সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫
  • ৮ বার পড়া হয়েছে
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে নারী কী রূপে ধরা পড়েছে, সেখানে নারীর অবস্থান কী, এ সম্পর্কে সংগত কারণেই সিদ্ধান্ত টানা প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া নজরুলের সব সাহিত্য সৃষ্টিতে নারী একই রূপে রূপায়িত হয়নি। নজরুল সাহিত্যে নারীর রূপায়ণের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য তাঁর কাব্যপ্রবাহকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এক ভাগে পড়বে তাঁর রোমান্টিক প্রেমের কাব্যগুলো; ‘দোলনচাঁপা’ [১৯২৩], ‘ছায়ানট’ [১৯২৫], ‘পুবের হাওয়া’ [১৯২৬], ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ [১৯২৮], ‘চক্রবাক’ এবং অন্য ভাগে পড়বে ‘সাম্যবাদী’ [১৯২৫]।
এ ছাড়া রাজনৈতিকতা মুখ্য বিদ্রোহমূলক কাব্যেও নারীর রূপায়ণ রয়েছে। তবে সেখানে মানবী নারী নয়, বরং পুরাণের শক্তিরূপিণী দেবীই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এ কারণে বিদ্রোহীমূলক কবিতায় রূপায়িত নারীকে ঠিক নারীর রূপায়ণ বা মূল্যায়ন হিসেবে বর্তমান প্রবন্ধে বিবেচনা করা হয়নি।নজরুলের কাব্যে এক ভিন্ন নারীরূপ এবং নারীভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে।
কিন্তু নজরুলের সাম্যচিন্তা কেবল অর্থনৈতিক শ্রেণী সাম্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সাম্যবাদী চিন্তার সঙ্গে রাজনৈতিক সাম্যতত্ত্বের সাদৃশ্য হয়ত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু নজরুলের সাম্য চেতনা আরো ব্যাপক।
কারণ, অনেকে মনে করেন নজরুলের সাম্যবাদ-মরমী চেতনা থেকে উৎসারিত’ (কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও সৃজন, রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইনস্টিটিউট, পৃষ্ঠা-৪৯৭)। ফলে নজরুলের সাম্যবাদী চিন্তার আওতায় খুব অনায়াসে বিবেচিত হয় যেমন ধনী-নির্ধন, তেমনি হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-সাঁওতাল-ভীম-গারো, রাজা-প্রজা, চোর-সাধু, ব্রাহ্মণ-শূদ্র এবং নারী-পুরুষ।প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে অসাম্যের তো নানা রকমফের রয়েছে। নজরুল স্থান-কাল-পাত্রভেদে সকল অসাম্যের বিরোধী। সর্বপ্রকার অসাম্য দূর করে নজরুল পৃথিবীকে ‘সাম্যবাদী স্থান’ বানাতে চান। এহেন সর্বাত্মক সাম্যবাদী নজরুলের পক্ষেই ঘোষণা করা সম্ভব—‘সাম্যের গান গাই/আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’(নজরুল রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা-৮৯)।নজরুল তাঁর সাম্যবাদী কাব্যে নারী-পুরুষের সর্বপ্রকার ভেদের বিপক্ষে। নারী-পুরুষের প্রথাগত ভেদকে উঠিয়ে দিয়ে তিনি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য ‘মানুষ’ প্রত্যয়টি ব্যবহারের পক্ষপাতী। সাম্যবাদী কাব্যের ‘নারী’ ও ‘বীরাঙ্গনা’ কবিতায় নজরুল প্রথাগত নারীভাবনাকে রুখে দিয়েছেন। এখানে তিনি পুরুষের আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠা এবং নারীর অবরুদ্ধ হওয়ার ইতিহাসকে যেমন চিহ্নিত করেছেন, তেমনি বর্তমান অবরুদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে নারীকে নতুন ইতিহাস নির্মাণের আহবান জানিয়েছেন। নারীর অবরুদ্ধ হওয়ার ইতিহাস-মুহূর্ত সম্পর্কে নজরুল বলেছেন—‘কখন আসল প্লুটো যমরাজা নিশীথ পাখায় উড়ে,

ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে।

সেই যে আদিম বন্ধন তব, সেই হতে আছ মরে

মরণের পরে নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী’।

(নজরুল রচনাবলী, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৯১)

প্রথাগত নারীভাবনায় নারীকে দেখা হয় ভীরু, অন্তঃপুরবাসী, সৌন্দর্যময় অলংকারে বিভূষিত কুণ্ঠিত আকারে। নজরুল নারীকে দেখতে চান এসবের বাইরে নতুনরূপে, পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপে। নারীকে এই স্বাভাবিক প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি নারীর ব্যবহৃত অলংকারকে মনে করেন দাসত্বের চিহ্ন। তিনি নারীকে এই দাসত্বের চিহ্ন ফেলে অবরুদ্ধতা থেকে মুক্ত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন—

‘চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায়ে মল

মাথায় ঘোমটা, ছিঁড়ে ফেল নারী ভেঙ্গে ফেল ও শিকল!

