ধুলা, দূষণ, দুশ্চিন্তা, অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন, অতিরিক্ত স্টাইলিংসহ নানা কারণে চুল রুক্ষ ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। এমন চুলকে আবার স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও কোমল করে তোলে কেরাটিন ট্রিটমেন্ট। রূপবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আতিফ আতাউর

কেরাটিন টিট্রমেন্ট কী
কেরাটিন ট্রিটমেন্ট করানোর মানে চুলে রাসায়নিকের ব্যবহার। যা চুলকে নরম ও মসৃণ করে তোলে। কেরাটিন হল এক ধরনের বিশেষ প্রোটিন যা আমাদের চুল, ত্বক এবং নখের মধ্যে পাওয়া যায়। এই উপাদানের কারণে চুল, নখ ও ত্বক সুন্দর থাকে। এটি আমাদের চুলকে ভেতর ও বাইরে থেকে রক্ষা করে। শুধু তাই নয়, চুলকে সূর্যের আলো, ধুলাবালি ও দূষণ থেকেও রক্ষা করে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান দূষণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে চুলের কেরাটিন শেষ হয়ে যায়। যার কারণে চুল শুষ্ক ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। তখন বাইরে থেকে প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের মতো চুলের ভেতর কেরাটিন ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। পুরো এই প্রক্রিয়াটি মূলত কেরাটিন টিট্রমেন্ট নামে পরিচিত। এটি ব্রাজিলিয়ান ব্লোআউট নামেও পরিচিত। চুল মজবুত করতে সরাসরি ব্যবহারের পাশাপাশি এই উপাদানটি এখন চুলের প্রসাধনী পণ্যগুলোতেও ব্যবহার করা হয়।
কেরাটিন ট্রিটমেন্ট কেন?
চুল সোজা করার পাশাপাশি চুলকে মসৃণ, ঝরঝরে এবং চকচকে করে তোলে কেরাটিন ট্রিটমেন্ট। প্রাকৃতিকভাবে কোঁকড়ানো চুলও এই সেবার মাধ্যমে সোজা করা যায়। কেরাটিন ট্রিটমেন্ট করলে চুল ঘন দেখায়, চুলের জৌলশ বাড়ে, সহজেই চুলের স্টাইল করা যায়।

যেভাবে করা হয় কেরাটিন ট্রিটমেন্ট
প্রথমেই চুল ধোয়া : প্রথমেই শ্যাম্পু করে চুল ধুয়ে নেওয়া হয়। ট্রিটমেন্টের আগে চুল পুরোপুরি পরিষ্কার আছে কিনা নিশ্চিত হতে হয়। কন্ডিশনার কিউটিকলকে সিল করে দেয় এবং এটি কেরাটিন মাস্ক শোষণে বাধা দেয়। তাই এই বিশেষ ধোয়াতে কোনো কন্ডিশনার ব্যবহার করা হয় না। ভালোমানের পিএইচযুক্ত শ্যাম্পু বেছে নিলে সেরা ফল পাওয়া যায়। এতে চুলের ক্ষারীয় উপাদান সরানো যায় এবং চুলের কিউটিকলগুলো ফুলে ওঠে। পুরো প্রক্রিয়াটি চুলের মধ্যে কেরাটিন সঠিকভাবে ঢুকতে সহায়তা করে।
কেরাটিন মাস্ক প্রয়োগ : চুল ধোয়ার পর ভালোভাবে সম্পূর্নরূপে শুকিয়ে নেওয়া হয়। কারণ ভেজা চুল কেরাটিন মাস্ককে পাতলা করে। এরপর চুলগুলোকে মাঝখান থেকে বিভক্ত করে নিতে হয়। এরপর কেরাটিন মাস্ক সমানভাবে চুলে ভালোভাবে প্রয়োগ করতে হয়। কেরাটিন মাস্ক চুলে দেওয়ার পর আধাঘণ্টা লাগে সেট হতে। এ সময় চুলের অক্সিডেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরপর চুল ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হয়।
ব্লো ড্রাই এবং ফ্ল্যাট আয়রন : চুল ধুয়ে নেওয়ার পর শুকিয়ে ব্লো ড্রাই করা হয়। এরপর কেরাটিন উপাদান যেন কিউটিকলের গভীরে ঠিকভাবে প্রবেশ করে তা নিশ্চিত করতে ফ্ল্যাট আয়রন করা হয়।
কেরাটিন ট্রিটমেন্টের পর : চুলে কেরাটিন ট্রিটমেন্ট করার চুল বাঁধা যাবে না। এই ট্রিটমেন্টের পর প্রথম চুল ধোয়ার জন্য ২-৩ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে কেরাটিন চুলের কিউটিকলে পুরোপুরিভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। এতে ফলও হয় ভালো। দীর্ঘদিন পর্যন্ত চুল ভালো থাকে।
কেরাটিন করা চুলের যত্ন
সঠিকভাবে যত্নের ওপর কেরাটিন করা চুলের স্থায়ীত্ব নির্ভর করে। নিয়ম মেনে যত্নআত্তি করলে একবার কেরাটিন ট্রিটমেন্ট করার পর ৩-৫ মাস পর্যন্ত চুলের স্বাস্থ্য স্থায়ী হতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় এক মাস অন্তর পার্লারে গিয়ে যত্ন করানো। মাসে একবার ডিপ কন্ডিশনিং বা হেয়ার-স্পা করাতে পারেন। এর পাশাপাশি কিছু নিয়ম মেনে চলতে পারেন—
সালফেট-মুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার : কেরাটিন ট্রিটমেন্ট করানোর পর চুলে সালফেট এবং প্যারাবেন ফ্রি শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহার করার পরামর্শ দিলেন শোভন সাহা। সালফেট চুল থেকে কেরাটিন বের করে দিতে পারে। কেরাটিন ট্রিটমেন্ট করা চুলের জন্য বিশেষ শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার কিনতে পাওয়া যায়, এগুলো বেছে নেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের কন্ডিশনার প্রয়োগের পর ৮-১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়।
ক্লোরিনযুক্ত পানি পরিহার : ক্লোরিন কেরাটিনকে ধুয়ে ফেলতে পারে। তাই সুইমিংপুলে ক্লোরিনযুক্ত পানিতে সাঁতার কাটা পরিহার করতে হবে।
সি বিচে গোসল নয় : সমুদ্রের লোনাপানি চুল থেকে কেরাটিন কেড়ে নিতে পারে। তাই কেরাটিন ট্রিটমেন্ট করা চুলে লোনা জলে গোসল না করা ভালো।
হিট স্টাইলিং পরিহার : চুলে তাপ প্রদানকারী উপাদান ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি চুলে ক্রিম, জেল ব্যবহার কম করা উচিত। করাটিন ট্রিটমেন্ট করা চুলের ওপর চাপ পড়ে, এমন কিছু থেকে বিরত থাকা উচিত। চুল টেনে ঝুঁটি করা বা বেণি করার চেয়ে হালকা করে চুল বাঁধাই ভালো। চুল আঁচড়াতে বড় দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে কাঠের চিরুনি বেছে নিন।
চুলে রং করাতে চাইলে : চুলে রং করাতে চাইলে কেরাটিন ট্রিটমেন্টের এক-দেড় মাস পর করাতে হবে। নয়তো কেরাটিন ট্রিটমেন্টের আগেই করিয়ে নেওয়া ভালো।