সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

কবি জসীম উদ্দীন এর জীবনী

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

কবি জসীম উদ্দীন এর জীবনী

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে কয়জন কবি তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অমোঘ স্থান করে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কবি জসীম উদ্দীন। তিনি শুধু কবি নন, ছিলেন গীতিকার, নাট্যকার, গবেষক, শিক্ষক এবং সর্বোপরি এক নিখাদ লোকসংস্কৃতির প্রেমিক। বাংলার গ্রামীণ জনজীবন, কৃষকের দুঃখ-সুখ, নদী-নালা, খাল-বিল, গ্রামীণ মানুষের কথা, কষ্ট আর স্বপ্ন—সবকিছুকেই তিনি তাঁর কবিতা ও গানে জীবন্ত করে তুলেছেন। এজন্যই তিনি খ্যাতি লাভ করেছেন “পল্লীকবি” বা “গ্রামের কবি” নামে।

জন্ম ও শৈশব

কবি জসীম উদ্দীন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আনসার উদ্দীন মোল্লা এবং মাতার নাম আমিনা খাতুন। পরিবারটি ছিল ধর্মপ্রাণ ও সাধারণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। ছোটবেলা থেকেই জসীম উদ্দীন গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। গ্রামের খাল-বিল, নদী, মাঠ, গাছপালা, কীর্তন-গান, পালাগান, বাউল-ফকিরদের গান ইত্যাদি তাঁর হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

শৈশবেই তিনি লোকসঙ্গীত ও কবিতার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গ্রামের মানুষের কাহিনি, বিশেষ করে কৃষকের দুঃখ-সুখ তাঁর মনে দাগ কাটে। এই জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির মূলভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

শিক্ষা জীবন

জসীম উদ্দীন প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন গ্রামের পাঠশালায়। পরে তিনি ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি কবিতা রচনায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর প্রতিভা শিক্ষক ও সহপাঠীদের নজর কাড়ে।

১৯২১ সালে তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পরীক্ষা পাস করেন। এরপর রাজেন্দ্র কলেজ থেকেই ইন্টারমিডিয়েট এবং স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং বাংলা সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তাঁর সাহিত্যচর্চা গম্ভীর রূপ নেয়।

সাহিত্যজীবনের সূচনা

জসীম উদ্দীনের সাহিত্যজীবন শুরু হয় ছাত্রজীবনেই। তিনি প্রথমদিকে ছোট ছোট কবিতা ও গান লিখতেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “রাখালী” প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার সূচনা হয়। বইটিতে গ্রামীণ জীবনের সরল অথচ হৃদয়স্পর্শী চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।

“রাখালী” প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি খ্যাতি পান। এরপর ধারাবাহিকভাবে তিনি “নকশী কাঁথার মাঠ” (১৯২৯), “সোজন বাদিয়ার ঘাট” (১৯৩৩), “গ্রাম্যবধূ” (১৯৩৪), “সুজনী” (১৯৩৬) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন।

প্রধান রচনা ও অবদান

জসীম উদ্দীনের সাহিত্যকীর্তি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর বিখ্যাত রচনাগুলো হলো—

কাব্যগ্রন্থ

  • রাখালী (১৯২৭)

  • নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯)

  • সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩)

  • গ্রাম্যবধূ (১৯৩৪)

  • সুজনী (১৯৩৬)

  • রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭০)

নাটক

  • রূপবান (১৯৩১)

  • পদ্মা নদীর মাঝি (নাট্যরূপ)

আত্মজীবনী

  • জীবনকথা

  • থাকব আমি নাতে আনাই

অন্যান্য

তিনি অসংখ্য লোকসঙ্গীত সংগ্রহ করেছেন এবং বাংলার গ্রামীণ গানকে সাহিত্যের মূলধারায় এনেছেন।

“নকশী কাঁথার মাঠ”

