সম্রাট আওরঙ্গজেব
সম্রাট আওরঙ্গজেব ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ সম্রাট এবং সম্রাট শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র। তিনি ১৬৫৮ সালে পিতার পতনের পর মসনদে বসেন এবং ১৭০৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৪৯ বছর শাসন করেন, যা মুঘল শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজত্ব। তার পুরো নাম ছিল আবুল মুজাফফর মুইনউদ্দিন মুহাম্মদ ঔরঙ্গজেব আলমগীর। তিনি ছিলেন একাধারে একজন কঠোর ধর্মপরায়ণ শাসক এবং দক্ষ প্রশাসক। তার শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্য ভৌগোলিকভাবে সর্ববৃহৎ বিস্তারে পৌঁছায়, যদিও এর ভিত্তি তখন থেকে ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে।
আওরঙ্গজেরের শাসন ছিল কঠোর ইসলামি শাসনের প্রতিফলন। তিনি হিন্দু তীর্থযাত্রা ও জিজিয়া কর পুনরায় আরোপ করেন, যা বহু হিন্দু প্রজার মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। তিনি মন্দির ধ্বংস, বিশেষ করে কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির ও মথুরার কেশব দেব মন্দির ভাঙার জন্য সমালোচিত হন। যদিও তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত ছিল, তাঁর ধর্মীয় কঠোরতা ও সহনশীলতার অভাব সাম্রাজ্যের ঐক্যে ফাটল ধরায়।
ঔরঙ্গজেব দক্ষিণ ভারতের দিকে মনোযোগ দেন এবং বিঞ্জাপুর, গোলকোন্ডা সহ অনেক স্বাধীন রাজ্য দখল করেন। কিন্তু এই দক্ষিণ অভিযান সাম্রাজ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা বিদ্রোহ, রাজপুত বিদ্রোহ এবং শিখ ও জাঠদের বিদ্রোহ সাম্রাজ্যকে ক্রমেই দুর্বল করে তোলে।
১৭০৭ সালে সম্রাট ঔরঙ্গজেব মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের শুরু হয়। তার কঠোর ধর্মনীতি এবং যুদ্ধবাজ রাজনীতি মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। ইতিহাসে তিনি এক জটিল চরিত্র—কেউ তাকে আদর্শ মুসলিম শাসক বলে শ্রদ্ধা করে, আবার কেউ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতীক হিসেবে দেখে। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ঔরঙ্গজেব ছিলেন মুঘল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত সম্রাট।