বাংলার ইতিহাসে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন এক অসাধারণ রাজনৈতিক নেতা, সমাজসংস্কারক ও জননেতা। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি শুধু রাজনৈতিক মঞ্চেই নয়, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। মুসলমানদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় তাঁর আপসহীন অবস্থান তাঁকে জনগণের কাছে “শেরেবাংলা” উপাধিতে ভূষিত করেছে।
এ. কে. ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কওমুদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ আইনজীবী এবং সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। মাতা সাজেদা খাতুন ছিলেন স্নেহশীলা ও শিক্ষানুরাগী নারী। পারিবারিক শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা তাঁকে ছোটবেলা থেকেই জ্ঞান অর্জনের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
শৈশবে তিনি স্থানীয় মক্তব থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও কৃতিত্বপূর্ণ। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি গণিত ও রসায়নে কৃতিত্বের সাথে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর আইন পেশায় পড়াশোনার জন্য লন্ডনে যান এবং লন্ডনের গ্রে’স ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও তিনি বেশি পরিচিতি লাভ করেন রাজনৈতিক অঙ্গনে। তিনি খুব অল্প সময়েই বাঙালি মুসলমান সমাজের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। তাঁর বক্তব্য, চিন্তাধারা এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সাধারণ মানুষের কাছে তাঁকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ। তিনি কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি এবং পরে আওয়ামী মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে প্রতিটি জায়গায় তিনি জনকল্যাণকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সময় তিনি কংগ্রেসে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তবে হিন্দু নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসে মুসলমানদের প্রতি উপেক্ষার নীতি তাঁকে হতাশ করে।
১৯১৩ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগ দেন। মুসলিম লীগের মধ্যে তিনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লাভ করেন। ১৯১৬ সালে তিনি লখনৌ চুক্তির মধ্যস্থতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৩৭ সালে বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও কৃষক-শ্রমিকদের সমর্থনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
বাংলার কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় তিনি কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন। ভূমিদাস প্রথা, জমিদারদের শোষণ ও কৃষকদের দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে তিনি জোরালো অবস্থান নেন। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রজাদের খাজনা কমানো, ঋণ মওকুফের ব্যবস্থা এবং প্রজাস্বত্ব আইন প্রণীত হয়। ফলে তিনি “কৃষকবন্ধু” নামেও পরিচিত হন।
ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের সর্বাধিক গৌরবময় অধ্যায় হলো ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব পেশ। ২৩ মার্চ লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে তিনি যে প্রস্তাব উত্থাপন করেন, তা-ই পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে পরিচিত হয়। এই প্রস্তাবে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান অধ্যুষিত প্রদেশগুলো নিয়ে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেন। ইতিহাসে এটি “লাহোর প্রস্তাব” বা “পাকিস্তান রেজোলিউশন” নামে খ্যাত। যদিও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর তিনি অবহেলিত হন, তবু মুসলিম জাতির মুক্তির সংগ্রামে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। এ সময়ে তিনি কৃষকদের স্বার্থরক্ষা, শিক্ষার প্রসার ও প্রশাসনিক সংস্কারে কাজ করেন। তাঁর আমলেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষাকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি মুসলমান ছাত্রদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ ও শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি ছিলেন এক দুর্নীতিবিমুখ, সৎ ও সাহসী প্রশাসক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তাঁর সততা ও নিষ্ঠার প্রশংসা করতেন।
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ফজলুল হক বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও গভর্নর পদে আসীন ছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর সঙ্গে নেতৃত্ব দেন এবং মুসলিম লীগকে বাংলায় পরাজিত করেন।
যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনের পর তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে সরে যান। জীবনের শেষ সময়ে তিনি ঢাকায় বসবাস করতেন।
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিস্থল বর্তমানে “শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ” এর কাছেই অবস্থিত।
ফজলুল হক ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, সমাজসংস্কারক, শিক্ষানুরাগী ও সর্বোপরি একজন মানবপ্রেমী। তিনি বাংলার কৃষক-শ্রমিক, দরিদ্র-নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সব সময়। তাঁর ত্যাগ, সততা ও আপসহীন মনোভাব তাঁকে অমর করে রেখেছে।
“শেরেবাংলা” উপাধি দিয়ে বাংলার মানুষ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আজও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় বাংলার সাধারণ মানুষের মুক্তির প্রতীক হিসেবে।
শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন বাংলার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন জনতার অকৃত্রিম বন্ধু। কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে ছাত্র-যুবক—সবার জন্যই তাঁর ছিল গভীর মমতা। লাহোর প্রস্তাব থেকে শুরু করে বাংলার কৃষক মুক্তির সংগ্রাম—সবখানেই তাঁর অবদান অম্লান হয়ে আছে। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখি সত্যনিষ্ঠা, দেশপ্রেম এবং সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা।