ভারতের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় ছিল গভীর অস্থিরতার যুগ। মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষমতা ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছিল, আরেকদিকে ইংরেজ ও ফরাসি বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো কূটনৈতিক চাতুর্যের মাধ্যমে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছিল। এই অস্থির সময়ে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লিখিত। তিনি ছিলেন একদিকে তরুণ, সাহসী ও স্পষ্টভাষী; অন্যদিকে অদূরদর্শীতা, প্রজাদের সঙ্গে দূরত্ব ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় অক্ষমতার কারণে ইংরেজদের হাতে বাংলার স্বাধীনতার পতন ঘটে।
সিরাজউদ্দৌলার জন্ম ১৭৩৩ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদাবাদে। তাঁর পিতা ছিলেন জমীদার জাফর আলী খান এবং মা আমিনা বেগম নবাব আলীবর্দি খানের কন্যা। আলীবর্দি খান ছিলেন বাংলার এক শক্তিশালী ও বিচক্ষণ নবাব। ছোটবেলা থেকেই সিরাজ নানা আদরে বেড়ে ওঠেন এবং দাদার (আলীবর্দি খান) প্রিয় নাতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আলীবর্দি খান তাঁকে বিশেষ স্নেহ করতেন এবং ভবিষ্যতে বাংলার সিংহাসনের উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করছিলেন।
শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ না থাকলেও অশ্বারোহণ, যুদ্ধবিদ্যা, তীরন্দাজি ও কুস্তি প্রভৃতি ক্রীড়ায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে সাহসী মনোভাব ও একরোখা স্বভাব দেখা যেত।
১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে আলীবর্দি খানের মৃত্যু হলে মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন। বাংলার পাশাপাশি বিহার ও উড়িষ্যাও তাঁর শাসনাধীন ছিল। এত বিশাল একটি প্রদেশ শাসন করার জন্য অভিজ্ঞতা, কৌশল ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা প্রয়োজন ছিল, যা এই তরুণ নবাবের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে ছিল না। তবুও তিনি ইংরেজ ও ফরাসিদের ক্রমবর্ধমান শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন।
সিরাজউদ্দৌলা তাঁর শাসনামলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন—
ইংরেজদের প্রতিরোধ: তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেবল ব্যবসা করছে না; তারা দুর্গ ও অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি করছে, যা শাসকের জন্য হুমকি। তিনি ইংরেজদের দুর্গ মজবুতকরণ ও নতুন করে অস্ত্র মজুদ করার বিরোধিতা করেন।
অভ্যন্তরীণ শাসন: তরুণ বয়সের কারণে তাঁর শাসনকাজে কঠোরতা ও আবেগপ্রবণতা বেশি দেখা যেত। ফলে অনেক সময় প্রভাবশালী জমিদার ও দরবারী গোষ্ঠী তাঁর বিরোধিতা করত।
প্রজা কল্যাণ: ইতিহাসে উল্লেখ আছে, তিনি প্রজাদের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনতেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তাঁকে দুর্বল করে তোলে।
সিরাজউদ্দৌলা যখন সিংহাসনে বসেন, তখন বাংলার রাজনীতিতে তিনটি শক্তি মুখোমুখি ছিল—
নবাব নিজে
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকারীরা (মীর জাফর, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ প্রমুখ)
কলকাতা অভিযান (১৭৫৬):
ইংরেজরা কলকাতায় দুর্গ মজবুত করছিল। সিরাজউদ্দৌলা এ নির্দেশ অমান্য করা দেখে রুষ্ট হন এবং কলকাতা আক্রমণ করেন। ইংরেজরা পালিয়ে যায়, আর নবাব শহর দখল করেন। ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডি’ নামে পরিচিত ঘটনাটি এই সময় ঘটে বলে ইংরেজরা প্রচার করে, যদিও এ ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এই ঘটনায় ইংরেজরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে।
পলাশীর যুদ্ধ ছিল বাংলার ভাগ্য পরিবর্তনের যুদ্ধ। রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজরা মীর জাফর ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করে। যুদ্ধক্ষেত্রে নবাবের বাহিনী সংখ্যায় বেশি থাকলেও অধিকাংশ সেনাপতি ইংরেজদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিরপেক্ষ থাকে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নবাব পরাজিত হন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দিলেও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তাঁর পতন ঘটে।
যুদ্ধের পর সিরাজউদ্দৌলা পালিয়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। অবশেষে ধরা পড়ে মীর জাফরের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। মাত্র ২৪ বছর বয়সে এই তরুণ নবাবের জীবনাবসান ঘটে।
সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী: অল্প বয়সেই তিনি বিদেশি শক্তির বিপক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছিলেন।
আবেগপ্রবণ: সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থিরতা ও আবেগপ্রবণতা তাঁকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রিয়নাতি: আলীবর্দি খানের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। তবে সেই স্নেহ তাঁকে বাস্তব রাজনীতির কঠোর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করেছিল।
একাকী যোদ্ধা: মীর জাফরসহ অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়।
শেষ স্বাধীন নবাব: সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর বাংলার স্বাধীনতা কার্যত শেষ হয়।
ইংরেজ শাসনের সূচনা: পলাশীর যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে ইংরেজ আধিপত্যের দ্বার উন্মুক্ত করে।
বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক: মীর জাফরের নাম চিরকাল বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে থাকে।
জনমনে স্মরণীয়: আজও সিরাজউদ্দৌলা বাংলার শেষ স্বাধীন শাসক হিসেবে বীরত্ব ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার জীবনী মূলত এক তরুণ শাসকের সংগ্রাম ও পতনের ইতিহাস। তিনি বাংলার স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা, ইংরেজদের কূটনীতি ও নিজের অদূরদর্শীতার কারণে ব্যর্থ হন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু শুধু এক নবাবের সমাপ্তি নয়, বরং সমগ্র উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের সূচনা ঘটায়।
আজও বাংলার মানুষ তাঁকে স্মরণ করে এক মহান বীর হিসেবে, যিনি বৈদেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম দাঁড়িয়েছিলেন।