শান্তিনিকেতন হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের একটি পাড়া। পাড়াটি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তার পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে আরো বিকশিত করেছিলেন। এখানে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে তার অবস্থানের ফলে শান্তিনিকেতন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহরে পরিণত হয়।[১] ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে শান্তিনিকেতন। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর রবিবার সেই মর্মে ঘোষণা করে ইউনেস্কো তাদের ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের কমিটির ৪৫ তম অধিবেশনের সিদ্ধান্ত।[২]


১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে (১২৭০ বঙ্গাব্দে) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রায়পুরের জমিদার ভুবনমোহন সিংহের কাছ থেকে দুটি ছাতিম গাছসহ ২০ একর (৮১,০০০ বর্গমিটার) জমি বার্ষিক ₹ ৫ (ইউএস$ ০.০৬) ইজারায় কিনেছিলেন। তিনি একটি অতিথিশালা তৈরি করে নাম রেখেছিলেন “শান্তিনিকেতন” (শান্তির স্থান)। ক্রমশ সমগ্র এলাকাটি শান্তিনিকেতন হিসেবে পরিচিতি পায়।[৩]
বিনয় ঘোষের মতে উনিশ শতকের মাঝে বোলপুর একটি ছোট বসতি ছিল এবং শান্তিনিকেতনের বৃদ্ধির ফলে এটি প্রসারলাভ করেছিল। বোলপুরের কিছু অংশ রায়পুরের সিংহ পরিবারের জমিদারির অংশ ছিল। ভুবনমোহন সিংহ বোলপুরে একটি গ্রাম তৈরি করেছিলেন এবং তার নাম রাখলেন ভুবনডাঙ্গা। ভুবনডাঙ্গা কুখ্যাত ডাকাতদের ডেরা ছিল, যারা লোকদের মারার জন্য দ্বিতীয়বার ভাবতো না। এর ফলে লড়াই ও বিতর্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ডাকাতদের নেতা অবশেষে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল এবং এলাকার বিকাশের জন্য তারা তাঁকে সাহায্য করেছিল।সেখানে একটি ছাতিম গাছ ছিল যার তলায় দেবেন্দ্রনাথ তপস্যা করতেন। লন্ডনের হাইড পার্কের দ্য ক্রিস্টাল প্যালেসের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম উপাসনার জন্য এক ৬০ বাই ৩০ ফুট (১৮.৩ বাই ৯.১ মিটার) উপাসনা গৃহ তৈরি করেছিলেন। ছাদটি টালি করা এবং মেঝেটি সাদা মার্বেল পাথরের ছিল, কিন্তু বাকি ভবনটি কাচের ছিল। আদিকাল থেকেই এটি আশেপাশের লোকদের কাছে এক দর্শনীয় স্থান ছিল।[৪]
২৭ জানুয়ারি ১৮৭৮-এ (১৩ মাঘ ১২৮৪-এ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ১৭ বছর। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে (১২৯৫ বঙ্গাব্দে) দেবেন্দ্রনাথ একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে সমগ্র এলাকাটিকে একটি ব্রহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে (১৩০৮ বঙ্গাব্দে) রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম চালু করেছিলেন যা ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে (১৩৩২ বঙ্গাব্দে) পাঠ ভবন নামে পরিচিত।[৪][৫] ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।[৬] এটি ঠাকুর পরিবারের মাথায় নতুন পালক, যারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলার জীবন ও সমাজের বিভিন্ন দিককে সমৃদ্ধ করেছিলেন।[৭] কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ সাহিত্য, গান, চিত্রকলা ও নাটকে সমৃদ্ধ ছিল।[৮] ১৯২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর (১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৮ পৌষ) রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন এবং ১৯৫১ সালে এটি ভারতের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে।[৯]
