সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ভাস্কর্যের মাধ্যমে টিকে থাকবেন হামিদুজ্জামান খান

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ২ আগস্ট, ২০২৫
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

আমি চারুকলায় ভর্তি হই ১৯৬৫ সালে। ওপরের ক্লাসের কাউকেই চিনি না। কে কোন বিভাগে পড়ে, কোন বর্ষে পড়ে জানি না। সিনিয়রদের দেখি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।প্রথম বর্ষে আমাদের ক্লাস টিচার রফিকুন নবী। তখন শুনেছি, অমুক ছেলে এ ধরনের ছবি আঁকে, অমুক ভালো ছবি আঁকে। হামিদুজ্জামান খানের কাজ নিয়েও প্রশংসা শুনেছি। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল না।প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় বর্ষ অনুমতি ছাড়া দোতলায় ওঠা নিষেধ ছিল। দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পর কিছু কিছু সিনিয়রের সঙ্গে পরিচয় হলো। তখন ফাইনাল ইয়ারে পড়তেন মনির ভাই (মনিরুল ইসলাম), নাসির বিশ্বাস—এঁরা। তার পরের ব্যাচ ফোর্থ ইয়ারে ছিলেনহামিদুজ্জামান খানরা।সেই সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। পরিচয় হওয়ার কারণ, তিনি নিজস্ব ঢংয়ে এক ধরনের প্রচুর ওয়াটার কালারের কাজ করতেন। এই কাজের জন্য হামিদুজ্জামান খানের আলাদা একটা সুনাম ছিল। প্রতি শুক্রবার আউটিংয়ে বের হতেন। নদীর পারে বা আরো একটু দূরে গিয়ে অনেক ছবি আঁকতেন।এভাবেই তাঁর সঙ্গে আমাদের মেলামেশা। তিনি খুব সাদাসিধা ও হাশিখুশি স্বভাবের ছিলেন। দ্বিতীয় বর্ষে আমাদের ক্লাস টিচার হলেন হাশেম খান। একদিন কী কারণে যেন আমি চারুকলার ছাত্রাবাসে গেলাম সাইকেল নিয়ে। গিয়ে দেখি, হামিদ ভাইও সাইকেল নিয়ে বের হচ্ছেন। বললাম, কোথায় যাচ্ছেন? বললেন, আর্ট কলেজে। আমি বললাম, চলেন যাই। ছাত্রাবাস থেকে দুজন দুই সাইকেল নিয়ে আর্ট কলেজের দিকে এগোচ্ছি। হামিদ ভাই তখন সাইকেল চালানো শিখছেন মাত্র। ভালো চালাতে পারছেন না। আমি বললাম, এইভাবে যাবেন কেমনে। বললেন, চলো চলো…।

