মহাকাব্যের গল্প, তারকাবহুল আয়োজন আর হাজার কোটি রুপির বিশাল নির্মাণ ব্যয়–সব মিলিয়ে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি ‘রামায়ণ পার্ট ওয়ান’। পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির এ সিনেমাকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহের পারদ চড়ছে প্রতিদিন। বিশেষ করে সিনেমাটির টিজার ও ট্রেলার প্রকাশের পর সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে রামের চরিত্রে রণবীর কাপুরের উপস্থিতি নিয়ে চলছে আলোচনা। অন্যদিকে রাবণের চরিত্রে যশের অভিনয়ও তৈরি করেছে বাড়তি কৌতূহল। শুধু ভারতীয় বাজার নয়, আন্তর্জাতিক বক্স অফিসেও মুক্তির আগেই সাড়া ফেলতে শুরু করেছে সিনেমাটি।
তবে ‘রামায়ণ পার্ট ওয়ান’ নিয়ে আগ্রহের কেন্দ্রে শুধু বক্স অফিসের
হিসাব নেই। রয়েছে রণবীর কাপুরের অভিনয়জীবনের একটি বড় পরিবর্তনের গল্পও। ‘অ্যানিম্যাল’ সিনেমায় উগ্র, হিংস্র ও জটিল এক পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের চমকে দিয়েছিলেন তিনি। সেই চরিত্রের বিপরীতে এবার তাঁকে দেখা যাবে রাম হিসেবে। চরিত্রের এ বৈপরীত্যই তৈরি করেছে বাড়তি আগ্রহ। জানা গেছে, রামের চরিত্রের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন অভিনেতা। শরীরচর্চা, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে এনেছেন পরিবর্তন। মাংস খাওয়া ও বিভিন্ন নেশা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি চরিত্রটির উপযোগী শারীরিক গঠন তৈরিতেও সময় দিয়েছেন তিনি। পর্দার বাইরের জীবনেও শৃঙ্খলা এনেছেন এ অভিনেতা। সিনেমাটিতে সীতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাই পল্লবী। লক্ষ্মণের ভূমিকায় রবি দুবে এবং হনুমানের চরিত্রে সানি দেওলকে দেখা যাবে।
অন্যদিকে রাবণের চরিত্রে যশের উপস্থিতি ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ। ‘কেজিএফ’ দিয়ে যিনি অ্যাকশন তারকা হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁকে এবার দেখা যাবে পৌরাণিক এক প্রতাপশালী চরিত্রে। ফলে রণবীর ও যশের পর্দার উপস্থিতি নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবে বেশি। প্রকাশ হওয়া ট্রেলারের শুরুতেই রাবণের শক্তি ও প্রতাপের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। বিশাল প্রাসাদের দরজা ভেঙে প্রবেশ করে তাঁর ‘রাবণরাজ’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা গল্পে নিয়ে আসে অশুভ শক্তির আবহ। বিপরীতে অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে বিষ্ণুর অবতার রামের। এরপর রামের শৈশব, কৈশোর, অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, কৈকেয়ীর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় দশরথের সিদ্ধান্ত এবং রামের ১৪ বছরের বনবাসের নানা মুহূর্ত উঠে এসেছে টিজারে। সীতার সঙ্গে তাঁর যাত্রার ঝলকও দেখা গেছে। নির্মাণের ব্যাপ্তিতেও বড় আয়োজন রেখেছেন নির্মাতারা। প্রায় চার হাজার কোটি রুপি বাজেটের এ দুই পর্বের সিনেমাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অযোধ্যা থেকে লঙ্কা। মহাকাব্যের পরিচিত জগৎকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিশাল সেট, উন্নত ভিজ্যুয়াল এফেক্টস ও আন্তর্জাতিক মানের প্রোডাকশন ডিজাইনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অ্যাকশন দৃশ্যের পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছেন আন্তর্জাতিক স্টান্ট বিশেষজ্ঞ টেরি নোটারি ও গাই নরিস। সংগীতের দায়িত্বে রয়েছেন অস্কারজয়ী এ আর রহমান ও হ্যান্স জিমার। দুই সুরকারের যৌথ কাজও সিনেমাটির অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ।
এরই মধ্যে সিনেমাটি আন্তর্জাতিক বাজারে দারুণ সাড়া ফেলেছে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় সিনেমাটির প্রি-সেলস থেকে আয় ইতোমধ্যে ২৮ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে; বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকেই এসেছে প্রায় ২০ লাখ ডলার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বড় বাজারে এখনও অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ছবিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বিশ্লেষকরা। তাদের ধারণা, মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই বিশ্বব্যাপী দুই থেকে আড়াই কোটি ডলার কিংবা তার বেশি আয় করতে পারে ছবিটি।
ভারতীয় সিনেমায় রামায়ণের উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। ১৯১৭ সালে দাদাসাহেব ফালকের ‘লঙ্কা দহন’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে ফিরে এসেছে এই মহাকাব্য। ১৯৪৩ সালের ‘রাম রাজ্য’, ১৯৫৮ সালের ‘সম্পূর্ণ রামায়ণ’, ১৯৮৭ সালে রামানন্দ সাগরের জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ এবং ১৯৯৩ সালের অ্যানিমেশন ছবি ‘রামায়ণ: দ্য লিজেন্ড অব প্রিন্স রাম’। প্রতিটি নির্মাণই সেই সময়ের দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। ফলে নতুন করে রামায়ণ নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাতাদের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিচিত গল্পকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়, সেটিই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’ সেই চ্যালেঞ্জ কতটা সামলাতে পারে, তা জানা যাবে সিনেমা মুক্তির পর। আপাতত টিজার আর ট্রেলারের দৃশ্যায়ন, তারকাদের উপস্থিতি, রণবীরের নতুন অবতার এবং আন্তর্জাতিক অগ্রিম টিকিট বিক্রির সাফল্য ছবিটিকে ঘিরে প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। দুই পর্বে নির্মিত এ মহাকাব্যিক আয়োজনের প্রথম পর্বের পর দ্বিতীয় অংশ মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৭ সালের দীপাবলিতে। মহর্ষি বাল্মীকি কর্তৃক সংস্কৃত ভাষায় রামায়ণ রচিত হয় খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে। এখন দেখা যাক, এই মহাকাব্যকে নতুন সময়ের সিনেমার ভাষায় কতটা সফলভাবে তুলে ধরতে পারেন নির্মাতারা।