চোখে আঘাত বা অস্ত্রোপচার থেকে সৃষ্টি হতে পারে প্রদাহ, যার প্রভাবে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে দৃষ্টিশক্তি। বিরল এই রোগের নাম সিম্প্যাথেটিক অফথালমাইটিস। কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার নিয়ে লিখেছেন ডা. মো. আরমান হোসেন রনি
স্বাভাবিক অবস্থায় চোখের নেত্রনালি বা ইউভিয় াল টিস্যুর মধ্যে থাকা অ্যান্টিজেনগুলো লুকায়িত থাকে। শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইউভিয়াল টিস্যুর কাছে অ্যান্টিজেনগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় যেহেতু পৌঁছায় না, তাই প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সেগুলোকে আক্রমণও করে না। যখন কোনো কারণে চোখ তীব্রভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, চোখে ছিদ্র সৃষ্টি হয় অথবা অস্ত্রোপচারের সময় ইউভিয়াল ট্র্যাক্টের টিস্যুগুলো রক্তে চলে আসে, তখন দেহের ইমিউন সিস্টেমে থাকা অ্যান্টিজেনগুলোকে অচেনা প্রোটিন হিসেবে ধরে নিয়ে শুরু করে টিস্যুগুলোর ওপর হামলা করা। ফলাফল, উভয় চোখেই দেখা দেয় প্রদাহ।
লক্ষণ
সিম্প্যাথেটিক অফথালমাইটিসের লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে দেখা দেয়। শুরুতে আঘাতপ্রাপ্ত চোখে প্রদাহ শুরু হয়। এর কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর অপর চোখেও উপসর্গ দেখা দেয়। রোগটির লক্ষণগুলোর মধ্যে আছে—
► চোখে ঝাপসা দেখা, ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া।
► তীব্র আলোতে তাকালে চোখে অস্বস্তি তৈরি হওয়া।
► চোখ লাল হয়ে থাকা, ব্যথা অনুভূত হওয়া।
► চোখ দিয়ে পানি পড়া।
► চোখের অভ্যন্তরে ফ্লোটার বেড়ে যাওয়া, যা চোখের সামনে ভাসমান দাগ হিসেবে দৃষ্টিগোচর হয়।
► দৃষ্টিক্ষেত্রের (ফিল্ড অব ভিশন) কিছু অংশ অন্ধকার হয়ে থাকা বা কালো ছোপ পড়া।
রোগের প্রকোপ বেড়ে অ্যাডভান্সড স্টেজে পৌঁছালে চোখের রেটিনা ও কোরয়েড অংশেও প্রদাহ ছড়িয়ে পড়ে। এটি হতে পারে চোখের স্থায়ী ক্ষতির কারণ।
নির্ণয়
রোগটির প্রভাবে চোখের অভ্যন্তর ও গঠনে বেশ কিছু পরিবর্তন তৈরি হয়। চোখ পরীক্ষা করার সময় এসব পরিবর্তনের দিকে নজর দেন চিকিৎসক। এর মধ্যে আছে—
►কর্নিয়ার মধ্যে ফ্যাটজাতীয় জমাট দাগ।
►আইরিসে ছোট ছোট গ্রানুলোমা বা টিউমার।
►ভিট্রিয়াসের তরলে ঘোলাটে ভাব।
►রেটিনা ও কোরয়েডে প্রদাহ।
জটিলতা
এ রোগটির যদি দ্রুত চিকিৎসা করা না হয়, সে ক্ষেত্রে এটি স্থায়ী অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে আক্রান্ত চোখ যদি আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে দৃষ্টিশক্তি একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে। রোগের প্রকোপ বাড়লে পরবর্তী সময়ে রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়া বা সেকেন্ডারি গ্লকোমাও হতে পারে এই রোগ থেকে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসা
যেহেতু এ রোগের উৎপত্তি দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, তাই চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য এর উৎস নয়, বরং সৃষ্ট প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ। এর মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করাই চিকিৎসার প্রধান কাজ। চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের মধ্যে আছে—
►কর্টিকোস্টেরয়েড : দ্রুত প্রদাহ কমাতে উচ্চমাত্রায় স্টেরয়েড প্রয়োগ করা হয়। স্থানীয়ভাবে আইড্রপ বা ইনজেকশনও দেওয়া যেতে পারে।
► ইমিউনোসাপ্রেসিভ ড্রাগস : দীর্ঘ মেয়াদে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয় আজাথিওপ্রিন বা সাইক্লোস্পোরিন।
► চোখ অপসারণ : যদি আঘাতপ্রাপ্ত চোখ সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে এবং প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেটি অপসারণ করার প্রয়োজন হতে পারে। আঘাতের দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি করলে সবচেয়ে কার্যকর। তাতে অপর চোখকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
সহায়ক চিকিৎসা : চোখে আরাম দেওয়ার জন্য মাইড্রিয়াটিক ড্রপস এবং ইন্ট্রাঅকুলার প্রেসার নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ইত্যাদি দেওয়া হয়।
প্রতিরোধ
► চোখে আঘাত লাগলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চোখে অস্ত্রোপচার পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকের তত্বাবধানে থাকতে হবে।
► গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ও দৃষ্টি-অযোগ্য চোখ দ্রুত অপসারণ করলে সিম্প্যাথেটিক অফথালমাইটিস প্রতিরোধ করা যায়।
► আঘাতের পরে দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ জরুরি।