বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম হাসান হাফিজুর রহমান। তিনি ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, অনুবাদক ও গবেষক। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তার সম্পাদিত “স্বাধীনতার কবিতা” সংকলন মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে এক অনন্য দলিল হিসেবে গণ্য হয়। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও জাতীয় জীবনে তার অবদান তাকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
হাসান হাফিজুর রহমান ১৯৩২ সালের ২ জানুয়ারি বর্ধমান জেলার (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) জামালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন সৈয়দ হাফিজুর রহমান এবং মাতা সৈয়দা আয়েশা খাতুন। দেশভাগের পর তার পরিবার পূর্ববাংলায় চলে আসে। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।
প্রথমে স্থানীয় স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন এবং বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতে থাকেন।
পঞ্চাশের দশক ছিল বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণের সময়। একদিকে জীবনানন্দ দাশের পরবর্তী ধারা, অন্যদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া—এই সময়ের কবিরা নতুন ভাষা ও কাব্যভঙ্গি খুঁজছিলেন। হাসান হাফিজুর রহমানও এ সময়েই কবিতা লেখা শুরু করেন। তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৫০-এর দশকে।
তার কবিতায় দেখা যায়—
দেশপ্রেম,
মানুষের দুঃখ-দুর্দশা,
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা,
ব্যক্তিগত বেদনা ও জীবনের দর্শন।
হাসান হাফিজুর রহমান প্রধানত কবি হলেও প্রবন্ধ ও অনুবাদে সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থসমূহ হলো—
একফালি রোদ্দুর (১৯৫৭) – প্রথম কাব্যগ্রন্থ, যেখানে তারুণ্যের স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছে।
অস্তিত্বের প্রতীক (১৯৬০) – এখানে মানবজীবনের গভীরতা, সামাজিক টানাপোড়েন ও দার্শনিকতা ফুটে উঠেছে।
স্মৃতির শহর (১৯৬৬) – দেশ, মানুষ ও সময়কে কেন্দ্র করে লেখা।
কালের চিহ্ন (১৯৭০) – বাস্তবতা, বেদনা ও আশার মিশ্রণ।
তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজ নিয়ে। অনুবাদক হিসেবেও তিনি খ্যাতি লাভ করেন। বিদেশি সাহিত্যকে বাংলায় অনুবাদ করে পাঠকদের সঙ্গে নতুন দিগন্তের পরিচয় করিয়ে দেন।
হাসান হাফিজুর রহমান শুধু কবি ছিলেন না; তিনি সাংবাদিকতা ও সম্পাদনায়ও ছিলেন দক্ষ। তিনি সংবাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক বাংলা-সহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন।
এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং নির্যাতনের শিকার হন। তবু দমে যাননি। যুদ্ধ চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে তিনি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে অটল অবস্থান নেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তার সম্পাদিত “স্বাধীনতার কবিতা” সংকলন প্রকাশিত হয়, যেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন ও স্বাধীনতার অনুরণন পাওয়া যায়। এটি মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যর একটি অমূল্য দলিল।
হাসান হাফিজুর রহমানের রচনায় কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়—
দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা – তিনি মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
মানবিকতা – সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তার কবিতায় বারবার উঠে এসেছে।
আধুনিকতা ও প্রতীকধর্মিতা – তার কবিতায় প্রতীকের ব্যবহার, দার্শনিকতা ও নতুন কাব্যভঙ্গি ছিল স্পষ্ট।
সংঘর্ষ ও বেদনা – ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনের দ্বন্দ্ব তার রচনায় ফুটে উঠেছে।
হাসান হাফিজুর রহমান তার সাহিত্যকর্ম ও অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৭)
একুশে পদক (মরণোত্তর, ১৯৮৩)
তিনি ছিলেন বিনয়ী, শান্ত স্বভাবের এবং সাহিত্যপ্রেমী। জীবনের শেষ সময়ে তিনি নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫১ বছর।
হাসান হাফিজুর রহমান আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার সাহিত্যকর্ম আজও বাঙালির প্রেরণা।
তার কবিতা নবীন কবিদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
তার সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনা সংগ্রহ জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।
সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চায় তার অবদান বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে হাসান হাফিজুর রহমান এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কবি হিসেবে তিনি স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর, সাংবাদিক হিসেবে সত্যের অনুসন্ধানী এবং সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে জাতির অনুপ্রেরণা। তার স্বল্পায়ু জীবনে তিনি যে কাজ রেখে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অমূল্য ধন হয়ে থাকবে।