এটি তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। এখানে রূপাই ও সোজন নামের দুই চরিত্রের প্রেমকাহিনি বর্ণিত হয়েছে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নায়িকা তার বেদনার গল্প নকশী কাঁথায় ফুটিয়ে তোলে, যা মৃত্যুর পর কবরের উপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ কাহিনি গ্রামীণ সমাজের চিরন্তন প্রেম-দুঃখের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

লোকসাহিত্য সংগ্রহে ভূমিকা

জসীম উদ্দীন শুধু কবি নন, তিনি ছিলেন এক অসাধারণ লোকসাহিত্য সংগ্রাহক। গ্রামীণ জীবনে প্রচলিত লোকগীতি, বাউল, জারি-সারি, ভাটিয়ালি ইত্যাদি গান তিনি সংগ্রহ করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ড. দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজে যোগ দেন। এর মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ সংস্কৃতিকে গবেষণা ও নথিভুক্ত করেন।

কর্মজীবন

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে তিনি সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরেও কাজ করেছেন। তবে চাকরির চেয়ে তাঁর মূল আকর্ষণ ছিল সাহিত্যসৃষ্টি।

রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকা

জসীম উদ্দীন সমাজসচেতন কবি ছিলেন। পাকিস্তান আমলে তিনি একাধারে সংস্কৃতিসেবী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর “রাইফেল রোটি আওরাত” কাব্যে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সংগ্রাম, দুর্দশা ও নারীর ভূমিকা অনন্যভাবে চিত্রিত হয়েছে।

তিনি প্রাদেশিক পরিষদেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে তিনি রাজনীতির চেয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

জসীম উদ্দীনের কবিতা ও রচনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো—

  1. গ্রামীণ জীবনচিত্র – সাধারণ কৃষক, রাখাল, গৃহবধূ, মজুরদের সুখ-দুঃখ তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে।

  2. সরল ভাষা – তিনি আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করে কবিতায় সহজাত সৌন্দর্য এনেছেন।

  3. লোকসঙ্গীতের ধারা – তাঁর কবিতায় লোকগীতির ছন্দ ও সুরের প্রভাব স্পষ্ট।

  4. আবেগ ও অনুভূতির গভীরতা – প্রেম, বেদনা, বিচ্ছেদ, আশা-আকাঙ্ক্ষা তিনি মর্মস্পর্শীভাবে প্রকাশ করেছেন।

  5. মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি – তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও সমাজের বৈষম্যকে তুলে ধরে মানবপ্রেমকে জাগ্রত করেছেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা

তাঁর সাহিত্যকীর্তির জন্য তিনি বহু সম্মাননা পেয়েছেন, যেমন—

  • প্রাইড অব পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড (পাকিস্তান সরকার, ১৯৬৯)

  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার

  • একুশে পদক (১৯৭৬, মরণোত্তর)

  • স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর)

ব্যক্তিগত জীবন

কবি জসীম উদ্দীন ১৯৪০ সালে মমতাজ বেগমকে বিয়ে করেন। তাঁর পারিবারিক জীবন ছিল শান্ত ও সাদামাটা। তিনি সারা জীবন গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত থেকেছেন।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

স্বাধীনতার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ফরিদপুরের গোবিন্দপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর পরেও তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পল্লীকবি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

উপসংহার

কবি জসীম উদ্দীন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন “গ্রামের কবি”—যিনি গ্রামের মাটির গন্ধ, কৃষকের মুখের ভাষা, গ্রামীণ জীবনের দুঃখ-সুখকে সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন। তাঁর কবিতা শুধু সাহিত্য নয়, বরং বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। আজও তাঁর লেখা আমাদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে।

বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও ভালোবাসা চিরকাল তাঁকে অমর করে রাখবে। তাই কবি জসীম উদ্দীন কেবল একজন কবিই নন, তিনি বাংলার লোকজীবনের প্রতিনিধি, বাংলার আত্মার কণ্ঠস্বর।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com