শান্তিনিকেতন ২৩.৬৮° উত্তর ৮৭.৬৮° পূর্ব স্থানাঙ্কে অবস্থিত[১০] এবং এর গড় উচ্চতা ৫৬ মিটার (১৮৪ ফুট)। এলাকাটি অজয় নদ ও কোপাই নদী দ্বারা আবদ্ধ। শান্তিনিকেতনে একদা গভীর অরণ্য ছিল কিন্তু মাটি ক্ষয়ের ফলে কিছু এলাকা খটখটে বলে মনে হয়। এটি স্থানীয়ভাবে খোয়াই নামে পরিচিত। তবে উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে ভারতের বাকি জায়গা থেকে উদ্ভিদ শান্তিনিকেতনের কিছু অংশে বিকশিত হয়। চারিদিকের এলাকার পরিবেশ সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হলেও শান্তিনিকেতনের মূল অংশটি প্রকৃতির কাছাকাছি রয়েছে।[১১]
২০০৯ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী শান্তিনিকেতন বছরে ১২ লাখ পর্যটককে আকর্ষিত করে।[১২]
শান্তিনিকেতন ভবন আশ্রমের সবচেয়ে পুরনো বাড়ি। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৪ সালে এই বাড়িটি তৈরি করিয়েছিলেন। বাড়িটি দালান বাড়ি। প্রথমে একতলা বাড়ি ছিল। পরে দোতলা হয়। বাড়ির উপরিভাগে খোদাই করা আছে সত্যাত্ম প্রাণারামং মন আনন্দং মহর্ষির প্রিয় উপনিষদের এই উক্তিটি। তিনি নিজে বাড়ির একতলায় ধ্যানে বসতেন। তার অনুগামীরাও এখানে এসে থেকেছেন। কৈশোরে বাবার সঙ্গে হিমালয়ে যাওয়ার পথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে কিছুদিন বাস করেন। ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় স্থাপনের সময়ও রবীন্দ্রনাথ কিছুকাল সপরিবারে এই বাড়িতে বাস করেন। পরে আর কখনও তিনি এটিকে বসতবাড়ি হিসেবে ব্যবহার করেননি। এখন বাড়িটির সামনে রামকিঙ্কর বেইজ নির্মিত একটি বিমূর্ত ভাস্কর্য রয়েছে। শান্তিনিকেতন ভবনের অদূরে একটি টিলার আকারের মাটির ঢিবি আছে। মহর্ষি এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতেন। একসময় এই টিলার নিচে একটি পুকুরও ছিল।
উপাসনা গৃহ বা ব্রাহ্ম মন্দির। ১৮৯২ সালে এই মন্দিরের উদ্বোধন হয়। এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন থেকেই ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসাবে প্রতি বুধবার সকালে উপাসনা হয়। মন্দির গৃহটি রঙিন কাচ দিয়ে নান্দনিক নকশায় নির্মিত। আর তাই স্থানীয় লোকজনের কাছে এটা কাচের মন্দির নামেও পরিচিত।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন রায়পুরের জমিদারবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছিলেন তখন এই ছাতিম তলায় কিছুক্ষণএর জন্য বিশ্রাম করেন এবং এখানে তিনি তাঁর “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি” পেয়েছিলেন। তখন রায়পুরের জমিদারের কাছ থেকে ষোলো আনার বিনিময়ে ২০ বিঘা জমি পাট্টা নেন। বর্তমানে ৭ পৌষ সকাল ৭.৩০ ঘটিকায় এখানে উপাসনা হয়। কিন্তু সেকালের সেই ছাতিম গাছ দুটি মরে গেছে। তারপর ঐ জায়গায় দুটি ছাতিম গাছ রোপণ করা হয়। সেই ছাতিম তলা বর্তমানে ঘেরা আছে সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। দক্ষিণ দিকের গেটে “তিনি আমার প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি” এই কথাটি লেখা আছে।
“তালধ্বজ” শান্তিনিকেতন, বোলপুর, বীরভূম।
অনন্য সুন্দর গোলাকৃতির এই মাটির বাড়িটি শান্তিনিকেতন আশ্রমের সৌন্দর্যকে এক অন্য মাত্রা প্রদান করেছে। একটি তালগাছকে কেন্দ্র করে অপূর্ব পরিকল্পনায় এই বাড়িটি নির্মিত। তালগাছের পাতাগুলি ‘ধ্বজা’র মত করে বাড়িটির উপরে শোভিত বলেই এর নাম “তালধ্বজ”। তেজেশচন্দ্র সেন নামক এক বৃক্ষপ্রেমী এটির নির্মাতা।
‘দেহলী’ আম্রকুঞ্জের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত। বর্তমানে তা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর স্মরণে (মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা) নামকরণ করা হয়েছে। এটি শিশুদের পাঠশালা হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
দেহলীর পাশেই যে খড়ের চালের বাড়ি রয়েছে তাকেই নতুন বাড়ি বলা হয়।

মহারাজা মহতাব চাঁদ তার মালি রামদাস কে পাঠিয়ে এই বাগানের পত্তন ঘটান। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে এখানেই সংবর্ধিত করা হয়। তার বহু জন্মোৎসব এখানেই পালিত হয়েছে। পাঠভবনে নিয়মিত ক্লাস হয়। এখানে বিশ্বভারতীর সমাবর্তনের অনুষ্ঠানও একসময় নিয়মিতভাবে হত। বসন্ত উৎসব এখানেই অনুষ্ঠিত হয়।