রাজু আলাউদ্দিন
কী লিখবেন একজন লেখক? তিনি কি মনোরঞ্জনের তাগিদে লিখবেন নাকি পাঠককে শিক্ষিত করে তোলার জন্য লিখবেন? নিজের সম্প্রদায়, গোটা মানবজাতির কাছে তাঁর আছে অঘোষিত ও অকথিত এমন এক দায়বদ্ধতা থাকে, যা তাকে জনপ্রিয়তার প্রলোভন থেকে বিরত রাখবে। পাঠককে মনোরঞ্জনের মাধ্যমে যে জনপ্রিয়তা অর্জিত হয় তার আয়ু অতিশয় হ্রস্ব। কার্লোস ফুয়েন্তেস এই ক্ষণস্থায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন : “কিন্তু বর্তমান সংকটের ফলাফল যা-ই দাঁড়াক আমাদের লেখকরা নিজেদের সস্তা করে তুলবে না কিংবা এমন অপ্রযুক্তির হাতে নিজেকে সঁপে দেবে না যে লেখার মান নামিয়ে তারা অধিক পাঠক আকৃষ্ট করতে পারবে। সে পথ ভঙ্গুর, অল্পক্ষণের। একটা বেস্ট সেলার সহজেই লেখা যেতে পারে এবং কারা সেসবের পাঠক, তারা পরবর্তীকালে কী আচরণ করবে বলে দেওয়া যায়। এমনকি
‘Gone with the Wind’ বইটি যদি দৈবাৎ কখনো ফিরেও আসে, আমি বাজি ধরে বলতে পারি ১৯৩৩ সালে যে বইটি বেস্ট সেলার হয়েছিল, হার্ভে এলেনের সেই ‘Anthony Adverse’ উপন্যাসটির নাম লোকে আর মনে রাখবে না, পাঠক কোনো দিনই সেটা আর হাতে তুলে নেবে না।” (অনুবাদ : শিবব্রত বর্মণ, The Novel in the Americas, Raymond Leslie Williams, University Press of Colorado, 1992, p 3) সুতরাং হঠাৎ ওপরে ওঠা মানে হচ্ছে দ্রুত পতন। জনপ্রিয় হওয়াটা প্রকৃত লেখকের লক্ষ্য হতে পারে না। কখনো কখনো কোনো ভালো সাহিত্য যে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে না, তা নয়। তবে তা খুবই ব্যতিক্রম, প্রায়শই এক দৈব ঘটনার মতো। আমরা যেগুলোকে মাস্টারপিস বলে অভিহিত করি তা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছে, এমন নজির খুবই কম। আর যখন তা হয়েছে, তা অন্য কোনো চমকের হাত ধরে হয়েছে। কিন্তু চমক শিল্পের মূল শক্তি বা পরিচয় নয়। লক্ষ্য তো নয়ই। সাহিত্যের কাজ নয় চমক তৈরি করে জনপ্রিয়তার সেই পরিমণ্ডলে প্রবেশ করা, যেখানে তার দেওয়ার কিছু নেই। সাহিত্যের কাজ জনপ্রিয়তার স্রোতে ভেসে যাওয়া নয়, বরং স্রোতের অসারতা ও প্রথার অন্ধত্বকে অস্বীকার করা। আবারও ফুয়েন্তেসের কাছে ফিরে গিয়ে শুনব প্রথা ও জনপ্রিয়তার অসারতাকে উপেক্ষা করে ভিন্নপথে হাঁটার মন্ত্র : “বেশিদিন আগের কথা না, নামজাদা হিস্পানি ঔপন্যাসিক হোসে মারিয়া গেলবেনসু ‘হালকা’ বা ‘আনন্দদায়ক’ সাহিত্যের প্রচলিত প্রত্যাশাকে নাকচ করে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন, সাহিত্য আসলে এলিটবাদী ক্রিয়া, এটা নিঃসঙ্গ এবং দূরবর্তী সৃষ্টিপ্রক্রিয়া। এর উপাদান হলো স্বপ্ন, ভীতি, ভূতপ্রেত, অনুতাপ, প্রত্যাশা আর কৌতুকবোধ।” গেলবেনসু বলেছেন, সাহিত্য সৃষ্টি গণতান্ত্রিক হতে পারে না, বরং গণতান্ত্রিক হওয়া হবে সাহিত্যকে স্বীকার করে নিলে, আর সেটা একমাত্র সম্ভব, তার ভাষায়, ‘এমন এক শিক্ষার মাধ্যমে যা সত্যিকার অজ্ঞানতা দূর করতে পারে।’ তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, নিষ্ক্রিয়তা, মিডিওক্র্যাসি আর অজ্ঞানতা দিয়ে গণতন্ত্র হয় না। পুরোদমে গণতান্ত্রিক হওয়া হবে উঁচুস্তরের শিক্ষা আর প্রাণময়তা দেখাতে পারলে। অর্থাৎ একজন গণতান্ত্রিক পাঠককে হতে হবে এমন এক সুশিক্ষিত অতিপ্রত্যাশী পাঠক, যার পাঠক্রিয়া সাহিত্যসৃষ্টির সমান্তরাল হয়ে দাঁড়ায়, যার প্রত্যেক শব্দের পাঠ সাহিত্য লেখার মতো সৃষ্টিশীল কাজের পর্যায়ে উন্নীত হয়। সাহিত্যকে গণপ্রিয়তার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে সাহিত আর গণতন্ত্র দুয়েরই মানহানি ঘটানো। এ কাজ করতে গিয়ে যদি সৃষ্টিশীলতা ভোঁতা হয়ে যায়, গণতন্ত্রেরও সমাধি রচিত হলো।
লাতিন আমেরিকায় মাঝে মাঝে এ কথাও শোনা গেছে যে লেসামা লিমার ‘Paradiso wKsev Hopscotch’- এর মতো উপন্যাসগুলো অশিক্ষিত বা আধা শিক্ষিত পাঠকদের মধ্যে গৃহীত হতে পারে না। এর প্রতিক্রিয়ায় আমি সর্বদা বলেছি, আমাদের অশিক্ষিতরা তাহলে কী পড়বে যখন তারা আর অশিক্ষিত থাকবে না? তারা ‘Superman’ নাকি ‘Don Quijote’ পড়বে? তারা কি শেকসপিয়ারের পাঠক হবে নাকি হবে Hola পত্রিকার পাঠক? (অনুবাদ : শিবব্রত বর্মণ, ঞযব Novel in the Americas, Raymond Leslie Williams, University Press of Colorado, 1992, p 4) লেখকের জন্য জনপ্রিয়তা একটি ফাঁদ। এটি এমন এক প্রলোভন, যা লেখককে গণরুচির কাছে আত্মসমর্পণের নমনীয়তার দিকে নিয়ে যায়। কেন এই প্রলোভন এড়ানো উচিত তা বুঝবার জন্য মেক্সিকোরই আরেক লেখক অক্তাবিও পাসের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে পারি : “কয়েক বছর আগে আঁরি মিশো আমাকে বলেছিলেন : আমি শুরু করেছিলাম কবিতার ছোট্ট পুস্তিকা দিয়ে। দুই শ কপির মুদ্রণ ছিল সেটা। পরে দুই হাজার কপিতে উত্তীর্ণ করি, আর আজ তা পৌঁছেছে ২০ হাজার কপিতে। গত সপ্তাহে এক প্রকাশক আমাকে আমার পুস্তক সংগ্রহের এক লাখ কপি মুদ্রণের এক প্রস্তাব নিয়ে এলো। আমি তা প্রত্যাখ্যান করে বললাম : শুরুর দিককার সেই দুই শ কপিতে ফিরে যেতে চাই।” ভুলভাবে পরিচিত হওয়ার চেয়ে পরিচিত না হওয়াটা বরং বেশি ভালো—মিশোর এই কথার সঙ্গে একমত না হওয়া কঠিন। অনেক আলো আসলে অত্যধিক ছায়ার মতোই: দেখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তা ছাড়া রচনাকর্মের উচিত নিজের রহস্যকে অক্ষুণ্ন রাখা। এটা ঠিক যে বিজ্ঞাপন রহস্যকে উধাও করে দিতে পারে না, হাজার হাজার বছর পর এবং হাজার হাজার সংস্করণ (Edition) হওয়ার পর হোমার হোমারই থেকে যাচ্ছে। না, উধাও করে না বটে, তবে স্বাদের অবনতি ঘটায়। এটি সার্কাসের দর্শকদের কাছে বিজ্ঞাপনে পরিণত করে, যিশুখ্রিস্টকে বানায় মিউজিক বল (Music-ball) -এর তারকা, las meninas কে রূপান্তরিত করে নিরচ্ছিন্ন ভক্তির প্রতীকে আর মার্ক্সের বইগুলোকে একই সঙ্গে পবিত্র এবং দুষ্পাঠ্য (সমাজতান্ত্রিক দেশে কেউ এগুলো পড়ে না, বৃথাই সবাই এগুলো নিয়ে কসম খায়।) করে তোলে। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অবনতিটা হচ্ছে কর্মকাণ্ডের এমন এক স্তর যাকে আমরা কাটতি বলি। মিঠাইয়ে পরিণত হওয়া এই রচনাগুলো আক্ষরিক অর্থে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত পাঠকরা উপভোগ না করে বরং গেলে।
