শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়া
অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ শ্বাসনালি ও ফুসফুস পুড়ে যাওয়া। গরম বাতাস ও ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নেওয়ার ফলে শ্বাসনালি ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা শুরুতে বোঝা যায় না। বদ্ধ স্থানে আগুন লাগলে সেখানকার অক্সিজেন খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের আধিক্য দেখা দেয়।এ ছাড়া কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড ইত্যাদি বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়, যা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে জটিলতা সৃষ্টি করে, দেখা দেয় অ্যাকিউট রেস্পিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোম। পরবর্তীতে এসব রোগীর নিউমোনিয়াও দেখা দিতে পারে। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার কিছু লক্ষণ—বদ্ধ স্থানে আগুন লাগলে রোগীদের অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। তাদের শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা খুবই বেশি। মুখমণ্ডল, মাথার চুল, ভ্রু, নাকের লোম পুড়ে যাওয়া।চোখ ও মুখের চারপাশ, ঠোঁটসহ সমগ্র মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া। রোগীর শ্বাসকষ্ট হওয়া, নিঃশ্বাসের সঙ্গে শোঁ শোঁ শব্দ করা।গলার স্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া।কাশি অথবা থুতুর সঙ্গে কালো ময়লা যাওয়া, জিহ্বা কালো হয়ে যাওয়া।এসব লক্ষণ দেখা দিলে ধরে নেওয়া হয় রোগীর শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দেরি না করে দ্রুত বার্ন ইউনিট আছে এ রকম হাসপাতালে নিতে হয়।
কাপড়ে আগুন লাগলে আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করা যাবে না। এতে বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আগুন আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, শরীর পুড়বে আরো বেশি। আগুন নেভানোর জন্য মাটিতে শুয়ে পড়ে গড়াগড়ি করা যেতে পারে। আশপাশে অন্য কেউ থাকলে মোটা কাপড় বা চাদর দিয়ে ঢেকে জাপটে ধরলে দ্রুত আগুন নিভে যাবে। পুড়ে যাওয়া জামা শরীর থেকে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পুড়ে যাওয়া স্থানে ১৫-২০ মিনিট পানি ঢালতে হবে। পোড়া স্থানে বরফ, ফ্রিজের পানি, ডিমের সাদা অংশ, টুথপেস্ট বা চুন ইত্যাদি লাগানো যাবে না। বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে পানি ঢালার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি ঢালার কারণে ঠাণ্ডা না লেগে যায়। হাতের কাছে অ্যান্টিসেপটিক অয়েনমেন্ট থাকলে সেটি পুড়ে যাওয়া স্থানে লাগানো যেতে পারে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পুড়ে যাওয়ার পরিমাণ যত কমই হোক না কেন, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন—পোড়া স্থানে ফোসকা পড়া ভালো লক্ষণ। ফোসকা পড়া ত্বক দ্রুত সেরে ওঠে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।পেট্রল বা দাহ্যবস্তু শরীরে লেগে আগুন ধরলে বালু বা মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিলে আগুন নিভে যায়। কম্বল জড়িয়ে আগুন নেভানো বিপজ্জনক। কম্বলে আগুনের তাপ দেহের মধ্যে আটকে যায় এবং এতে ত্বকের দগ্ধতা বৃদ্ধি পায়, অনেক সময় জীবননাশের ঘটনাও ঘটে।
দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা
পোড়া রোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ বেশ দীর্ঘ। অনেক রোগীর চামড়া প্রতিস্থাপন বা স্কিন গ্রাফটের প্রয়োজন হতে পারে। ক্ষতস্থান কিছুটা সেরে না ওঠা পর্যন্ত তা করা সম্ভব নয়। স্কিন গ্রাফট করালে বেশির ভাগ সময় একাধিকবার অপারেশন করতে হয় । প্রতিস্থাপনের জন্য চামড়াদানকারী খুঁজে পাওয়া নিয়েও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। তবে এ জানুয়ারিতে চালু হওয়া স্কিন ব্যাংক এ ক্ষেত্রে রোগীদের আশার আলো হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া অনেকের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে ত্বক পুনর্গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়, সেটিও সময়সাপেক্ষ। অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে সেটিরও আলাদা চিকিৎসা প্রয়োজন। কিছু রোগীর হয়তো কৃত্রিম প্রত্যঙ্গ বা প্রস্থেটিকস প্রয়োজন হতে পারে। অগ্নিদগ্ধ রোগীদের প্রত্যেকেরই চাহিদা আলাদা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকদের বোর্ড কেমন চিকিৎসা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে দেবে। এ সময় রোগীদের মানসিক কাউন্সিলিংয়েরও প্রয়োজন হয়।
স্কিন ব্যাংক
রক্ত বা কর্নিয়ার মতো স্কিন গ্রাফটের জন্য দান করা চামড়াও সংরক্ষণ করা যায়। সে লক্ষ্যে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চালু হয়েছে ‘স্কিন ব্যাংক’। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের কারিগরি সহায়তায় এটি তৈরি করা হয়। যেসব রোগীর দেহে তৃতীয় মাত্রার পোড়া ক্ষত আছে, তাদের রক্তনালি থেকে অ্যালবুমেন এবং ইলেক্ট্রোলাইট অনবরত বেরিয়ে যায়। পাশাপাশি বাইরে থেকে দেহে প্রবেশ করে জীবাণু। দুটোই খুব দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এর চিকিৎসা হিসেবে স্কিন গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে ক্ষত ঢেকে দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্কিন ব্যাংকে মৃতদেহ বা প্লাস্টিক সার্জারি থেকে সংগৃহীত চামড়া সংরক্ষণ করা হয়। সুস্থ ব্যক্তিরা চাইলে চামড়া দান করতে পারেন। একজন সুস্থ মানুষ একাধিকবার চামড়া ডোনেট করায় কোনো বাধা নেই। গ্রাফট ডোনেট করার ১০-১৪ দিনের মধ্যেই আবার সেটি গজিয়ে যায়।
লেখক : বার্ন, রিকনস্ট্রাকটিভ ও
প্লাস্টিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল








