অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম অমর্ত্য কুমার সেন। তিনি শুধু একজন অর্থনীতিবিদ নন, তিনি একজন দার্শনিক, চিন্তক ও মানবতাবাদীও। অর্থনীতিকে তিনি কেবল সংখ্যা-গণনা বা মুনাফার হিসাব হিসেবে দেখেননি; তিনি অর্থনীতিকে যুক্ত করেছেন মানবিক কল্যাণ, ন্যায়বিচার, দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নের সঙ্গে। এজন্যই তার প্রবর্তিত ধারণা—“ক্ষমতা পদ্ধতি” (Capability Approach)—বিশ্বজুড়ে আলোচিত এবং গ্রহণযোগ্য।
১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বেশি পরিচিতি পান। তার চিন্তাধারা আজও নীতিনির্ধারক, গবেষক ও সাধারণ মানুষের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক।
অমর্ত্য সেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৩ সালের ৩ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে। তার পিতা অশুতোষ সেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক এবং মাতা অমিতা সেন ছিলেন শিক্ষক। পরিবারের বৌদ্ধিক পরিবেশ তার চিন্তাভাবনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
শান্তিনিকেতনের প্রকৃতিনির্ভর জীবন, রবীন্দ্রচেতনা এবং মানবতাবাদী মূল্যবোধ অমর্ত্য সেনকে ছোটবেলা থেকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তিনি শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৫৩ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যান ইংল্যান্ডে এবং ভর্তি হন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে। সেখানে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কেমব্রিজে অধ্যয়নকালেই তিনি বিশ্বমানের অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং নিজের গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করতে থাকেন।
অমর্ত্য সেনের কর্মজীবন ছিল বহুমুখী ও আন্তর্জাতিক। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (ভারত)
দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্স
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স (LSE)
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমানে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত আছেন।
অমর্ত্য সেনের গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো কল্যাণ অর্থনীতি (Welfare Economics) এবং সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব (Social Choice Theory)। তিনি প্রমাণ করেছেন যে অর্থনীতিকে কেবলমাত্র আয়, উৎপাদন বা জিডিপি দিয়ে বিচার করা উচিত নয়, বরং মানুষের মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা ও ক্ষমতা দিয়ে বিচার করতে হবে।
Capability Approach (ক্ষমতা পদ্ধতি)
উন্নয়ন মানে কেবল আয় বৃদ্ধি নয়।
মানুষ কতটুকু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা ও সুযোগ পাচ্ছে, সেটিই আসল উন্নয়নের মাপকাঠি।
Poverty and Famines (দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণ)
তার অন্যতম বিখ্যাত গবেষণা।
তিনি প্রমাণ করেন, দুর্ভিক্ষের কারণ কেবল খাদ্যসংকট নয়, বরং খাদ্য বণ্টন ও ক্রয়ক্ষমতার অভাবই মূলত দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে।
এ বিশ্লেষণ আধুনিক অর্থনীতিতে দুর্ভিক্ষ বোঝার নতুন পথ খুলে দেয়।
Social Choice Theory
অর্থনীতিতে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের তত্ত্বকে তিনি নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেন।
ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সামাজিক কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার উপায় তিনি দেখান।
Gender and Development
নারী-পুরুষের অসমতা ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য তার গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি দেখান, নারীদের ক্ষমতায়ন উন্নয়নের অন্যতম মূল উপাদান।
অমর্ত্য সেন বিপুলসংখ্যক বই ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তার গ্রন্থগুলোতে অর্থনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ও রাজনীতি একসূত্রে গাঁথা। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ—
Poverty and Famines (১৯৮১)
Development as Freedom (১৯৯৯)
Inequality Reexamined (১৯৯২)
The Idea of Justice (২০০৯)
Identity and Violence (২০০৬)
Collective Choice and Social Welfare (১৯৭০)
এছাড়া তিনি নানা প্রবন্ধ ও গবেষণাপত্র লিখেছেন, যা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেনকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল—
“কল্যাণ অর্থনীতি ও সামাজিক পছন্দ তত্ত্বে অবদান, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদানের জন্য।”
এ পুরস্কার পাওয়ার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় তথা দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত প্রথম অর্থনীতিবিদ হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে অনন্য স্থানে অধিষ্ঠিত হন।
ভারত রত্ন (ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান, ১৯৯৯)
ইউরোপীয় অর্থনীতি সমিতির পুরস্কার
হিউম্যানিস্ট অব দ্য ইয়ার
বিভিন্ন দেশের ডজনেরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি
অমর্ত্য সেন বিশ্বাস করেন, উন্নয়নের প্রধান উদ্দেশ্য মানুষের জীবনমান উন্নত করা। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, যদি মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার না পায়।
তার মতে—
গণতন্ত্র দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানুষকে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
অমর্ত্য সেন সর্বদাই মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তিনি সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেন।
অর্থনীতিকে মানবকল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান।
অমর্ত্য সেনের ব্যক্তিজীবনও বহুমুখী। তিনি চারবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নোবেল বিজয়ী লেখিকা অ্যালিসন লুরি ও অর্থনীতিবিদ এম্মা রথচাইল্ড। তার তিন কন্যা এবং এক পুত্র রয়েছে।
অমর্ত্য সেন কেবল একজন গবেষক নন, তিনি একজন সাহিত্যপ্রেমীও। বাংলা সাহিত্য, বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনার প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ রয়েছে।
অমর্ত্য সেনের চিন্তাভাবনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
তার ক্ষমতা পদ্ধতি জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক (HDI) তৈরির অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা তার ভাবনা কাজে লাগাচ্ছে।
দারিদ্র্য, বৈষম্য ও মানবাধিকার নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে তার গবেষণার কারণে।
যদিও তিনি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত, তবুও কিছু সমালোচনা আছে। কেউ কেউ বলেন, তার ধারণা বাস্তব নীতিনির্ধারণে সবসময় প্রয়োগ করা কঠিন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তিনি অতিরিক্ত মানবতাবাদী হওয়ায় অর্থনীতির কঠোর বাস্তবতাকে কখনো কখনো উপেক্ষা করেছেন। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদ তার অবদানকে যুগান্তকারী বলেই স্বীকার করেন।
অমর্ত্য সেন কেবল একজন অর্থনীতিবিদ নন, তিনি মানবতার পক্ষে এক কণ্ঠস্বর। তার গবেষণা, চিন্তা ও দর্শন প্রমাণ করেছে—উন্নয়ন মানে শুধু ধনসম্পদ নয়, বরং মানুষের ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি।
নোবেল বিজয়ী হিসেবে তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন, অর্থনীতি মানবজীবনের কল্যাণের হাতিয়ার হতে পারে। আজও তার চিন্তাধারা উন্নয়নকামী সমাজগুলোর জন্য এক আলোকবর্তিকা।