
পরদিন বেশ সকালে উঠলাম।
পথে এক রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেয়ে বিরতি অশ্বারোহণ ক্যাম্পে। টিকিট কেটে হেলমেট ও লাইফসেভিং জ্যাকেট পরে চড়ে বসলাম ঘোড়ার পিঠে। সব ঘোড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। একেবারে সারিবদ্ধভাবে চলে। পাহাড়ি তৃণভূমির ওপর অশ্বারোহণ ছিল চমত্কার এক অভিজ্ঞতা। ঘোড়া থেকে নেমে সূর্যাস্ত দেখে চলে এলাম তাঁবু শিবিরে। একটি বড় তাঁবুতে খাবারের আয়োজন। চাবি নিয়ে আমরা আমাদের তাঁবুতে ঢুকলাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র আর আলাদা বাথরুমসহ আরামে রাতযাপনের সব ব্যবস্থাই আছে। ক্লান্ত সবাই, তবু ব্যাগপত্র রেখে হাঁটতে বের হলাম। আলোকসজ্জায় সজ্জিত সব তাঁবু। সেখানে সন্ধ্যায় পর্যটকরা ইচ্ছামতো আতশবাজি ফোটায়। রাত ১১টা পর্যন্ত চলে গান-বাজনা। পরদিন সকালে নাশতা করলাম ওই বড় তাঁবুতে। সকালের ঝলমলে রোদে সাদা তাঁবুগুলো চকচক করছে। একটু পর আবার চললাম অশ্বারোহণ করতে। পাহাড়ের তলদেশে মুক্তপথে দুরন্ত বেগে এটিভি কার ড্রাইভ করলাম। কাছাকাছি খোলা মাঠের মতো এক জায়গায় নানা কার্যক্রম চলছে—মেষকে ফিডারে দুধ খাওয়ানো, ঐতিহাসিক পোশাক পরে ছবি তোলা, সাইকেল ডাইভিং নির্ভর ছোট রোলার কোস্টার ও লোহার দোলনায় রাইডিং, হাতে চালিত দোলুল্যমান নৌকা রাইড, লাল-নীল-সবুজ রঙের ছোট রেলগাড়ি, তীর-ধনুক ছোড়া, উঠ আরোহণসহ আরো কত কি! টিকিট কেটে ফিডার হাতে নিতেই হাজির হয়ে গেল কতগুলো সাদা মেষ। দুধ খাওয়ার প্রতিযোগিতায় লেগে গেল ওরা। মুখে দিতেই কয়েক সেকেন্ডে শেষ। এরপর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তুললাম। এক পাশে স্থানীয় পাতলা চায়ের আয়োজন। এতে আমাদের দেশের মুড়ির মতো কয়েকটি দানা মিশিয়ে দেওয়া হয়। চায়ের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শুষ্ক শক্ত পনিরের টুকরা খেলাম।
রাত ৭টায় তাঁবুতে ফিরে স্থানীয় বিখ্যাত বারবিকিউ দিয়ে রাতের খাবার। তাঁবুতে ঢুকে দেখি ওপরের চান্দুয়ার মাঝের কাচ দিয়ে গাঢ় নীল আকাশে মিটমিটে তারা দেখা যায়। পরদিন সকালে চেক আউট সেরে চলে এলাম পাহাড়ের তৃণভূমির স্লাইডে চড়তে। তাঁবু থেকে কিছুদূরে। লম্বা লাইন। অনেক পর্যটকের ভিড়। দূরে এক বিশাল উঁচু পাহাড়ের গায়ে স্লাইডলাইন দেখা যায়। বাসে উঠে পৌঁছে গেলাম সেই পাহাড়ের চূড়ায়। সেখান থেকে অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ার অপরূপ পাহাড়ের চূড়াগুলো আবার দেখতে পেলাম। লাইনে দাঁড়ানোর পর কোনো রকম সুরক্ষা ছাড়াই স্লাইডে বসিয়ে দেওয়া হলো আমাদের। সবার হূত্স্পন্দন বেড়ে গেল। হঠাত্ ছেড়ে দেওয়া হলো স্লাইড। প্রায় দুই মিনিটে স্লাইডলাইন বরাবর চিত্কার করতে করতে বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণযুদ্ধ করে আশপাশের পাহাড়ি ঘাস ভেদ করে চলে এলাম সেই পাহাড়ের তলদেশে। দুঃসাহসিক এক অভিজ্ঞতা। পরের গন্তব্য কাছাকাছি এক আশ্চর্য স্টেডিয়াম। গেট থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ঘোড়া, মহিষ, উট ও পশুচালিত গাড়ির বড় বড় ভাস্কর্য। টিকিট কেটে স্টেডিয়ামের সিটে বসলাম। একটু পর শো শুরু হলো। অশ্বযূথের একসঙ্গে দুরন্ত বেগে দৌড়, চলন্ত ঘোড়ার পিঠে নানা কৌশলে চড়া, সার্কাস, ঘোড়ার পিঠে চড়ে তলোয়ারযুদ্ধ ও কুস্তি খেলা আর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য দেখলাম। বিকেলে রওনা হলাম রাশিয়ার সীমানার উদ্দেশে। রাশিয়ার সীমানাসংলগ্ন অঞ্চলের কাছাকাছি আমাদের পথ। সবুজ ঘাস, উঁচু গম্বুজওয়ালা ভবন, পাহাড়ে স্থাপিত অসংখ্য ঘূর্ণায়মান টারবাইন দেখতে দেখতে চলে এলাম রাশিয়ার সীমানা অঞ্চলে। সেখানে রাশিয়া ও চীন উভয় দেশের মানুষের থাকা ও যাতায়াতের অনুমতি আছে। ফ্রেন্ডশিপ হোটেলে ব্যাগপত্র রেখে রাশিয়ার সীমানায় রাতের জমজমাট পরিবেশ দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের বিমানযাত্রার সময় ঘনিয়ে আসছিল। সামনে এগোতেই রাশিয়ার বর্ডার গেট। ওপারে রাশিয়া। একই পথে ফিরলাম জিনান সিটিতে। সঙ্গে নিয়ে এলাম অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ার রোমাঞ্চকর অসংখ্য স্মৃতি।