শুধু সীমারেখার প্রাচীর পেরিয়ে এক চিৎকার পিছু ছাড়ছে না। সেই মুহূর্ত, যখন নরক জ্বলে ওঠে…সেই দৃশ্যপটও বিস্মৃত মুছে যাচ্ছে না। কেবল তাড়া করে ফিরছে গতি ও গন্তব্যের সমস্ত মানচিত্র পেরিয়েও। আর সেই উত্তাপ—যা কারো দেহের কিংবা যা নেভাতে পারেনি জ্বলে ওঠা হাবিয়া, যার আগুন আকাশকেও পুড়িয়ে দিয়েছিল, কিংবা সেই দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তি—ডানাভাঙা, ঝলসানো কাগজের উড়োজাহাজ তা বহন করে চলছে অলঙ্ঘ্য জেনে। সেই দুটি আঙুল…সেই দৃশ্যপটই লেগে আছে—তুফানের মতো, ঝড়ের মতো, তীব্র মিছিলের শবের মতো এত এত স্থির-অস্থিতিশীল চিত্র মাড়িয়ে কেমন নির্বাক বসে আছে দাগ কেটে।কিছুতেই অদৃশ্য হচ্ছে না। আঙুল দুটো ছুড়ে দিয়েছিল, শূন্যে…তার চেহারা আর মনে নেই। হয়তো সে অবাক বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে হেসেছিল। তার দুই বিনুনি চুল, তার ছোট্ট কানের দুল, তার নাক, তার ঠোঁট—খুশিতে হেসে উঠেছিল…মনে নেই। কারণ শেষ চিত্রে তাকে যে রকম দেখা গেছে, তাতে আর চেহারা চেনার উপায় নেই। শুধু দুটো আঙুল, বাতাসের সঙ্গে বন্ধুতা করে ভাসিয়ে দিয়েছিল কাগজের উড়োজাহাজটিকে, আঙুল দুটো জেগে থাকে। তারপর বিকট শব্দ, তার পরই চিৎকার। সব ছাপিয়ে চিৎকারটাই শুধু শ্রুতিযন্ত্রে আছে…যেন প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ স্থিত হয়ে আসে—কেবল চিৎকারগুলোই দীর্ঘায়িত হয়। সেই চেনা কণ্ঠ, চেনা নামতা ঝরা কণ্ঠ, যে কণ্ঠরাণী শৈশবেই উড়োজাহাজ ওড়াতে শিখেছে, ক্লাসরুমে বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি করার কণ্ঠ, মায়ের কণ্ঠ ধরে আবদার আর বাবার কাছে বায়না ধরার কণ্ঠ, স্কুলে আসতে আসতে মাকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ করা কণ্ঠ, শিক্ষকের রোল কলে ইয়েস স্যার বলা বিনীত কণ্ঠ, সমবেত জাতীয় সংগীতে দৃপ্তকণ্ঠ—সে কণ্ঠের চিৎকার শুধু পিছু ছাড়ছে না।কাগজের উড়োজাহাজটি স্বপ্নের মতো ওড়ে। এ-ফোর সাইজের খাতার পাতা ভাঁজ করে বানানো। উড়ছে না বলে একটা ডানা ঈষৎ ভেঙে দিয়ে (হয়তো রাগ করে অথবা উড়োজাহাজটি বাতাস ধরতে পারছে না বলে) শূন্যে ছুড়ে দিয়ে আবার হাতের কাছেই ফিরে পেয়ে এবার সে দুমড়েমুচড়ে (রাগ করে নিশ্চয়) ভেঙে দেয় একটি ডানা একদম—তারপর ছুড়ে মারে। বাতাসের ধাক্কায় কিংবা বিস্ফোরণে সেই ভাঙা ডানার কাগজের উড়োজাহাজ পোড়া আকাশ পেরিয়ে, মেঘগুলো যখন বাষ্প হতে হতে শূন্যতায় লীন হয়ে যায় সেই দূরত্ব পেরিয়ে, চন্দ্র-সূর্য পেরিয়ে, আসমান পেরিয়ে—সাত আসমান…এতগুলো দূরত্ব অতিক্রম করেও কেন তাকে ধাবিত হতে হবে, আরো…আরো…হাবিয়ার চিৎকার বাড়ছে। কাগজের উড়োজাহাজটি আরো বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ক্লান্তির শেষ পর্যায়ে, যখন আর উড়তে পারে না, তখন কে যেন এসে তাকে আবার সেই দুই আঙুলে ধরে। আঙুল দুটোই বাস্তব, বাকি পুরো অবয়বটি দৃশ্যহীন অথচ অস্তিত্বমান। কাগজের উড়োজাহাজটি নিশ্চিন্তে উড়ছে আবার। এবার আর তাকে দুই আঙুলে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে না ফ্ল্যাটের এমাথা থেকে ওমাথায়, বিস্তৃত বারান্দায়, স্কুলের মাঠে, বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টুমি করে ক্লাসরুমে…এবার তাকে দুটো আঙুল, প্রিয় পরিচিত দুটো আঙুল, সেই একই চেনা ভঙিতে (যখন ওড়াত না, হাতে নিয়ে স্কুল মাঠে দৌড়াত ওড়ানোর মতো করে ছুটির পড়ে মা নিতে এসেছে দেখলে