সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:১৮ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

রোমাঞ্চকর মঙ্গোলিয়ায়

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে
নান্দনিক লাল ল্যানটেন, নির্জন পরিবেশ আর ঐতিহাসিক নানা স্থান দেখে চীনের শ্যান্ডং প্রদেশের লাই উ সিটিতে ভালোই সময় কাটছিল। নীল-সাদা আকাশ, ঝলমলে রোদ আর ঝিরিঝিরি বাতাস—জুলাইয়ের এমন ফুরফুরে দিনে সকালের নাশতা সেরে রওনা হলাম অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ার পথে।

গাড়িতে দুই ঘণ্টা যাত্রা শেষে চলে এলাম জিনান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে আকাশপথে পাড়ি দিলাম আরো প্রায় তিন ঘণ্টা। গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে জানালা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল অসংখ্য সবুজ পাহাড় ও ঢালু ভূমি। এক অপরূপ দৃশ্য! মনে হচ্ছিল যেন সবুজ ও মেটে রং দিয়ে আঁকা কোনো নৈসর্গিক ছবি! অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ার হোহহোট বাইতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলাম।
তখন বিকেল সাড়ে ৪টা। আগেই গাড়ি বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম। দেরি না করে চড়ে বসলাম তাতে। রাস্তার দুই পাশে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য আর ঐতিহাসিক নানা ভাস্কর্য।
সেসব দেখতে দেখতে গন্তব্য সুয়োদিয়া হোটেলে পৌঁছতে আরো দুই ঘণ্টা লেগে গেল। হোটেল রুমে ব্যাগপত্র রেখে রাতের খাবার খেতে বের হলাম। হোটেলের কাছেই এক রেস্তোরাঁয় মঙ্গোলিয়ার জনপ্রিয় খাবার মাটন বারবিকিউ, নুডলস, শুকনা দুধে মেশানো ফল-সবজির বিশেষ সালাদ আর চীনের জনপ্রিয় কোমল পানীয় ড্যায়াও দিয়ে রাতের খাবার সারলাম। খাবারগুলো বেশ সুস্বাদু। 

 

বিস্তৃত তৃণভূমি ও অসংখ্য উঁচু পাহাড় অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়াকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা
বিস্তৃত তৃণভূমি ও অসংখ্য উঁচু পাহাড় অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়াকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা

পরদিন বেশ সকালে উঠলাম।

হোটেলের নিচতলায় নাশতা সেরে রওনা হলাম হুলুন বুইর শহরের উদ্দেশে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর চালক দ্য মেরগেল রিভার রিসোর্টে গাড়ি থামাল। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। নদী দেখার নির্ধারিত বাসে চড়ে এক অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যের সম্মুখে পড়লাম। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। পাহাড়ের ওপারে পাহাড়। তার পরেও পাহাড়, যেন দিগন্তহীন পাহাড়শ্রেণি। ছোট-বড় কোনো বৃক্ষ নেই। পাহাড়ের গায়ে একমাত্র মেঘের ছায়া। দেখে মনে হচ্ছিল বাস থেকে নেমে পাহাড়ে একটু দৌঁড়ে আসি। আশপাশে অশ্বারোহণ ক্যাম্প। স্থানীয় লোকজনের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তোলার ব্যবস্থাও আছে। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম বিশাল এক পাহাড়ের তলদেশে। প্রায় ১০০ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। সেখান থেকে অপূর্ব সবুজ পাহাড়গুলো আরো কাছ থেকে দেখা যায়। একঝাঁক অশ্ব দৌড়াচ্ছিল আপনমনে। যেদিকেই যাক, ওরা নাকি ঠিক আস্তানায় ফেরে। পাহাড়টির চূড়ায় স্থানীয় লোকজনের উপাসনালয়। পাশে আইসক্রিম আর বেশ কিছু রেপ্লিকার দোকান। প্রচণ্ড গরম। আইসক্রিম খেতে খেতে উপভোগ করলাম বিশ্বের প্রথম আঁকাবাঁকা নদী মিউগ মোয়েরগেলে, যা ‘দ্য গ্রেটেস্ট ওয়াটার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে পরিচিত। কিছুক্ষণ পর একই পথে ফিরে এলাম বিখ্যাত এরগুনা জলাভূমি অঞ্চলে। পথে পর্যটকদের উদ্দেশে বসা ঢাকার নিউমার্কেটের মতো এক দীর্ঘ বাজার সামনে পড়ল। চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে স্মারক, পোশাক, হ্যাট, ঘোড়া আরোহীর টুপি ও কটি। সামনেই দেখলাম একটি স্টেজে কনসার্ট হচ্ছে। সেখান থেকে চলে এলাম অন্য একটি পাহাড় চূড়ার কাছে। চূড়ায় উঠে এক পাশে দেখা যায় হুলুন বুইরের বিখ্যাত এরগুনা জলাভূমি অঞ্চল। অন্য পাশে পুরো হুলুন বুইর শহরের বাড়িঘর আর বিভিন্ন রঙের নান্দনিক তাঁবু। পাহাড় থেকে সব ছোট দেখাচ্ছিল। একই পথে ফিরে রওনা হলাম তাঁবুর দিকে। এখানে পর্যটকরা তাঁবুতে রাত কাটায়। 

