সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

হলে প্রবেশের সময়সীমা ছাত্রীদের আন্দোলন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর শাহবাগের জটে বাস আটকে ছিল অনেকক্ষণ। ঘড়িতে তখন রাত ১০টা ৫৫ মিনিট। বেগতিক দেখে নীলা (ছদ্মনাম) মোড়েই নেমে পড়েন। টিএসসির রাস্তা ধরে প্রায় দৌড়ে রোকেয়া হলের ফটকে পৌঁছান ১১টা ৩ মিনিটে। ৩ মিনিট! ততক্ষণে লোহার গেটে ভারী তালা ঝুলে গেছে। ওপাশ থেকে ভেসে আসে নিরাপত্তাকর্মীর নির্লিপ্ত কণ্ঠ–সময় শেষ। সেই রাতে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায়। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলে থাকা তাঁর সহপাঠীর জন্য অবশ্য সে রাতে কোনো ঘড়ির দায় ছিল না। এ শহরে ঘড়ি কেবল মেয়েদের জন্য চলে।

গত ২৬ জুলাই শামসুন নাহার হলে তীব্র পেটব্যথায় কাতর এক ছাত্রীর জন্য ডাকা অ্যাম্বুলেন্স আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল গেটের বাইরে। অভিযোগ, ‘যথাযথ অনুমতি’ নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত বন্ধুরা ধরাধরি করে অসুস্থ শিক্ষার্থীকে বাইরে এনে হাসপাতালে নেন। ১৯ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতে বান্ধবীর সঙ্গে খেলা দেখতে আসা প্রথম বর্ষের এক অনাবাসিক ছাত্রীকে ভোর ৪টায় হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফ্লোর ম্যামকে ফোন করা হলে তিনি দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। যেভাবে এসেছেন, সেভাবেই ফিরে যাবেন। শেষে প্রাধ্যক্ষের ব্যক্তিগত মানবিকতায়, লিখিত আবেদনের বিনিময়ে, ‘বিশেষ বিবেচনায়’ মেয়েটি রাতটুকু হলে থাকার অনুমতি পান। নিরাপত্তা এখানে অধিকার নয়, অনুগ্রহ। এগুলো কোনো ঔপনিবেশিক অন্দরমহলের গল্প নয়। ২০২৬ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন বাস্তবতা।
নিয়মটি সরল এবং সেই সারল্যেই নিষ্ঠুর। ছাত্রীদের পাঁচটি হলে রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কার্যত এক সান্ধ্য আইন বহাল। ছাত্রদের ১৪টি হলে এমন কোনো সময়সীমা নেই। অনাবাসিক ছাত্রী; যারা মোট নারী শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৭ শতাংশ–বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও কোনো হলে ঢুকতে পারেন না। যদিও হল ফি তাদের নিয়মিত দিতে হয়। মা কিংবা বোন ঢাকায় এলে মেয়ের ঘর পর্যন্ত যাওয়ার অধিকার তাদেরও নেই।

ইতিহাসের কৌতুকটি এখানেই নির্মম। ১৯৩৮ সালে চামেলী হাউসে মাত্র ১২ জন ছাত্রী নিয়ে যে হলটির যাত্রা শুরু, ১৯৬৪ সালে তার নাম হয় রোকেয়া হল। যে বেগম রোকেয়া ১৯৩১ সালে ‘অবরোধ-বাসিনী’ লিখে নারীকে চার দেয়ালে বন্দি রাখার সমাজটিকে ভেঙে বিদ্ধ করেছিলেন, ৯৫ বছর পর তাঁরই নামাঙ্কিত ফটকে ঝুলছে সেই তালা। বিশ্ববিদ্যালয়টির বয়স এখন ১০৫। তাই আন্দোলনকারীদের একটি প্ল্যাটফর্মের নাম ‘অবরোধবাসিনী’। সঙ্গে আছে ‘বৈষম্যহীন নারী হল চাই’ ও ‘নারী হল সংস্কার আন্দোলন’। এই তিন পক্ষ থেকে ২৭ জুলাই উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামের কাছে স্মারকলিপি, ৩ আগস্ট মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন, ১০ আগস্ট সংহতি সমাবেশ ও ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। আন্দোলনে দাবি মূলত তিনটি; যা তিন প্ল্যাটফর্মেই প্রায় অভিন্ন– সান্ধ্য আইন বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ যাতায়াত, পরিচয়পত্র দেখিয়ে যে কোনো ছাত্রী হলে প্রবেশ ও অনুমতিসাপেক্ষে রাতযাপন এবং পরিবারের নারী সদস্যদের কক্ষ পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি।
কেন এই আন্দোলন–প্রশ্নের জবাবে ‘বৈষম্যহীন নারী হল চাই’-এর সংগঠক নুসাইবা আহমেদ বলেন, ‘‘প্রথম দিন থেকেই বুঝেছি, এখানে ছেলেরা শিক্ষার্থী আর মেয়েরা ‘নারী শিক্ষার্থী’। বাড়ি ২০ কিলোমিটার দূরে, অনেক চেষ্টাতেও সিট মেলেনি, অথচ পরিচয়পত্রে সংযুক্ত হলের নাম লেখা। সহপাঠ্যক্রমিক কাজ শেষে রাত হয়ে গেলে থাকার জায়গা জোগাড় করতে হয় অনুনয়-বিনয় করে–নয়তো ১১টা-১২টায় একা ফেরার ঝুঁকি।’’

‘নারী হল সংস্কার আন্দোলন’-এর সংগঠক মোছাম্মৎ আছিয়া আক্তার রেমিজা জানান, রোকেয়া হলে আলোচনার মাধ্যমে লেট গেটের সময় ১ ঘণ্টা বাড়ানো গিয়েছিল, কিন্তু সেটি দাবির তুলনায় যৎসামান্য। তাঁর কথায়, ‘প্রশাসনের নিরাপত্তা দিতে না পারার দায় নারী শিক্ষার্থীরা কেন নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে শোধ করবেন?’
১৭ আগস্ট প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি সময়সীমা আরও ১ ঘণ্টা বাড়ানোর সুপারিশ করে। ডাকসু সদস্য ও ‘অবরোধ-বাসিনী’র সংগঠক হেমা চাকমা একে ‘দায়সারা সুপারিশ’ ও আন্দোলনের সঙ্গে প্রহসন আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, সন্ধ্যা ৭টার পর সেন্ট্রাল ফিল্ডে ছাত্রীদের অলিখিত নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে একবার সেখানে বারবিকিউ উৎসব করতে হয়েছিল। তবু গত সপ্তাহে সেখানেই আরেক ছাত্রী হেনস্তার শিকার হন। উপাচার্য বদলায়, চেয়ার বদলায়–দৃষ্টিভঙ্গি বদলায় না।

কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রি জানান, নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ইশতেহার অনুযায়ী লেট গেটের সময় ১০টা থেকে ১১টায় নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা শুনে তাঁর উপলব্ধি–১১টাও যথেষ্ট নয়, নিয়মটিই বৈষম্যমূলক।
‘অবরোধ-বাসিনী’র ইসরাত জাহান ইমুর মতে, ৮ ঘণ্টার এই কারফিউ নিরাপত্তা দেয় না, বরং প্রশাসনিক হয়রানি আর ছাত্রীদের চরিত্র হননের সুযোগ তৈরি করে এবং তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করে।

চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে ডাকসুর সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমা বলেন, ‘আমাদের ডাকসুর ২৮ জনের পুরো বডি থেকে আসলে এ বিষয়টা শক্তিশালীভাবে উত্থাপিত হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে বেশ কয়েকটা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ডাকসু থেকে একটা স্মারকলিপি দেওয়া হয় ভিসি স্যারের কাছে। ব্যক্তিগতভাবে এই ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার ব্যাপারে আমার একটা মতামত আছে। তবে ডাকসু থেকে বিবৃতি আসেনি। আমি এই সান্ধ্য আইনটা বাতিলের ব্যাপারে সম্মতি জানিয়েছি।’
শিক্ষকদের একাংশও ছাত্রীদের আন্দোলনে পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষে অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী বলেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশেও এমন বন্দিত্বমূলক নিয়ম টিকে থাকা শিক্ষক হিসেবে লজ্জার।

মূল প্রশ্নটি–গেট কখন খুলবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো–নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নারীশিক্ষার্থী পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন নাগরিক, না কি অনুমতি, তালা ও অভিভাবকত্বের অধীন কেউ? নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকে পরস্পরের বিকল্প বানিয়ে ফেলা প্রশাসনের নিজের ব্যর্থতাকেই আড়াল করে। ক্যাম্পাসে আলো, সিসিটিভি, টহল ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে ছাত্রীদের ঘরে আটকে রাখা সহজ কিন্তু সেটি সমাধান নয়, দায় এড়ানো।
যেখানকার নারীশিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ আর চব্বিশের জুলাইয়ে হলের তালা ভেঙে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০২৬ সালে এসে তাদের লড়তে হচ্ছে নিজের হলে নিরাপদে ফেরার অধিকারের জন্য। প্রশাসন ফটকে তালা ঝোলাতে পারে; সমমর্যাদার যে আকাঙ্ক্ষা এই আগস্টে পাঁচ হলের ছাত্রীরা রাস্তায় নামিয়ে এনেছেন, তার কোনো কারফিউ হয় না। v

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com