‘আসমানে তোর ছায়ারে কন্যা, জমিনে তোর বাড়ি/ রূপ লইয়া তোর চান-সুরুজে, লাগছে কাড়াকাড়ি/’—কথাগুলো যেমন অচেনা, সুরটাও তেমনই। কারণ এ গান এর আগে কেউ করেনি। তবে ঢঙের কারণে গানটিকে পরিচিত কিংবা আপন মনে হচ্ছে শ্রোতাদের। বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্যবাহী ধারা ধুয়া গানের রীতিতে করা হয়েছে এটি।এ ধরনের গান সাধারণত দলবদ্ধ হয়ে পরিবেশন করা হয়। কখনো গানের বাণী হয় প্রশ্নবোধক, কখনো প্রশ্নের উত্তর, কখনো দেহতাত্ত্বিক, কখনো আবার উপদেশমূলক। কালের বিবর্তনে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এ ধারা।তবে ‘বাজি’র মাধ্যমে ধুয়া গানকে যেন নতুন করে প্রাণ দিলেন সংগীত পরিচালক ইমন চৌধুরী।
সেটার জন্য দেশের পালাগান নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছি। সেই সুবাদে ‘বারো মাসে বারো ফুল’র সন্ধান পাই এবং এটিকে ‘কথা কইয়ো না’র সঙ্গে সমন্বয় করি।”কথা কইয়ো না’ গানের জবাব হিসেবে ‘বাজি’ তৈরি করা হয়েছে। গানটির সংগীতায়োজন নিয়ে যখন দিনরাত ভাবনায় মজে আছেন ইমন, তখনই সামনে পড়ে জালাল উদ্দিন খাঁ’র বই। কয়েক পাতা ওল্টানোর পর চোখ আটকে যায় ‘আসমানে তোর ছায়ারে কন্যা’য়। ব্যস, এটাকেই তুলে নেন সুরের খেয়ায়। ইমনের মতে, ‘এ রকম কিছুই মনে মনে খুঁজছিলাম, আর পেয়েও গেলাম। আমি সব সময় দেখেছি, মন থেকে কিছু করতে চাইলে স্রষ্টা ঠিকই মিলিয়ে দেন।’ এর সঙ্গে জালাল উদ্দিন খাঁর আরেকটি গান ‘কার কাছে বলিব’র দুটি লাইনও যুক্ত করেছেন ইমন।সুর করার সময় ইমন মাথায় রেখেছেন ধুয়া গান। যেটার খবর ইমন পেয়েছিলেন তাঁর বাবার কাছ থেকে। একদিন তাঁর বাবা ধুয়া গানের একটি দলের ভিডিও পাঠান। দেখে অবাক হয়ে যান ইমন। এমন ধাঁচের গান কখনো দেখেননি আগে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এটা মূলত টাঙ্গাইলের ‘কুমাতগাতা ধুয়া গানের দল’। তাদের কেউ ইটভাটায় কাজ করেন, কেউ চালান রিকশা; আর অবসরে মজে থাকেন ধুয়া গানে। ইমন যোগাযোগ করেন তাঁদের সঙ্গে, সব কিছু বুঝিয়ে বলেন। প্রথমে তাঁরা বিশ্বাসই করতে চাইছিলেন না। অনেক বোঝানোর পর ঢাকায় আসতে রাজি হন।ইমন বলেন, ‘ঢাকায় আসার পর দুই দিন শুধু তাঁদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। কাজের ব্যাপারে কিছু বলিনি। যাতে তাঁরা স্বাভাবিক হতে পারেন। এরপর গানটির বিষয়ে আলোচনা করি। আলোচনা শেষে তাঁরা ফিরে যান গ্রামে, রেকর্ডিং কিন্তু হয়নি। এর কিছুদিন পর তাঁরা গান রেকর্ডিংয়ের জন্য আসেন। কাজ শেষে যাওয়ার সময় আবেগে কেঁদে ফেলেন তাঁরা। বলেন, ‘তোমরা যে সম্মান দিলা, আজীবন মনে রাখব। আমরা আবার আসব, তোমাদের খুব ভালো লাগছে।’ এই অভিজ্ঞতা আমার জন্যও খুব স্পেশাল।”গানের মধ্যে দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপস্থাপন ক্রমে বাড়াতে চান ইমন। বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমরা জাপানে গিয়েছিলাম, সেখানে কিন্তু আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির গানই করতে হয়েছে। তাই যতটা সম্ভব নিজেদের কালচারটাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা উচিত। দেখুন, ছোটবেলায় আমরা দেখতাম অনেকে পাতার বাঁশি বাজাত। অথচ ‘কথা কইয়ো না’ গানের জন্য খুঁজতে গিয়ে একজন শিল্পী পেতে অনেক কষ্ট হয়েছিল। তেমনি ধুয়া গানের হয়তো কয়েকটা দল এখনো আছে। কিন্তু সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে কত দিন থাকবে? কোক স্টুডিও একটা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। সেখানে আমাদের সংস্কৃতি, লোক-ঐতিহ্য তুলে ধরলে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাবে। আমার স্বপ্ন ছিল, পাহাড়, নদী, সমতল, সমুদ্র সব জায়গার সংস্কৃতিকে একটি মালায় গাঁথব। কতটুকু পেরেছি জানি না, তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।’