এ ঘটনায় আন্দোলনকারী দিনাজপুরবাসীর ওপরে গুলি চালানোর অপরাধে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করা দুটি মামলা বর্তমানে দিনাজপুর বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। ইয়াসমিনকে স্মরণ করে ২৪ আগস্ট নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়।
বাংলাদেশের নারীরা নানা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করলেও নির্যাতন-নিপীড়ন-সহিংসতা থেকে তাঁদের মুক্তি মেলেনি, বরং আশঙ্কাজনকভাবে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে নারীর প্রতি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা। সম্প্রতি মেয়েশিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। যৌন নিপীড়ন থেকে বাদ যাচ্ছে না ছেলেশিশুরাও। সমাজে ঘৃণা-বিদ্বেষের চর্চা বাড়ছে। আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া এবং সমাজে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির মাধ্যমে চলমান সংঘবদ্ধ সহিংস আক্রমণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সংরক্ষিত ১৫টি দৈনিক পত্রিকা ও দুটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ এই সাত মাসের পরিসংখ্যান অনুসারে এক হাজার ৬৬৭ জন নারী ও মেয়েশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যান সমাজে নারী ও শিশুর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
গত কয়েক দিনের বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ শিরোনামে প্রকাশিত হয়—সুনামগঞ্জের ছাতকে ২০ মাস বয়সী শিশুকে ধর্ষণ, যশোরে মা-ছেলের লাশ এক খাটে, রংপুরে নারীকে আটকে রেখে ধর্ষণ, কুমিল্লায় গৃহকর্ত্রীকে ৯ খণ্ড করে বাড়ির পেছনে মাটিচাপা দেওয়া, শরীয়তপুরে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় দুই তরুণীকে বর্বর নির্যাতন, মুন্সীগঞ্জে কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ, গাজীপুরের কালীগঞ্জে ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা ও গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা, নোয়াখালীতে ছেলে-মাকে জবাই করে হত্যা, মডেল অভিনেত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু, সিলেটে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ করায় বাবাকে কুপিয়ে হত্যা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কিশোরীর লাশ রেখে পলায়ন, সিলেটে বাসার ভেতরে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং গৃহকর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা, পটুয়াখালীতে সালিসে গিয়ে নারী ইউপি সদস্য মারধরের শিকার, সুনামগঞ্জে দুই শিশুকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হাওরে ফেলে হত্যাসহ নারী ও শিশুর প্রতি নানা ধরনের সহিংসতার ঘটনা।
অত্যন্ত আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ধর্ষণ এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তার চেয়েও বাড়ছে নানা ধরনের নারী হত্যার নৃশংস ঘটনা। গত সাত মাসের নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনার মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েশিশুদের ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনার পাশাপাশি জুন ও জুলাই ২০২৬-এ পত্রিকায় প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে মাদরাসায় বলাৎকারের শিকার হয়েছে ১২ জন ছেলেশিশু।
নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা রোধে আইন আছে, কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন এবং বিচারপ্রাপ্তি অত্যন্ত অপ্রতুল। রয়েছে নানা প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। সংকট রয়েছে সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রে, রয়েছে ফরেনসিক ল্যাবরেটরির স্বল্পতা, যথেষ্টসংখ্যক বিচারকের অভাব, রয়েছে বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত দায়িত্বপ্রাপ্তদের অসংবেদনশীলতা। একই জায়গা থেকে সহিংসতায় ভুক্তভোগী নারী ও মেয়েশিশুদের সমন্বিত পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার (ভিএসসি), ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব, জেলা-উপজেলা সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানা প্রাতিষ্ঠানিক সংকট নারী ও মেয়েশিশুদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করে। এর সঙ্গে রয়েছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা উদ্বেগজনক সংকট।
সমাজে ঘৃণা-বিদ্বেষের চর্চা বাড়ছে। আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া এবং সমাজে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির মাধ্যমে চলমান সংঘবদ্ধ সহিংস আক্রমণ প্রচলিত বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি এক ধরনের অনাস্থার পরিস্থিতি তৈরি করছে। নারীর ওপর দায় চাপানোর প্রথাগত চর্চার বিস্তার, সমাজে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা, ধর্মকে নানাভাবে নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা এবং নারীর অগ্রগতিকে রোধ করার জন্য কুসংস্কারাছন্ন উগ্র বক্তব্য লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা তাদের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ঘটে চরম অবনতি। সামাজিক অপবাদ-অপমান, লোকলজ্জার ভয় নারী ও শিশুর পরবর্তী জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তাদের স্বাধীন চলাচল সীমিত হয়ে যায়, শিক্ষাঙ্গন থেকে তারা ঝরে পড়ে, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমে যায়, ব্যক্তিত্ব বিকাশে দেখা দেয় স্থবিরতা।
আমরা নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে এক দুর্যোগপূর্ণ সময় পার করছি। এই সংকটময় সময়ে দেশে নারী ও মেয়েশিশু হত্যার ঘটনা ঘটছে অহরহ। আমরা কি এমন এক সমাজেই বাস করব, নাকি নারী ও মেয়েশিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলব, সেই বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। সহিংসতা প্রতিরোধে আমাদের ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতার অবসানে প্রয়োজন রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং তরুণ প্রজন্মের সমন্বিত কর্মোদ্যোগ। ইয়াসমিনের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে যে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা আজকের সময়ের জন্যও খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
লেখক : পরিচালক, লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড লবি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