চাঁদপুরের মাসুদ রানা নকিব তাঁর পুরো জীবনটাই উৎসর্গ করেছেন সালমানের নামে। এমনকি সব ইস্যুতে সালমানের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন তিনি। সালমানের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন বলে তাঁর কাছে কিছু নেই, ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই তাঁর কাছে শোকের। নকিবের মতো না হলেও সালমানের পাগল ভক্ত আছেন আরো—খুলনার জুনিয়র সালমান, চিটাগংয়ের কায়েস আরজু, নাহিদ ইমন, রাজশাহীর মিরন, ঢাকার সজীব মোহাম্মদ, শান্টু খান, আফসানা খান, এইচ পাভেল, ফরহাদ জামানসহ অনেকের নামই নেওয়া যায়। এই ভক্তদের বেশির ভাগই বিশ্বাস করেন, সালমান মরেননি। ৬ সেপ্টেম্বর এলে এঁরা নিজেদের গুটিয়ে নেন। যাঁরা বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁদের দাবি, সালমান আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে খুন করা হয়েছে। তাঁরা খুনের বিচার চান।

৪ বছরে এমন কী করেছেন
১৯৯৩—৯৬, চলচ্চিত্রে মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ার সালমানের। এত অল্পদিনে ভক্তদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন পাওয়া সত্যিই বিরল ঘটনা। যদিও সালমানের প্রতিযোগী নায়ক-পরিচালক-প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অনেকেই মনে করেন, অকালপ্রয়াণের কারণেই হয়তো মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে। তবে পরিসংখ্যান বলে ভিন্ন কথা। মৃত্যুর বহুদিন পরও জোড়াতালি দিয়ে মুক্তি পেয়েছে তাঁর অভিনীত অসমাপ্ত ছবি। এমনও ছবি মুক্তি পেয়েছে, যেখানে সালমানের উপস্থিতি বড়জোর ২০ মিনিট! গল্প বদলে, ডামি ব্যবহার করে কোনো রকমে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেই ছবিও হিট! সব মিলিয়ে ২৭টি ছবি করেছেন, ২০টিই ব্যবসাসফল। বাকি যে ছবিগুলো চলেনি, মৃত্যুর পর টিভি রাইটস থেকে পাওয়া অর্থের কল্যাণে সেগুলোও পর্যাপ্ত ব্যবসা দিয়েছে প্রযোজকদের। সালমান অভিনীত ১০টি ছবি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রিমেক হয়েছে, যেগুলোতে সালমানের চরিত্রে ছিলেন প্রসেনজিৎ, অভিষেকরা। এখনো টিভি চ্যানেল খুললেই পাওয়া যায় সালমানকে। ঈদের বিশেষ আয়োজনে নতুন ছবির ভিড়েও থাকে সালমান অভিনীত ছবি। পর্দায় তাঁর কণ্ঠ মেলানো গান নিয়ে বিশেষ সংগীতায়োজন করে চ্যানেলগুলো। এমনকি নতুন ছবি মুক্তি না পেলে মফস্বলের সিনেমা হলে দর্শক ফেরানোর বড় টোটকা এখনো সালমান অভিনীত ছবি। ইউটিউবে ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের ইউটিউবাররা এখন সালমান অভিনীত ছবির গান-দৃশ্য নিয়ে করেন ‘রি-অ্যাকশন ভিডিও’। এটা যে ‘দুই পয়সা আয়ের পন্থা’, সেটা জেনেও দর্শক সেগুলো দেখে।
সালমানের প্রতিযোগী বনাম শুভাকাঙ্ক্ষী
জীবদ্দশায় সালমান বহু শত্রু বানিয়েছেন চলচ্চিত্রে। তাঁরা এবং তাঁর প্রতিযোগীরা সুযোগ পেলেই বলেন, সালমান মৃত্যুর পর জনপ্রিয় হয়েছেন। তাঁদের এসব কথা শুনে সলমানভক্তদের পিত্তি জ্বলে যায়। সালমানের জীবদ্দশায় শহরের মোড়ে মোড়ে যত স্টেশনারি দোকান বা লাইব্রেরি ছিল, এমনকি বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন—সবখানেই টানানো থাকত সালমানের পোস্টার-ভিউ কার্ড। সেই প্রজন্মের দর্শক জানে, ভারতের শাহরুখ খান-সালমান খানদের ভিড়ে বাংলাদেশের একমাত্র সালমান শাহর ছবি এবং তাঁর অভিনীত ছবির দৃশ্যের