৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। এবারের উপপাদ্য ‘সুস্থ বার্ধক্যে ফিজিওথেরাপি ও শারীরিক কার্যকলাপের ভূমিকা : দুর্বলতা ও পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ’। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সংযুক্ত স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ এবং সেসব প্রতিরোধে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিই এবারের দিবসটির মূল লক্ষ্য। বার্ধক্য জীবনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
এটি শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে।
শরীরে বার্ধক্যের প্রভাব
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে শারীরিক শক্তি, পেশির কার্যক্ষমতা, হাড়ের ঘনত্ব এবং ভারসাম্য কমে যেতে থাকে। এর ফলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়; যেমন—
পেশি দুর্বলতা : বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির পরিমাণ ও শক্তি হ্রাস পায়, যা দৈনন্দিন কাজ করা কঠিন করে তোলে।
হাড়ের ভঙ্গুরতা : অস্টিওপরোসিসের মতো অবস্থায় হাড়ের ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি পায়।
ভারসাম্য হ্রাস : হাঁটাচলার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বয়স্কদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি তৈরি করে।
বিভিন্ন অসুখবিসুখের ঝুঁকি : আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন ও অন্যান্য ক্রনিক রোগ বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অন্তত একবার পড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। এমন পড়ে যাওয়া অনেক সময় গুরুতর আঘাত বা অক্ষমতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফলে বৃদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, আত্মনির্ভরতা কমে যায় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ফিজিওথেরাপির অবদান
প্রবীণদের ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি দেহকে সুস্থ ও সক্রিয় রাখতে, তাঁদের স্বাভাবিক জীবনধারা ধরে রাখতে অপরিহার্য। ফিজিওথেরাপি ও নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে, পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করতে এবং মানসিক সুস্থতা উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন—
শক্তি ও ভারসাম্য বৃদ্ধি : নিয়মিত ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি অনুশীলনের মাধ্যমে পেশির শক্তি বৃদ্ধি পায়। ভারসাম্য উন্নত হয়, যা হাঁটাচলা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বা দৈনন্দিন কাজ সহজ করে তোলে।
হাড় ও জয়েন্টের স্বাস্থ্য রক্ষা : অস্টিওপরোসিস ও আর্থ্রাইটিসের মতো ক্রনিক রোগ নিয়ন্ত্রণে ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। ব্যায়ামের মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি করা সম্ভব এবং জয়েন্টের ফ্লেক্সিবিলিটি বজায় রাখা যায়।
স্বনির্ভরতা : ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে ফিটনেস ফিরে পেলে হালকা কাজের জন্য প্রবীণরা স্বনির্ভর জীবনযাপন করতে পারেন।
মানসিক সুস্থতা : শারীরিক কার্যকলাপ মানসিক চাপ কমায়, ডিপ্রেশন প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখে। নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে তাঁরা পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন।
দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুবিধা : নিয়মিত ফিজিওথেরাপি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য ক্রনিক রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
শারীরিক ক্রিয়াকলাপ
বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক ক্রিয়াকলাপ শুধু পেশি ও হাড়ের স্বাস্থ্য নয়, বরং মানসিক সুস্থতা, মানসিক চঞ্চলতা এবং সামাজিক যোগাযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক কার্যকলাপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে—
► হালকা হাঁটা বা জগিং।
► ভারসাম্য ও পেশিশক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম।
► স্ট্রেচিং ও ফ্লেক্সিবিলিটি অনুশীলন।
► হালকা যোগব্যায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ফিজিওথেরাপিস্টদের পরামর্শে ব্যায়ামের পরিকল্পনা গ্রহণ করলে ফলাফল আরো কার্যকর হয়।
প্রতিরোধ
সুস্থতা ধরে রাখতে প্রতিরোধই সর্বদা শ্রেয়। বৃদ্ধ বয়সেও সুস্থ থাকতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন থেকেই মেনে চলা প্রয়োজন; যেমন—
► নিয়মিত ব্যায়াম করা।
► সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা।
► পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা।
► নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।
► ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়ামের রুটিন অনুসরণ করা।
চ্যালেঞ্জ
আমাদের দেশে এখনো প্রবীণ জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত ফিজিওথেরাপি সেবা পান না। সমস্যাটি সমাধানে প্রয়োজন—
► সচেতনতা বৃদ্ধি : পরিবার ও সমাজে ফিজিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
► প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট : প্রবীণদের যত্নের জন্য বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের সংখ্যা বাড়ানো।
► নিয়মিত স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম : কমিউনিটি পর্যায়ে শারীরিক কার্যকলাপ ও ফিজিওথেরাপি কার্যক্রম চালানো।