বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদ আয়োজিত ১৮তম এ উৎসবে যখন সুরের ধারা ছড়িয়ে পড়ে, তখন একই সময় বর্ষার গান, কবিতা ও নৃত্যের সঙ্গে ‘দেখ, পান্থকুঞ্জ জেগে আছে, হত্যা হলে একটি বৃক্ষ লড়াই হবে তোমার সাথে’ স্লোগানে সরব ছিলেন আরেকদল শিল্পী। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে বর্ষা বন্দনা করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় আয়োজিত বর্ষা উৎসবের কথন পর্বে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শিল্পী কাজী মিজানুর রহমান। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. নিগার চৌধুরী। অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল একক ও দলীয় কণ্ঠে বর্ষার গান, নাচ ও আবৃত্তি।
উৎসবে বর্ষা নিয়ে বলা হয়, ষড়ঋতুর দেশ বাংলার জীবনধারা পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত, সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ঋতুর চরিত্র। গ্রীষ্ম হয়ে উঠছে খরতর, বর্ষা অনেক রুষ্ট এলোমেলো, শীত একাধারে নরম ও চরম, বসন্ত ক্ষীয়মাণ। প্রকৃতির ওপর মানুষের সীমাহীন অনাচার জন্ম দিয়েছে বিশ্বজনীন সংকটের। ভূপৃষ্ঠ হয়েছে তপ্ততর, সমুদ্রজল স্ফীত, ওজোন বলয় ক্ষতিগ্রস্ত। আধুনিক জীবনযাত্রা গড়ে তুলছে অপচয়ের পাহাড়, মাটি খুঁড়ে প্রকৃতির সম্পদ আহরণে সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার ভারে পিষ্ট ও বিপন্ন আজকের পৃথিবী। সভ্যতার দম্ভ ও প্রকৃতির ঔদার্যের মধ্যে বৈরিতা মানব অস্তিত্বের জন্য তৈরি করছে হুমকি। প্রকৃতি আজ মানবের কাছে দাবি করছে সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতা, জীবনযাপন ও প্রকৃতির মধ্যে সমঝোতা। ঘোষণাপত্রে সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট বলেন, ‘বর্ষার মিলনপিয়াসী মানস আমাদের সচকিত করে মানবসমাজে সৃষ্ট ঘৃণা বিদ্বেষ সংঘাত রোধে, প্যালেস্টাইনে, দেশে দেশে, স্বদেশে। বর্ষার জলধারায় সিক্ত হোক সবার জীবন, হোক আনন্দময় ও কল্যাণব্রতী।’
এ আয়োজনে একক কণ্ঠে ছিল চারটি করে রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত। শিল্পী ইয়াসমিন মুশতারী পরিবেশন করেন নজরুলের ‘রিম্ ঝিম্ ঘন ঘন রে বরষে’ গানটি। সালাউদ্দিন আহমেদ গেয়ে শোনান ‘বরষা ঐ এলো বরষা’। বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী ‘শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এলো না’, নবনীতা জাইদ চৌধুরী ‘শ্যামা-তন্বী আমি মেঘ-বরণা’ গান দুটি পরিবেশন করেন। অন্যদিকে শিল্পী অনিমা রায় পরিবেশন করেন রবীন্দ্রনাথের ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান’, শামা রহমান পরিবেশন করেন ‘মেঘের’ পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে’, শিল্পী মকবুল হোসেন ও ফেরদৌসী কাকলি একক কণ্ঠে যথাক্রমে ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে’ ও ‘গহন রাতে শ্রাবণধারা পড়িছে ঝরে’ গান দুটি পরিবেশন করেন।
বিমান চন্দ্র বিশ্বাস ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে’ লোকসংগীত গেয়ে শোনান। শ্রাবণী গুহ রায় বিখ্যাত ‘কে যাস রে ভাটির গাঙ বাইয়া’ গানটি করেন। ছিল সুরবিহার, বহ্নিশিখা, সুর নন্দন, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর দলীয় সংগীত পরিবেশন। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে তামান্না রহমানের পরিচালনায় নৃত্যম, ওয়ার্দা রিহ্যাবের পরিচালনায় ধৃতি নর্তনালয়। নৃত্যাক্ষ, স্পন্দন, বেনুকা ললিতকলা কেন্দ্র, মিনথিয়া একাডেমি অব আর্টসের ছিল নৃত্য আয়োজন।
নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি আবৃত্তি করেন জয় গোস্বামীর মেঘ বালিকার জন্য রূপকথা। আহসান উল্লাহ তমাল আবৃত্তি করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী। আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্যের কোলাজ পরিবেশন করে শিল্পবৃত্তের শিশু-কিশোর দল।