তখন তো তেমন গাড়ি-ঘোড়া নাই। অনেকক্ষণ পর পর দু-একটা রিকশা দেখা যেত। শুধু রিকশা আর সাইকেল। আমরা নিউমার্কেট, নীলক্ষেত পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গেলাম। কলা ভবনের সামনের রাস্তায় একটা জায়গা খুঁড়ে ড্রেন বানাচ্ছিল। দুই দিকে মাটি ওঠানো, মাঝখানে একটু রাস্তা চলাচলের জন্য রেখেছে। আমি বললাম, হামিদ ভাই সাবধান, আপনি কিন্তু এমনিতেই ঠিকভাবে চালাতে পারছেন না। সেই জায়গাটায়ই মাটি ভরা একটা ট্রাক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর সামনে চলে এলো। আমি পেছনে। হামিদ খান সাইকেলটা ঘোরানোর চেষ্টা করছিলেন। তার আগেই ট্রাক এসে মেরে দিল। তিনি সাইকেল নিয়ে পড়ে গেলেন রাস্তার পাশে। লোকজনও তেমন নাই। আমার সাইকেল রেখে গিয়ে তাঁকে ওঠালাম। উঠিয়ে দেখি, মাথা থেকে রক্ত পড়ছে। মাথার এক দিকে চামড়া ফেটে গেছে। চামড়াটা উঠিয়ে দেখি, মাথার হাড় নাই। ভেতরে সাদা মগজের মতো দেখা যাচ্ছে। আমি চামড়াটা সেই জায়গার ওপর রেখে রুমাল দিয়ে আস্তে চেপে ধরলাম। এখন যাব কী করে, গাড়িটাড়ি তো কিছু নাই। একটা গাড়ি যাচ্ছিল, থামতে বললাম। থামল না। একটা রিকশা ডাকলাম। রিকশায় নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে গেলাম। ইমার্জেন্সিতে নেওয়ার পর ভর্তি করে যা যা করা দরকার শুরু করল। আমি চারুকলায় ফিরে এসে ক্লাসে যেতেই হাশেম খান বললেন, তোমার গায়ে রক্ত কেন? বললাম, স্যার, হামিদুজ্জামান খান ট্রাকের সঙ্গে অ্যাকসিডেন্ট করেছেন। ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করে রেখে এসেছি। স্যার ওপরে গিয়ে আবেদিন স্যারকে বললেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্যার তখন প্রিন্সিপাল। তারপর হামিদ খানের ইয়ারের, তার পরের কয়েক ইয়ারের ছাত্ররা রওনা দিলেন মেডিক্যালের দিকে। আবেদিন স্যারও শিক্ষকদের নিয়ে গেলেন সেখানে। ডাক্তার বললেন, এখনই কিছু বলা যায় না, একটু ধৈর্য ধরুন। পরে ডাক্তারের কাছে শুনেছি, তিনি খুব ক্রিটিক্যাল অবস্থায় ছিলেন। ভাগ্য ভালো, সেখান থেকে সারভাইভ করেছেন। মাথার হাড় ছিল না। সেটা পাওয়া যায়নি। কিন্তু চামড়াটা ছিল। সেটাই ওপরে দিয়ে অপারেশন করেছেন। ৪৮ ঘণ্টা পর বললেন, বিপদ কেটে গেছে। তবে তাঁকে সারা জীবন সাবধানে থাকতে হবে।ভালো হয়ে ফিরে আসার পর যখন দেখা হলো, বললাম, সেদিন কী ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল। বললেন, শাকুর, তুমি না থাকলে আমি মরেই যেতাম। সেই সময় রাস্তায় লোক চলাচল খুবই কম ছিল। পাস করার পর হামিদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তখনো মাথায় হাত দিলে ধুবধুব অনুভূত হতো। তিনি সব সময় মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে রাখতেন, যাতে কোনো কিছুতে আঘাত না লাগে। ঢাকা মেডিক্যালের প্রিন্সিপাল ও আবেদিন স্যার মিলে ইংল্যান্ডে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। তখন হামিদুজ্জামান খান পাস করেছেন। জাহাজে করে সেখানে গেলেন। সেখানে গিয়ে অপারেশন করালেন। সেখানে ডাক্তার প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুললেন। ভালো হয়ে শিল্পী রশীদ চৌধুরীর সহায়তায় ফ্রান্স-ইতালি দেখে এলেন। দেশে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেন। তিনি ছিলেন চারুকলার ডিগ্রি কোর্সের প্রথম ব্যাচের ছাত্র।বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথম যান হামিদ খান ও আবদুস সাত্তার। সাত্তার গেলেন শান্তিনিকেতনে, হামিদুজ্জামান খান গেলেন বরোদায়। পরে আমিও বরোদায় গেছি। বরোদায় যাওয়ার পরই হামিদুজ্জামান খানের ভাস্কর্যের জ্ঞানের পরিধিটা বেড়ে যায়। সেখানে তাঁর একজন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক ছিলেন, নাম রাঘব কানারিয়া। তাঁর তত্ত্বাবধানে আধুনিক ভাস্কর্যের ল্যাঙ্গুয়েজ তিনি আয়ত্ত করেন। বরোদায় প্রত্যেক টিচার ছবি আঁকেন এবং ছাত্রদের সেটা বোঝান। বরোদা এম এস ইউনিভার্সিটির সুনাম এই কারণে। শিক্ষকরা ছাত্রদের উৎসাহিত করেন ছবি আঁকার জন্য। নতুন কোনো ধারা বের করার জন্য তাঁরা সব সময় চেষ্টা করেন।আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের শিক্ষক হয়ে আসি ১৯৮০ সালে। হামিদুজ্জামান খান এবং আমি একই সঙ্গে অধ্যাপক হলাম। তিনি সব সময় হাসিখুশি ছিলেন। জটিল কোনো কিছুতে দেখিনি কখনো। কাজ নিয়ে আমাদের আলোচনা হতো। সব সময় পজিটিভ চিন্তা ছিল তাঁর।একটি শিল্প গ্রুপ ‘হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্ক’ গড়ে তুলেছে। সেখানে তিনি এক শর বেশি ভাস্কর্য বসালেন। তাঁর কাজ একটা ভালো জায়গায় ডিসপ্লে করতে পেরেছেন, সেটাই বড় বিষয়। সেই চিন্তা করে তিনি পার্ক কনসেপ্টে চলে গিয়েছিলেন। তিনি পৃথিবী ঘুরে অনেক ভাস্কর্য পার্ক দেখেছেন। এ জন্য বিষয়টা তাঁর মাথায় ঘুরেছে। তাঁর চোখটা খুলে গিয়েছিল। একটা ভালো কাজ করেছেন। এভাবেই তিনি টিকে থাকবেন। যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবেন। যে যখন এই পার্কে যাবে, তখন সবাই হামিদুজ্জামান খানকে মনে করবে—এটাই একজন শিল্পীর অনেক বড় পাওয়া।

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com