পথে এক রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেয়ে বিরতি অশ্বারোহণ ক্যাম্পে। টিকিট কেটে হেলমেট ও লাইফসেভিং জ্যাকেট পরে চড়ে বসলাম ঘোড়ার পিঠে। সব ঘোড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। একেবারে সারিবদ্ধভাবে চলে। পাহাড়ি তৃণভূমির ওপর অশ্বারোহণ ছিল চমত্কার এক অভিজ্ঞতা। ঘোড়া থেকে নেমে সূর্যাস্ত দেখে চলে এলাম তাঁবু শিবিরে। একটি বড় তাঁবুতে খাবারের আয়োজন। চাবি নিয়ে আমরা আমাদের তাঁবুতে ঢুকলাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র আর আলাদা বাথরুমসহ আরামে রাতযাপনের সব ব্যবস্থাই আছে। ক্লান্ত সবাই, তবু ব্যাগপত্র রেখে হাঁটতে বের হলাম। আলোকসজ্জায় সজ্জিত সব তাঁবু। সেখানে সন্ধ্যায় পর্যটকরা ইচ্ছামতো আতশবাজি ফোটায়। রাত ১১টা পর্যন্ত চলে গান-বাজনা। পরদিন সকালে নাশতা করলাম ওই বড় তাঁবুতে। সকালের ঝলমলে রোদে সাদা তাঁবুগুলো চকচক করছে। একটু পর আবার চললাম অশ্বারোহণ করতে। পাহাড়ের তলদেশে মুক্তপথে দুরন্ত বেগে এটিভি কার ড্রাইভ করলাম। কাছাকাছি খোলা মাঠের মতো এক জায়গায় নানা কার্যক্রম চলছে—মেষকে ফিডারে দুধ খাওয়ানো, ঐতিহাসিক পোশাক পরে ছবি তোলা, সাইকেল ডাইভিং নির্ভর ছোট রোলার কোস্টার ও লোহার দোলনায় রাইডিং, হাতে চালিত দোলুল্যমান নৌকা রাইড, লাল-নীল-সবুজ রঙের ছোট রেলগাড়ি, তীর-ধনুক ছোড়া, উঠ আরোহণসহ আরো কত কি! টিকিট কেটে ফিডার হাতে নিতেই হাজির হয়ে গেল কতগুলো সাদা মেষ। দুধ খাওয়ার প্রতিযোগিতায় লেগে গেল ওরা। মুখে দিতেই কয়েক সেকেন্ডে শেষ। এরপর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তুললাম। এক পাশে স্থানীয় পাতলা চায়ের আয়োজন। এতে আমাদের দেশের মুড়ির মতো কয়েকটি দানা মিশিয়ে দেওয়া হয়। চায়ের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শুষ্ক শক্ত পনিরের টুকরা খেলাম।

রাত ৭টায় তাঁবুতে ফিরে স্থানীয় বিখ্যাত বারবিকিউ দিয়ে রাতের খাবার। তাঁবুতে ঢুকে দেখি ওপরের চান্দুয়ার মাঝের কাচ দিয়ে গাঢ় নীল আকাশে মিটমিটে তারা দেখা যায়। পরদিন সকালে চেক আউট সেরে চলে এলাম পাহাড়ের তৃণভূমির স্লাইডে চড়তে। তাঁবু থেকে কিছুদূরে। লম্বা লাইন। অনেক পর্যটকের ভিড়। দূরে এক বিশাল উঁচু পাহাড়ের গায়ে স্লাইডলাইন দেখা যায়। বাসে উঠে পৌঁছে গেলাম সেই পাহাড়ের চূড়ায়। সেখান থেকে অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ার অপরূপ পাহাড়ের চূড়াগুলো আবার দেখতে পেলাম। লাইনে দাঁড়ানোর পর কোনো রকম সুরক্ষা ছাড়াই স্লাইডে বসিয়ে দেওয়া হলো আমাদের। সবার হূত্স্পন্দন বেড়ে গেল। হঠাত্ ছেড়ে দেওয়া হলো স্লাইড। প্রায় দুই মিনিটে স্লাইডলাইন বরাবর চিত্কার করতে করতে বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণযুদ্ধ করে আশপাশের পাহাড়ি ঘাস ভেদ করে চলে এলাম সেই পাহাড়ের তলদেশে। দুঃসাহসিক এক অভিজ্ঞতা। পরের গন্তব্য কাছাকাছি এক আশ্চর্য স্টেডিয়াম। গেট থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ঘোড়া, মহিষ, উট ও পশুচালিত গাড়ির বড় বড় ভাস্কর্য। টিকিট কেটে স্টেডিয়ামের সিটে বসলাম। একটু পর শো শুরু হলো। অশ্বযূথের একসঙ্গে দুরন্ত বেগে দৌড়, চলন্ত ঘোড়ার পিঠে নানা কৌশলে চড়া, সার্কাস, ঘোড়ার পিঠে চড়ে তলোয়ারযুদ্ধ ও কুস্তি খেলা আর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য দেখলাম। বিকেলে রওনা হলাম রাশিয়ার সীমানার উদ্দেশে। রাশিয়ার সীমানাসংলগ্ন অঞ্চলের কাছাকাছি আমাদের পথ। সবুজ ঘাস, উঁচু গম্বুজওয়ালা ভবন, পাহাড়ে স্থাপিত অসংখ্য ঘূর্ণায়মান টারবাইন দেখতে দেখতে চলে এলাম রাশিয়ার সীমানা অঞ্চলে। সেখানে রাশিয়া ও চীন উভয় দেশের  মানুষের থাকা ও যাতায়াতের অনুমতি আছে। ফ্রেন্ডশিপ হোটেলে ব্যাগপত্র রেখে রাশিয়ার সীমানায় রাতের জমজমাট পরিবেশ দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের বিমানযাত্রার সময় ঘনিয়ে আসছিল। সামনে এগোতেই রাশিয়ার বর্ডার গেট। ওপারে রাশিয়া। একই পথে ফিরলাম জিনান সিটিতে। সঙ্গে নিয়ে এলাম অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ার রোমাঞ্চকর অসংখ্য স্মৃতি।

 

 

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com