যে ঘোমটা তোমায় করিয়াছে ভীরু ওড়াও সে আবরণ;

দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন ঐ যত আভরণ!’

(প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৯১)

নজরুল চেতনাগতভাবে সকল প্রকার আধিপত্য ও অবরুদ্ধতার বিরুদ্ধে। এদিক থেকে তিনি পুরুষকে আবিষ্কার করেছেন আধিপত্যবাদী ও উত্পীড়ক হিসেবে। আর নারীকে মনে করেছেন আধিপত্যের শিকার এবং উত্পীড়িত হিসাবে। সাম্যবাদী নজরুল নারী পুরুষের এই পরিস্থিতিকে নারী পুরুষের অসাম্য হিসাবে দেখলেও শেষ পর্যন্ত তিনি একে মনে করেন পীড়ক এবং পীড়িতের সমস্যা হিসাবে। নজরুল এই অসাম্যের মধ্যে সাম্য বিধানের যে সূত্র নির্দেশ করেন, তা কেবল নারী পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এক সামগ্রিক সূত্রে হয়ে উঠেছে।

নারী অবলা নয়; তার মধ্যে যে আদ্যাশক্তির অমিত সম্ভাবনা নিহিত আছে, সে সম্পর্কে সে অচেতন বলেই নারী অবরুদ্ধ জীবনের অবমাননা মুখ বুজে সহ্য করে। তাই কবি জাগরণী মন্ত্রে নারীদের জাগ্রত করার প্রয়াস দেখিয়েছেন তাঁর নারী জাগরণীমূলক গান ও কবিতায়। নজরুল নারীর রণরঙ্গিণী মূর্তিই কামনা করেননি, তাকে প্রেমময়ী বধূ, স্নেহময়ী জননী ও প্রিয়

দয়িতারূপেও চিত্রিত করেছেন। তাঁর অজস্র গান ও কবিতায় তার প্রমাণ রয়েছে।নজরুলের গানে দেশপ্রেম নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে নারী জাগরণ বা বাংলার নারীদের কুসংস্কারের অন্ধকার ভেঙে আলোতে বেরিয়ে আসার প্রেরণামূলক গান সংখ্যায় বেশি না হলেও উল্লেখযোগ্য। আপাতভাবে নারীর মানবিক অধিকার তথা তার শৃঙ্খলিত জীবনের কথা থাকলেও এর মধ্য দিয়ে সংগীতকার নজরুলের স্বদেশচেতনাই প্রস্ফুটিত। শুধু গানেই নয়, কবিতায়ও নজরুল আগেই বলেছেন—‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার আনিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’নজরুল জানতেন, এই সমাজ যে পিছিয়ে আছে, তার কারণ হচ্ছে অধিকারবঞ্চিত আমাদের নারীসমাজ। নারীরা সংসার-সমাজশিকলে বন্দি থাকায় আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ হচ্ছে না। তাই তাদের টেনে আনতে হবে সভ্যতার আলোয়। এই উপলব্ধি থেকে নজরুল নারী জাগরণমূলক স্বদেশি গান রচনা করেছেন। বাংলায় এ ধারার গান একেবারেই কম। তার মধ্যে নজরুলের নিম্নের প্রথম গানটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ এবং বাকি গানগুলোও যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য—১. ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’, ২. ‘আমি মহাভারতী শক্তি নারী’ ৩. ‘চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা’ ৪. ‘কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া’ ৫. ‘এসো শঙ্কর ক্রোধাগ্নি’ ৬. ‘গুণে গরিমায় আমাদের নারী আদর্শ দুনিয়ায়’ ৭. ‘জাগিলে পারুল কিগো সাত ভাই চম্পা ডাকে’ ৮. ‘মেলি শতদিকে শত লেলিহান রসনা’ ৯. ‘ঐ নন্দন নন্দিনী দয়িতা’ ১০. ‘তুমি মোর জননী ধরেছ জঠরে’ প্রভৃতি।এসব গান নারীদের পরমা শক্তির অংশরূপে বর্ণনা করে কবি তাদের অনুপ্রাণিত করবার প্রয়াস পেয়েছেন। কোথাও বর্তমান কালের নারীদের অনুপ্রাণিত করতে ইতিহাসখ্যাত বীর রমণীদের প্রশস্তি করেছেন। ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ একটি প্রবল তেজোময় সংগীত। এর শক্তিদীপ্ত পৌরাণিক পূর্বোল্লেখ, বেগবান শব্দমালার সঙ্গে পরিপূরক খেয়াল অঙ্গের সুর গানটিকে এক দীপ্ত আহ্বানে পরিণত করেছে” (নজরুল-গীতি প্রসঙ্গ, করুণাময় গোস্বামী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃষ্ঠা-১৪৩)।

নজরুলের চেতনায় যে দেশ ছিল, সেই দেশের নারীরাও তাই ভাষা পেয়েছে তাঁর গানে, সুরে—এ কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। প্রয়াণ দিবসে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com