সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

টিলা কাটায় বিবর্ণ সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে
> সারা দেশ
> সিলেট

টিলা কাটায় বিবর্ণ সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

কেটে ফেলা হয়েছে সিলেটের শাহ আরেফিন টিলা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আমার দেশ

Newspapers

উঁচু-নিচু অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন টিলা, পাহাড় ও সমতল ভূমির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সিলেটের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি। অবৈধভাবে টিলা কাটা, পাথর লুট ও আবাসন এলাকা গড়ে তুলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত পর্যটকদের আকর্ষণীয় সিলেটকে বিবর্ণ করে ফেলা হয়েছে।

সবুজে ঢাকা এসব টিলা শুধু সিলেটের সৌন্দর্যের অংশ নয়, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন নির্মাণ, স্থাপনা তৈরি ও বিভিন্ন কাজে টিলা কাটার কারণে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এই ভূপ্রকৃতি।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে সিলেটের ছয় উপজেলা ও মহানগর এলাকায় টিলা ছিল ১০২৫টি। বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫৬৫টি। অর্থাৎ দেড় দশকে হারিয়ে গেছে ৪৬০টি টিলা। সংখ্যার হিসাবে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিলা আর নেই। উন্নয়নের নামে এভাবে নির্বিচারে টিলা কাটা চলতে থাকলে এক সময় হারিয়ে যাবে সিলেটের চিরচেনা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।

GeographicReference

নগরীর বালুচর, মেজরটিলা, আখালিয়া, হালদারপাড়া, খাদিমনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় চোখে পড়ত ছোট-বড় অসংখ্য টিলা। টিলার গায়ে ছিল গাছপালা ও সবুজের আবরণ। কোথাও ছিল বসতি, কোথাও ছিল ফাঁকা জায়গা কিংবা প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। সময়ের সঙ্গে এসব এলাকার অনেক টিলা কেটে সমতল করা হয়েছে। সেখানে গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা, বাড়ি-ঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা।

পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির পাশাপাশি সরকারি ও খাস জমির টিলাও বিভিন্নভাবে কাটা হচ্ছে। কোথাও পুরো টিলা কেটে ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও টিলার একাংশ কেটে সমতল করে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে।

জানা যায়, সিলেট নগরী সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে জমির চাহিদাও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে টিলাগুলোর ওপর। বিভিন্ন এলাকায় টিলা কেটে প্লট তৈরি, বসতবাড়ি নির্মাণ এবং অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে নগর ও আশপাশের এলাকায় আবাসন প্রকল্পের কারণে টিলা কেটে সমতল করার বিষয়টি উঠে আসে। পরিবেশকর্মীরা তখনো অভিযোগ করেছিলেন, নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে টিলা কাটার প্রবণতা বেড়েছে।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে শুধু পরিবেশ অধিদপ্তর বা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। টিলা কাটা বন্ধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণে আইন ও আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে টিলা রক্ষায় তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বেলার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টিলা সংরক্ষণে আদালতের নির্দেশনা থাকলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে টিলা কাটার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

পরিবেশকর্মীদের দাবি, টিলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে সেগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ ও মামলাভুক্ত টিলায় সাইনবোর্ড স্থাপন, নিয়মিত নজরদারি এবং অবৈধভাবে টিলা কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি রয়েছে।

বেলার সিলেট সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১ মার্চ হাইকোর্ট টিলা কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং টিলা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে টিলার জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়। তার অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে টিলা কাটা বন্ধ করা যায়নি।

তিনি বলেন, এখন সিলেটে যেসব টিলা টিকে আছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা প্রয়োজন। মামলাভুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ টিলাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে সাইনবোর্ড দেওয়া দরকার। পাশাপাশি যেসব টিলা কাটা হয়েছে, সেসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

টিলা কাটায় বাড়ছে ধসের ঝুঁকি

টিলা কাটার আরেকটি বড় প্রভাব হচ্ছে ভূমিধসের ঝুঁকি। টিলার পাদদেশে বসতি গড়ে উঠলে বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও মাটির ক্ষয়ের কারণে ধসের আশঙ্কা বাড়ে। সিলেটে অতীতে টিলাধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। বেলা জানায়, ২০১২-২০২১ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে সিলেটে টিলা ধসে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিবেশ কর্মীদের মতে, টিলা কেটে দুর্বল করে ফেলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন—দুই কারণেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

কোথায় কত টিলা ছিল

প্রশাসনের বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদনে সিলেট মহানগর ও সদর এলাকায় ১৯৯টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪টি, কোম্পানীগঞ্জে একটি, বিয়ানীবাজারে ২৭০টি, গোলাপগঞ্জে ৪১৩টি এবং জৈন্তাপুরে ৯৮টি টিলার তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া কানাইঘাট ও ফেঞ্চুগঞ্জে টিলাভূমির পরিমাণও উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিণ সুরমায় বেশ কয়েকটি টিলা থাকার কথা বলা হলেও কিছু প্রশাসনিক প্রতিবেদনে সেগুলোর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এরকম অভিযোগ পেলেই অভিযান চালিয়ে জেল জরিমানা করা হচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে প্রাকৃতিক দৃশ্য

প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা টিলাগুলো সিলেটের ভূপ্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একের পর এক টিলা হারিয়ে যাওয়ায় শুধু ভূমির আকৃতিই বদলাচ্ছে না, বদলে যাচ্ছে সিলেটের দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্যও।

প্রকৃতির এই সম্পদ একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাই অবশিষ্ট টিলাগুলো সংরক্ষণ, অবৈধভাবে টিলা কাটা বন্ধ এবং আইন ও আদালতের নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এখন সিলেটের পরিবেশ রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com