবেন এই বিমূর্ত সংখ্যায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে, যেখানে বই বিক্রি হওয়ার কোনো অর্থই থাকবে না, যেখানে বই জীবন্ত হয়ে পাঠককে দিকে দিগন্তরে তাড়িয়ে নেবে না? বই যদি না হয়ে ওঠে আত্ম-উন্মোচন ও আত্মরক্ষার উপায়, তবে সেই বই প্রতারক এক বিনোদন মাত্র।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com