বড় পোস্টার পাওয়া যেত সেখানে। শুধু সালমানের পোস্টার, ছবি ও ভিউ কার্ড বিক্রি করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল আজাদ প্রোডাক্টস। এক সাক্ষাৎকারে আজাদ প্রোডাক্টসের কর্ণধার নিজের মুখেই জানিয়েছিলেন সেই কথা। সালমান তাঁর সময়ের সর্বাধিক পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতা। এমনকি তিনিই প্রথম পুরো পারিশ্রমিক নিয়ে ছবি হাতে নেওয়ার রেওয়াজ চালু করেছিলেন। এককালীন পুরো পারিশ্রমিক দিয়ে সালমানকে নিজেদের ছবিতে নিতে পারেননি অনেকেই। ৩০ বছর আগে এমন দাপট আর কারোই ছিল না। এই সবই জানেন তাঁর প্রতিযোগীরা, তবু মৃত সহকর্মীর নামে বলা যায়, কারণ পাল্টা বলার জন্য তিনি নেই। তবে সালমানের পক্ষে বলার মতোও আছেন অনেকে। নায়করাজ রাজ্জাক নিজের পর সালমানকেই রেখেছেন। শাকিব খান, রিয়াজ, ফেরদৌসরা সালমানের দেখানো পথেই এসেছেন চলচ্চিত্রে। সালমানের প্রভাবের কথা তাঁরা নির্দ্বিধায় বলেন, কারণ তাঁরা কেউই সালমানের প্রতিযোগী নন। সম্প্রতি এক ইউটিউব সাক্ষাৎকারে সালমানকে নিয়ে দারুণ মূল্যায়ন করেছেন অভিনেতা আলেকজান্ডার বো, যিনি নায়ক রুবেলের শিষ্য। সালমানকে নিয়ে এমন নির্মোহ মূল্যায়ন তিনি করতে পেরেছেন, কারণ তিনি তাঁর প্রতিযোগী ছিলেন না। কে কোথায় কী বলেন, তার কোনো কিছুই সালমানভক্তদের চোখ এড়ায় না। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে সালমানভক্তরা সেসব নিয়ে বিশদ আলোচনাও করেন। মজার ব্যাপার হলো, সালমানের জনপ্রিয়তা নিয়ে সহকর্মীদের যাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন প্রায়ই, সালমানের জন্ম ও মৃত্যুদিবসে এখন তাঁরাই বেশি মেতে ওঠেন সালমান বন্দনায়।
আদালত, মামলা, তদন্ত
গত তিরিশ বছরে সালমান ‘হত্যা মামলা’ বারবার পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। আসামিদের কেউ কেউ কিছুদিন পরপরই লাইভে এসে নতুন নতুন তথ্য দেন। মজার ব্যাপার হলো, অভিযুক্তরাও সালমানকে নিয়ে যেচে বক্তব্য দেন, যেন আলোচনায় থাকা যায়। এমনকি সালমানের স্ত্রী সামিরাও প্রকাশ্যে এসে জানিয়েছেন মামলা ও অভিযুক্তদের নিয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি। দেশে সরকার যায় সরকার আসে, সালমান ‘হত্যা মামলা’ও গায়েব হয় আবার পায় নতুন গতি। এ বছরও নতুন করে আলোচনায় এই মামলা। অভিনেতা ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতের সামনে, শাহবাগে ভক্তরাও ব্যানার-পোস্টার হাতে নতুন আশায় দাঁড়িয়ে গেছেন। এবার যদি এর একটা রফাদফা হয়!
কেন ভোলা যায় না তাঁরে
নায়ক জাফর ইকবাল, জসীম বা মান্নাও জনপ্রিয় থাকাকালীন গত হয়েছেন। অকালে খুন হয়েছেন সোহেল চৌধুরীও। কিন্তু তাঁদের জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকীতে তেমন উন্মাদনা চোখে পড়ে না। সালমানের বেলায় বরং ভক্তদের মাতম দিন দিন বেড়েই চলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ভক্তদের ফ্যান ক্লাব আছে প্রায় ২০টি। অন্য কোনো নায়কের বেলায় এমনটি হয়নি। সালমানের ছবিসংবলিত টি-শার্ট বের হয় প্রতিবছর। হয় সপ্তাহব্যাপী ‘সালমান শাহ চলচ্চিত্র উৎসব’। এবার তো সালমানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘লাভ ৯৬’। আসলেই তাঁকে ভোলা যায় না, কারণ ছবির গল্প ও চরিত্র অনুযায়ী আর কেউ তাঁর মতো করে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারেননি।