বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে হুমায়ূন আহমেদ এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক। তাঁর সৃষ্টিশীলতা, সহজ ভাষাশৈলী, অনন্য গল্প বলার ক্ষমতা এবং জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে পাঠক-দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন দিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। তাঁর বাবা শহীদ ফয়জুর রহমান ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শহীদ হন। মা আয়েশা ফয়েজ ছিলেন গৃহিণী ও সাহিত্যানুরাগী। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জেলার ছোট শহরে—কারণ বাবার চাকরির সূত্রে পরিবারকে স্থানান্তরিত হতে হতো বারবার। পরিবারের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক পরিবেশ তাঁর মানসগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। স্কুল জীবন শেষ করে তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজে এবং সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন কৃতিত্বের সাথে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর লেখালেখি শুরু হয় এবং পাঠকের কাছে তিনি ধীরে ধীরে পরিচিতি পেতে থাকেন। পরবর্তীতে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে তাঁর মনোযোগ ক্রমেই বেড়ে যায়।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজীবন শুরু হয় ১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস “নন্দিত নরকে” দিয়ে, যা পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর তিনি একে একে লিখতে থাকেন অসংখ্য জনপ্রিয় উপন্যাস—যেমন শঙ্খনীল কারাগার, এইসব দিনরাত্রি, কোথাও কেউ নেই, জোছনা ও জননীর গল্প, মধ্যাহ্ন, দেয়াল প্রভৃতি। তাঁর উপন্যাসে সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের হাসি-কান্না, স্বপ্ন-হতাশা, প্রেম-বেদনা এক অসাধারণ স্বাভাবিকতায় উঠে এসেছে। তিনি পাঠকের হৃদয় জয় করেছেন তাঁর ভাষার সহজতা, সংলাপের প্রাণবন্ততা এবং চরিত্রগুলোর বাস্তবতায়।
নাট্যকার হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে তাঁর লেখা টেলিভিশন নাটকগুলো—যেমন এইসব দিনরাত্রি, কোথাও কেউ নেই, বহুব্রীহি, আজ রবিবার—দর্শকপ্রিয়তায় অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র “বাকের ভাই” দেশের দর্শকদের কাছে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। হাস্যরস ও জীবনের গভীরতাকে মিলিয়ে তিনি যে নাট্যরীতি গড়ে তুলেছিলেন, তা বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
চলচ্চিত্র জগতে হুমায়ূন আহমেদ সমান সাফল্যের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি (১৯৯৪) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলা চলচ্চিত্রের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, শঙ্খনীল কারাগারসহ একাধিক চলচ্চিত্রে তিনি গল্পকার, পরিচালক ও গীতিকার হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রে গল্প বলার ভঙ্গি, আবেগের গভীরতা এবং সংগীতের সুষমা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি শিশু সাহিত্যেও ব্যাপক অবদান রেখেছেন। হিমু ও মিসির আলি—এই দুই কাল্পনিক চরিত্র পাঠকের মনে স্থায়ী আসন নিয়েছে। হিমু এক রহস্যময়, সমাজের বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে থাকা চরিত্র, আর মিসির আলি যুক্তিবাদী, ধাঁধা সমাধানকারী মনোবিজ্ঞানী—দুই চরিত্রই পাঠকদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
লেখালেখির বাইরে হুমায়ূন আহমেদ গানও লিখেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সুর দিয়েছেন। তাঁর গানের কথায় ছিল গভীর আবেগ, যা সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তিনি নন্দনকানন নামে নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন এবং সেখান থেকে নাটক ও চলচ্চিত্র প্রযোজনা করতেন। গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামে তিনি নির্মাণ করেন “নুহাশ পল্লী”—যা একদিকে তাঁর ব্যক্তিগত শান্তির আশ্রয়স্থল, অন্যদিকে সংস্কৃতি ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান।
ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ূন আহমেদ প্রথমে গুলতেকিন খানকে বিয়ে করেন, তাঁদের তিন সন্তান—নোভা, শীলা ও নিশাদ। পরবর্তীতে তাঁদের বিচ্ছেদ হয় এবং তিনি অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন, তাঁদের দুই পুত্র নিশাদ ও নিনিত। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্কের বেলেভিউ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে গোটা জাতি গভীর শোকাহত হয়। ঢাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয় নুহাশ পল্লীতে।
বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় সাহিত্যের নতুন ধারা সৃষ্টি করেছেন, যা একদিকে সাহিত্যকে করেছে গণমুখী, অন্যদিকে পাঠকের আবেগ ও চিন্তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তাঁর লেখায় জীবন ও বাস্তবতার মিশ্রণে যে মানবিক বোধ ফুটে উঠেছে, তা পাঠককে একদিকে বিনোদন দিয়েছে, অন্যদিকে চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। তিনি পাঠকের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ সবকিছুকেই আপন ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। তাঁর মৃত্যু বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হলেও, তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও জীবন্ত এবং ভবিষ্যতেও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।