মায়ের দিকে) আলতো করে ধরে ছুটে যাচ্ছে তুমুল শূন্যতার ভেতর—তার গতির কাছে হার মেনে যাচ্ছে সমস্ত বিস্ফোরণ, এমনকি আকাশও যেখানে ধসে পড়ে…সেই পতন। মেয়েটি ফিসফিস করে বলে—কাগজের উড়োজাহাজ, ও কাগজের উড়োজাহাজ, আমাকে ফিরিয়ে নিতে পারো? কাগজের উড়োজাহাজ কথা বলে না। গতি পেয়ে উড়তে থাকে। মেয়েটি আবার বলে—আমি তো স্কুলেই ছিলাম, নাকি? আমার ছুটি হয়েছিল, আমি ক্লাসরুমে বসে তোমাকে বানালাম, ওড়ালাম, তুমি উড়লে না, আবার ওড়ালাম—এবারও উড়লে না, আমি তোমার ডানা ভেঙে দিয়েছি; তুমি কি রাগ করেছ? কাগজের উড়োজাহাজ কথা বলে না—আরো দ্রুত উড়তে থাকে শূন্যতা আর পূর্ণতাকে পলকেই হাজার জনম পেছনে ফেলে। উড়োজাহাজ, ও কাগজের উড়োজাহাজ, তুমি একা উড়ে গেলে…আমাকেও সঙ্গে নিলে না কেন…না না, শুধু আমাকে না—আমার সহপাঠীরাও তো প্রায় সবাই ক্লাসরুমেই ছিল, বের হওয়ার জন্য ব্যাগ গোছাচ্ছিল, কেউ বুটের ফিতা বাঁধছিল, কেউ কেউ ঘামে ভেজা চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে (তারা আমার বান্ধবীদের মধ্যে) পাথরবসানো হেয়ারব্যান্ডটা ঠিকঠাকমতো পরছিল, কেউ ব্যাগ থেকে আবার সন্দিহান হয়ে কলমের বাক্সটা বের করে তার সুন্দর ম্যাজিক কলমটা দেখে নিচ্ছিল—নিশ্চিত হতে চাইছিল সেটি বক্সে ভরা হয়েছে কি না, পাশের কক্ষে ক্লাস চলছিল—বেশ কয়েকটা কক্ষে তখনো শিক্ষকগণ পড়াচ্ছেন, বেশ কিছু শিক্ষার্থী বারান্দায় জটলা করে দাঁড়িয়ে ছিল দু-তিন জায়গায়—কিছু শিক্ষার্থী ক্লান্ত পায়চারি করছিল, মাঠে খেলছিল অনেকে…তুমি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উড়ে যেতে পারলে না, হে কাগজের উড়োজাহাজ? কাগজের উড়োজাহাজ কথা বলে না, সেই প্রিয় দুই আঙুল তাকে ওড়াতে থাকে অথচ অস্ফুট হাওয়ার দেহ আবারও আকুতি জানায়—উড়োজাহাজ, ও কাগজের উড়োজাহাজ, আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাবে?
সকল অবাস্তবতা অতিক্রম করে কাগজের উড়োজাহাজ একটা ছায়ার মতো বাস্তবতার স্তরে পৌঁছে। ক্রমে সে ছায়া আরো প্রকাশ্য হতে থাকে। একসময় সুন্দর একটা ল্যান্ডস্কেপ দেখা যায়। মেয়েটি এবার দৃশ্যমান, সুন্দর একটা নদীর পার ধরে সে দৌড়ে আসছে, যেখানে ফুল ও ফলের গাছগুলো সুবিন্যস্ত এবং আনত, প্রজাপতি রংবেরঙের—উড়ছে, পাখিরা গান গাইছে। অদূরেই নদীর ঢালে সারি সারি বৃক্ষশোভিত ঝরাপাতাহীন অথচ আলো-ঝলমলে অরণ্যে দোলনায় দোল খাচ্ছে তার বন্ধুরা।মেয়েটি একটি দোলনায় বসে। নদীবিধৌত দখিনা বাতাস তার পুড়ে যাওয়া শরীর জুড়িয়ে দেয়। তার দেহে পরির পোশাক—যেমন পোশাক সে জন্মদিনে পরত। নদীর জল স্বচ্ছ ও সুমিষ্ট এবং সুগন্ধময়, তার আর কোনো তৃষ্ণা থাকে না। তার বন্ধুরাও উছল, উজ্জ্বল আনন্দে। তবু একটা যেন হুতাশ, হাহাকার তাদের পিছু ছাড়ে না।সবগুলো শিশু দোলনা থেকে নেমে আসে। মেয়েটি তখনো তার কাগজের উড়োজাহাজটিকে ধরে রেখেছে দুই আঙুলে—উড্ডয়নের ভঙ্গিতে। বন্ধুরা বলে, আমাকে দাও, আমাকে দাও, আমার দিকে দাও। মেয়েটি কার দিকে ছুড়ে মারবে? সে চোখ বন্ধ করে তিন পাক ঘুরে (যেমন ঘুরত সে স্কুলমাঠে, ছুটির পর, আম্মু আসতে দেরি হলে বন্ধুদের সঙ্গে কাগজের উড়োজাহাজ দিয়ে খেলার সময়। এবং তখনো তার হাত ওপরেই ওঠানো থাকত। ছোট্ট দুটো আঙুলে ধরা থাকত উড়োজাহাজটি—আজও ওভাবেই ধরা) এবং ছুড়ে মারে দিকচিহ্নহীন। ছেলেরা মেয়েরা হৈহৈ করে ওঠে। আড়াল থেকে খোদাতাআলা হু হু করে কাঁদেন।বাচ্চারা খেলুক। আজ তাদের ছুটি হয়েছে। আর তাদের ইশকুলে যেতে হবে না।