কিছু অতি প্রতিভাবান লোক দুর্ভেদ্য লেখার সহজতার বিরোধিতা করেন। এটি আত্মঘাতী। কোনো কাজের প্রকৃত প্রতিরক্ষা হলো এমন একটি লেখা দিয়ে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করা এবং তাকে বিরক্ত করা, যা নানা উপায়ে পড়া যায়। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে ‘Finnegans Wake’; এই বইটির জটিলতা অর্থের অগম্যতার ওপর নির্ভর করছে না, বরং এর বহুমুখী অর্থের ওপর নির্ভরশীল : প্রতিটি বাক্য এবং প্রতিটি শব্দ অর্থের এক পুঞ্জীভূত রূপ, একরাশ অর্থগত বীজ, যা জয়েস আমাদের কানে বপন করেন এই আশায় যে সেগুলো আমাদের মাথায় অঙ্কুরিত হবে। গ্রিক পুরাণের ইক্সিয়ন তার প্রতিফলন, বিবর্তন এবং পরিবর্তনসহ রীতিমতো বইয়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যে লেখা টিকে থাকে- যাকে আমরা ক্লাসিক বলি—তা এমন এক লেখা, যা কখনো নতুন অর্থ তৈরি থেকে বিরত থাকে না।
মহৎ কাজগুলো ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের মধ্যে নিজেদের পুনরুৎপাদন করে, এবং এভাবে চলতে থাকে। স্ব-উৎপাদনের ক্ষমতা থেকে অর্থসমূহের বহুত্বের জন্ম নেয় এবং এর ফলে তৈরি হয় পাঠের বহুস্তর। সংবাদপত্রের সর্বশেষ সংবাদ পড়ার উপায় মাত্র একটাই, কিন্তু সের্ভান্তেস পড়ার উপায় অনেক। সংবাদপত্র বিজ্ঞাপনের সন্তান এবং এটি তাকে গিলে খায়: সংবাদপত্রের এমন একটি ভাষা যা ব্যবহৃত হয় এবং যখন ব্যবহার করা হয়, এই ব্যবহারের ফলে যখন জীর্ণ হয়ে যায় তখন এটি শেষ হয় আবর্জনার পাত্রে গিয়ে; ‘দন কিহোতে’ এমন একটি ভাষা, যা ব্যবহারের ফলে নিজেকে পুনরুৎপাদন করে এবং হয়ে ওঠে অন্য কিছু। এটি এক অস্পষ্ট স্বচ্ছতা : একটি অর্থ অন্যান্য সম্ভাব্য অর্থগুলোকে দেখতে দেয়।” (IN/MEDIACIONES, Octavio Paz, Seix Barral, 1979, p 119-120)
জনপ্রিয়তা বা বইয়ের কাটতির অন্য এক অর্থের, কিংবা যাকে অনর্থই বলতে পারি, ইঙ্গিত দিয়েছেন হোর্হে লুইস বোর্হেস নিজেরই অভিজ্ঞতা থেকে— “অনেক বছর আগের কথা, আমার ‘Historia de la Eternidad’ বইটির ৩৭ কপি বিক্রি হয়েছে এক বছরে। ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক ক্রেতার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জানানো বা মাফ চাওয়া উচিত ছিল। এই ৩৭ জন ক্রেতা অনুমান করা সম্ভব, মানে ৩৭ ব্যক্তির ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, তাদের জীবনযাপন, ঠিকানা ইত্যাদি। অন্যদিকে একটা বই যখন এক হাজার বা দুই হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়, তখন সংখ্যাটা এতই বিমূর্ত হয়ে পড়ে যেন একটি কপিও বিক্রি না হওয়ার মতোই ব্যাপার।” (অনূদিত কথাসমগ্র, রাজু আলাউদ্দিন, কথাপ্রকাশ, ২০১৫, পৃ ৪০)
সত্যিকারের লেখক কি চাইবেন এই বিমূর্ত সংখ্যায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে, যেখানে বই বিক্রি হওয়ার কোনো অর্থই থাকবে না, যেখানে বই জীবন্ত হয়ে পাঠককে দিকে দিগন্তরে তাড়িয়ে নেবে না? বই যদি না হয়ে ওঠে আত্ম-উন্মোচন ও আত্মরক্ষার উপায়, তবে সেই বই প্রতারক এক বিনোদন মাত্র।