ক্লাস সেভেন এইটে পড়ার সময় থেকে আমার খুব প্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছিল বাংলাবাজার এলাকাটি। ছেষট্টি-সাতষট্টি সালের কথা। বেশ পরিচ্ছন্ন একটি এলাকা বাংলাবাজার। রাস্তার দুই ধারে সার ধরা বইয়ের দোকান।
ক্লাস সেভেন এইটে পড়ার সময় থেকে আমার খুব প্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছিল বাংলাবাজার এলাকাটি। ছেষট্টি-সাতষট্টি সালের কথা। বেশ পরিচ্ছন্ন একটি এলাকা বাংলাবাজার। রাস্তার দুই ধারে সার ধরা বইয়ের দোকান।
স্বাধীনতার পর লেখালেখির জগতে এসে নিজের পয়সায় ওই ফুটপাত থেকে বই কিনতাম। এক টাকা বা দুই টাকার বই। জগন্নাথ কলেজে পড়ি। গেণ্ডারিয়া থেকে বাংলাবাজার হয়ে হেঁটে যাই কলেজে। যাওয়ার সময় ফুটপাতে বই দেখে দেখে কাটাই কিছুটা সময়। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে এবং ফেরার সময়ও ফুটপাতে বই দেখেই কাটাই অনেকটা সময়। সুযোগ পেলে দু-একটি বই কলেজের বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাড়ি নিয়ে আসি।
এই ফুটপাত থেকে তিয়াত্তর সালে কিনেছিলাম শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতার বই ‘প্রথম গান, ‘দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। বইটির নিচের দিককার ইঞ্চিখানেক জায়গা ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে। পুটের নিচের দিককার কিছুটা অংশ ছেঁড়া। শামসুর রাহমানের নাম শুনেছি, তখনো তাঁর কবিতা পড়া হয়নি। বইটির দাম চাইল বারো আনা। অনেক দামাদামি করে আট আনা দিয়ে কিনলাম। মেরে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, পারিনি। যে মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বইয়ের বিক্রেতা, সেদিন তিনি একা ছিলেন না। তাঁর কিশোর ছেলেটি ছিল সঙ্গে। সেটি বড়ই ত্যাঁদড়। ওর চোখ ফাঁকি দিতে পারিনি। আট আনা পয়সা চলে গেল শামসুর রাহমানের পেছনে। সেই বই আজও আমার কাছে আছে। ফার্স্ট এডিশনের বই। ফাল্গুন, ১৩৬৬ সালে প্রকাশিত। প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমদ, বার্ডস এ্যান্ড বুক্স, ৪, ফোল্ডার স্ট্রীট, ঢাকা-৩। প্রচ্ছদ : কাইয়ুম চৌধুরী। মুদ্রণ : ইডেন প্রেস, ঢাকা-১। বাঁধাই : পূরবী বাইন্ডার্স, ৭, আহসানউল্লাহ রোড, ঢাকা-১। মূল্য : আড়াই টাকা। উৎসর্গপত্রে লেখা হয়েছিল—
আমার খামার নেই নেই কোনো শস্যকণা
আছে শুধু একটি আকাশ
তারই কিছু আলো-নীল আজো হে সুদূরতমা
ভালবেসে তোমাকে দিলাম \
এই বইয়ে কবিতা আছে উনচল্লিশটি। কার্টিজ পেপারে ছাপা ছেষট্টি বছর আগের বইটির পাতাগুলো খুব ম্লান হয়ে গেছে। কিন্তু শামসুর রাহমানের অমূল্য কবিতাগুলো একটুও ম্লান হয়নি। সময়ের ধুলো সরিয়ে এখনো ঝকঝকে তরতাজা। এই বইয়ের প্রথম কবিতার নামেই গ্রন্থের নাম। দ্বিতীয় কবিতাটি অত্যন্ত বিখ্যাত, ‘রূপালী স্নান’।
শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ
অথবা প্রখর ধূ ধূ পিপাসার আঁজলা ভরানো
পানীয়ের খোঁজ
শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্নের কাছে এসে রোজ
চাইনিতো আমি।
সেদিন কে জানত, এই মহান কবির সঙ্গে একদিন আমার পরিচয় হবে। আমি হয়ে উঠব তাঁর অত্যন্ত স্নেহভাজন। তাঁর সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হব। তাঁর পুত্রবধূ টিয়া রাহমানের হয়ে উঠব শ্রদ্ধাভাজন। শামসুর রাহমানের পরিবারের সঙ্গে গড়ে উঠবে অত্যন্ত আন্তরিক সম্পর্ক।
সেই ফুটপাতের দোকানি ভদ্রলোকের সঙ্গে বহুকাল পর একদিন দেখা হয়েছিল। হয়তো পঁচিশ-তিরিশ বছর পর। তত দিনে লেখক হিসেবে আমি কিছুটা খ্যাতি অর্জন করেছি। চলাচলের জন্য গাড়ি হয়েছে। গাড়ি নিয়ে একদিন বাংলাবাজারে গেছি। সেই ফুটপাতের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম, সামনে কিছু বই নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন সেই মানুষটি। বয়সের ভারে শরীর ভেঙে গেছে। চুল-দাড়ি সাদা। চোখে মোটা কাচের পুরনো চশমা। চশমার এক দিককার হ্যান্ডল ভেঙে গেছে। কালো কাইতান দিয়ে মাথার পেছন দিকে বেঁধে রেখেছেন। গাড়ি থেকে নেমে মানুষটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ‘চিনতে পারেন?’ মানুষটি চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। মোটা কাচের চশমার ভেতর থেকে তীক্ষ চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার পরই ভাঙাচোরা মুখটি উজ্জ্বল হলো তাঁর। ‘কও কি মিয়া। তোমারে চিনুম না! তুমি আমার দোকান থিকা কত বই চুরি করছ? তুমি যে বই সরাইতেছ, আমি তো দেখতাম! কিছু কইতাম না। একটা পোলার এত বই পড়ার শখ, পড়ুক গিয়া। আমার আর কত লস হইব। বই বেইচা তখন ভালোই রোজগার করতাম।’ মানুষটির কথা শুনে আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। কোন মানুষের ভেতর যে কী রয়ে গেছে! আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাঁর সংসারের খবর নিয়েছিলাম। স্ত্রী মারা গেছেন। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা ভালো আছে। একমাত্র ছেলেটি শ্যামবাজারে কাঁচামালের পাইকারি কারবার করে। তার অবস্থা মন্দ না। তিনি ছেলের সংসারেই আছেন। ছেলে কিছুতেই চায় না বাপ ফুটপাতে বসে আর বই বিক্রি করুক। তিনি এসে বসেন তাঁর অভ্যাসমতো। বইয়ের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে থাকেন। প্রতিদিন বই ছুঁয়ে দেখতে না পারলে তাঁর ভালো লাগে না। আমি সেই মহান বইওয়ালার কথা এই জীবনে ভুলতে পারব না। তাঁকে কিছু টাকা দিয়েছিলাম। কিছুতেই নিতে চাননি। পকেটে গুঁজে দিয়ে এসেছিলাম।
বাংলাবাজারের এক প্রকাশক আমাকে ধরলেন, যেমন করে হোক শামসুর রাহমানের বই তাঁকে এনে দিতে হবে। তিনি শামসুর রাহমানের কবিতার বই ছাপবেন। আমি শামসুর রাহমানের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন, ‘একদিন নিয়ে এসো আমার কাছে।’ শামসুর রাহমান সবাইকে আপনি করে বলতেন, আমাকে বলতেন তুমি করে। সেই প্রকাশককে নিয়ে গেছি এক সন্ধ্যায়। তিনি পঁচিশ হাজার টাকাও নিয়ে গেছেন কবিকে অ্যাডভান্স দেওয়ার জন্য। শামসুর রাহমানের সামনে বসে ভদ্রলোক এত বিনয়ী হয়ে উঠলেন, কথায় কথায় কবিকে বলতে লাগলেন ‘কবি সাহেব’। যতবার প্রকাশক ‘কবি সাহেব’ বলেন, ততবারই শামসুর রাহমান চোখ তুলে আমার দিকে তাকান। ঘটনাটা আমি বুঝে গেছি। ‘কবি সাহেব’ কথাটা শামসুর রাহমান নিতেই পারেন না। খুবই বিরক্ত হন। তার পরও কথাটা তো প্রকাশকের মুখের ওপর বলা যায় না। পরে একদিন তিনি আমাকে বললেন, “তোমার ওই প্রকাশক ভদ্রলোক মানুষ ভালো। তবে ওর ‘কবি সাহেব’টা বড় বাজে।” অবশ্য সেই ভদ্রলোকের প্রকাশনা সংস্থা থেকে শামসুর রাহমানের অনেকগুলো কবিতার বই বেরিয়েছিল। তাঁর কাছে তিনি সব সময়ই ‘কবি সাহেব’ হয়েই থাকলেন। পরে আমার সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, ‘কবি সাহেব কেমন আছেন?’