বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে উচ্চশিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, যা আজ দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।তাঁর দূরদর্শিতা, গবেষণাভিত্তিক চিন্তা, মানবকল্যাণে নিবেদিত সাধনা ও সর্বজনীন শিক্ষার বিস্তারে অসামান্য অবদান দেশের শিক্ষা-বিজ্ঞান অঙ্গনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।ড. শমশের আলী ছিলেন আমাদের সময়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম আর মানবিকতা—এই চারটি ক্ষেত্রকে একত্র করে গড়ে তুলেছিলেন এক বিশুদ্ধ চিন্তার জগৎ। তাঁর চোখ ছিল যুক্তিতে, হৃদয় ছিল মানবতায় আর কলম ছিল সত্য ও প্রগতির পক্ষে। তিনি ছিলেন যেমন গম্ভীর একজন বিজ্ঞানী, তেমনি কোমল এক চিন্তাশীল হৃদয়।রংপুরের একটি নিভৃত গ্রামে তাঁর জন্ম, কিন্তু তাঁর আলো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান পিএইচডি ডিগ্রির জন্য। কিন্তু বিদেশের চাকচিক্য তাঁকে টানতে পারেনি। ফিরে এসেছিলেন মাটি আর মানুষের টানে। তিনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে গবেষণা করেছেন, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তরুণদের চোখে জ্বেলে দিয়েছেন বিজ্ঞানচর্চার দীপ্ত শিখা। ডক্টর শমসের আলী ছিলেন বিজ্ঞানী, কিন্তু কেবল তত্ত্বের মানুষ নন, তিনি ছিলেন অনুভবের মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সত্যের পথে সহযাত্রী। তিনি বলতেন, মানুষকে জ্ঞান দিতে হয় ভালোবাসা দিয়ে, তাহলেই সে জানবে জানতে হবে কেন। তাঁর ভাষা ছিল পরিমিত, চিন্তা ছিল গভীর, এবং বিশ্বাস ছিল শিকড়ের মতো দৃঢ়। তিনি বিজ্ঞানকে এনেছেন মাটির কাছাকাছি। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সহজভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বই পড়ে যারা ‘বিজ্ঞান’ বলতে ভয় পেত, তারাও আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তিনি যুক্তিকে দিয়েছেন সাহসিকতার ভাষা। তিনি কখনো চাপা দেননি তাঁর মতামত। যুক্তিনির্ভর চিন্তা দিয়ে তিনি অনেক অন্ধকারে আলো জ্বালিয়েছেন। তিনি ধর্মের গভীরে গেছেন যুক্তির আলো নিয়ে। ধর্মকে প্রশ্ন করতে ভয় না পেয়ে তিনি বুঝতে চেয়েছেন, জানাতে চেয়েছেন, এতে ধর্ম অপমানিত নয়, বরং সমৃদ্ধ হয়। মরহুম শমশের আলী তরুণদের দিয়েছেন চিন্তার ডানা। বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা টিভি পর্দায় তিনি তরুণদের প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, ভাবতে শিখিয়েছেন, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। তবে তাঁর ছিল কিছু সীমাবদ্ধতা এবং কিছু না-পাওয়ার গল্প। কোনো মানুষই পরিপূর্ণ নয়, ড. শমশের আলীর পথেও ছিল কিছু প্রতিবন্ধকতা। অনেক সময় তাঁর লেখাগুলো এতটাই গভীর আর তাত্ত্বিক হতো যে সাধারণ পাঠকের ধরতে কষ্ট হতো। ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর মতামত কিছু মানুষের গোঁড়ামির দেয়ালে ধাক্কা খেতো।মহান আল্লাহ তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমিন।








