মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি স্থাপত্য
মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি ১৮ শতকে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৮ শতকের শেষ দিকে ভূমিকম্পে বাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে লন্ডন এবং ভারত থেকে সুদক্ষ কারিগর এনে জমিদার বাড়িটিকে ভূমিকম্প সহিষ্ণু করে পুনঃনির্মাণ করা হয়। বাড়িটি ময়মনসিংহ থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে, টাঙ্গাইল ও জামালপুর মহাসড়কের সংযোগস্থল থেকে ১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত।
এ সময়, মুক্তাগাছা জমিদার ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কর্তৃক প্রথমে রাজা এবং পরে মহারাজা উপাধি পাওয়া ব্যক্তি। জমিদারি শাসন করতেন ১৬ জন আলাদা জমিদার। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর জমিদার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ভারতে চলে যায় এবং জমিদার বাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে রাজবাড়ির ভেতরে জমিদারের মায়ের ঘর, অতিথি ঘর ও সিন্দুক ঘর রয়েছে। সিন্দুক ঘরে জমিদারের সোনা-দানা, টাকা-পয়সা এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র রাখা হতো। দর্শনার্থীরা এখন সিন্দুকের ভগ্নাবশেষ দেখতে আসেন। জমিদার তার স্ত্রীর সাথে দ্বিতীয় তলার বাংলোতে থাকতেন।
জমিদার আচার্য চৌধুরী জ্ঞান চর্চা করতে পছন্দ করতেন। তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ‘জিতেন্দ্র কিশোর গ্রন্থাগার’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল, যা তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি ছিল। এখানে প্রায় ১০,০০০ বই ছিল, যার মধ্যে তালপাতায় লেখা পুঁথি এবং অন্যান্য দুর্লভ বই ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বেশিরভাগ বই নষ্ট হয়ে গেলেও, কিছু বই ‘মুক্তাগাছা সংগ্রহ’ নামে বাংলা একাডেমিতে স্থানান্তরিত হয়।
মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি স্থাপত্য ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। এই জমিদার বাড়িটি লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ইংরেজদের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ইংরেজদের মুগ্ধতা অর্জন করে জমিদাররা রাজা ও মহারাজা উপাধিতে ভূষিত হন, যেমন রাজা জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরী, মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী, এবং মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। এই সময় জমিদার বাড়ি বিশেষ ব্যক্তিদের পদচারণায় মুখরিত ছিল এবং অনেক সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা হয়।
রাজা জগৎ কিশোর আচার্য চৌধুরী ছিলেন একজন বিদ্যানুরাগী এবং ময়মনসিংহে মায়ের নামে বিদ্যাময়ী স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তার অধীনে মুক্তাগাছা রাজবাড়ি অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থাপনা নির্মাণে অবদান রাখে। মুক্তাগাছার রাজারা ময়মনসিংহ টাউন হল, ময়মনসিংহ রেলওয়ে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল শশীলজ, আলেকজান্দার ক্যাসেল, এবং জামালপুরের শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী কলেজের মতো বহু প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তবে, মুক্তাগাছা রাজবাড়ির মূল্যবান অনেক সম্পদ চুরি হয়ে গেছে, তবে কিছু আসবাবপত্র এখনো ময়মনসিংহ জাদুঘর এবং ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
জমিদারের ছোট ছেলে কুমার ভূপেন্দ্র কিশোর নাটকপ্রেমী ছিলেন। তার নামে রাজবাড়িতে ‘ভূপেন্দ্র রঙ্গ পীঠ’ নামে একটি ঐতিহাসিক মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল, যা তখনকার সময়ে কলকাতার বাহিরে প্রথম ঘূর্ণায়মান মঞ্চ ছিল। বর্তমানে মঞ্চটির কোনো অস্তিত্ব নেই।
মুক্তাগাছা রাজবাড়ির অন্যতম বিশেষ স্থাপনা ছিল একমাত্র ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চ। এটি ১৮৫৫ সালে রাজা জগৎ কিশোর আচার্য চৌধুরীর ছোট ছেলে ভূপেন্দ্র কিশোর আচার্য চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতবর্ষে ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চের উদ্ভাবক ছিলেন শ্রী সতু সেন। এটি প্রতিষ্ঠা করতে খরচ হয়েছিলো ৩০ হাজার টাকা, যার মধ্যে ৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক ছিল। এই মঞ্চে বহু নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। তবে স্বাধীনতার পর এটি ময়মনসিংহ টাউন হল নিয়ে যাওয়ার পর আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
রাজবাড়ির ভেতর আরও অনেক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা রয়েছে। যেমন, মহিলাদের জন্য তৈরি বালাখানা, যেখানে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটি আরামদায়ক ঘর ছিল। এই ঘরটির ছাদে উঠতে একটি সিঁড়ি ছিল, তবে এখন তা নেই। এছাড়া, রাজবাড়ির বিভিন্ন জায়গায় ইংল্যান্ডের তৈরি লাহোর ভীম রয়েছে, যা ঐতিহাসিক মূল্য বহন করে।
১৮৭৫ সালে মুক্তাগাছা পৌরসভা এবং ১৮৮৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠা হয়, যা রাজবাড়ির পৃষ্ঠপোষকতায় সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া, রাজবাড়ির পশ্চিম পাশে অবস্থিত ফ্লোরোসিমেন্টর ঘরটি ছিল অত্যন্ত বিশেষ, যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ ছিল। এই ঘরের ছাদ এখন ভেঙে গেছে, তবে এখনও গরমে এটি শীতল অনুভূতি দেয়।
মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির স্থাপত্য আজও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বজায় রেখেছে, যা ময়মনসিংহের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিত।
জমিদার বাড়ির শেষের দিকে একটি ছোট পুকুর ছিল, যা এখন প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। বাড়ির সীমানা প্রাচীরের কাছে বিশালাকার একটি সিংহ দরজা রয়েছে। জমিদার বাড়ির কিছু অংশ এখন বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেমন শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প, সাব রেজিস্ট্রি অফিস, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, নবারুণ বিদ্যাইনিকেতন ইত্যাদি।
রাজবাড়িতে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যেমন বিষ্ণু সাগর পুকুর, যুগল মন্দির, চাঁন খাঁর মসজিদ, বিবির ঘর, ঘূর্ণায়মান নাট্য মঞ্চ, সাত ঘাটের পুকুর, জলটং, রসুলপুর বন ইত্যাদি।
আজও ৩০০ বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়ি ভগ্নপ্রায় হলেও, পর্যটকদের আনাগোনায় এটি এখনো জমজমাট থাকে।