লিগামেন্টের কাজ
মোট তিনটি হাড় মিলে হাঁটুর সন্ধি গঠিত। এর মধ্যে আছে ফিমার বা ঊরুর হাড়, টিবিয়া বা পায়ের নিচের প্রধান হাড় এবং প্যাটেলা বা হাঁটুর ক্যাপ।হাড়গুলোকে দৃঢ়ভাবে যুক্ত রেখে হাঁটুর স্বাভাবিক নড়াচড়া ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখে লিগামেন্ট। হাঁটুর চারটি প্রধান লিগামেন্ট—এন্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট (এসিএল), পোস্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট (পিসিএল), মিডিয়াল কোল্যাটারাল লিগামেন্ট (এমসিএল) ও ল্যাটারাল কোল্যাটারাল লিগামেন্ট (এলসিএল)।
কেন হয়
ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন বা অন্যান্য খেলায় দৌড়ানোর সময় হঠাৎ দিক বদলানো, লাফ দিয়ে ভুলভাবে মাটিতে নামা কিংবা হাঁটুতে সরাসরি আঘাত লাগলে লিগামেন্টে টান লাগতে পারে, এমনকি ছিঁড়ে যেতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনা, পড়ে যাওয়া এবং গৃহস্থালি দুর্ঘটনায়ও এমনটা হতে পারে।তরুণ-তরুণী ও পেশাদার কিংবা শৌখিন খেলোয়াড়দের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। তবে যেকোনো বয়সে এবং যে কেউই এই সমস্যায় পড়তে পারেন।
যেসব লক্ষণ খেয়াল করবেন
আঘাতের মুহূর্তে হাঁটু মোচড়ানোর শব্দ হতে পারে। এরপর ব্যথা, দ্রুত হাঁটু ফুলে যাওয়া, হাঁটু পুরোপুরি ভাঁজ বা সোজা করতে অসুবিধা এবং পায়ের ওপর ভর দিতে সমস্যা হতে পারে। হাঁটার সময় হাঁটু হঠাৎ বেঁকে যাওয়া বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতিও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।সিঁড়ি দিয়ে নামা কিংবা অসমতল জায়গায় হাঁটার সময় অনেকের কাছে তাঁর হাঁটু অস্থিতিশীল মনে হতে পারে। হাঁটু আটকে গেলে সঙ্গে মেনিসকাস বা কার্টিলেজের আঘাতও থাকতে পারে।
কিভাবে নির্ণয় করা হয়
রোগী কিভাবে আঘাত পেয়েছে, এরপর কী কী সমস্যা হচ্ছে—তা জেনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হাঁটু পরীক্ষা করেন। অনেক ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায়ই লিগামেন্টের আঘাত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এক্স-রেতে লিগামেন্ট দেখা যায় না; তবে হাড় ভেঙেছে কি না বা লিগামেন্টের সঙ্গে হাড়ের ছোট অংশ উঠে এসেছে কি না, তা বোঝা যায়। লিগামেন্ট, মেনিসকাস ও কার্টিলেজের ক্ষতির ধরন ও মাত্রা জানতে এমআরআই করা হতে পারে।
অস্ত্রোপচারই শেষ কথা নয়
সব লিগামেন্ট ইনজুরিতে অস্ত্রোপচার লাগে না। আঘাতের পর প্রথমে বিশ্রাম, কাপড়ে মোড়ানো বরফ ছেঁক, হালকা কমপ্রেশন ও পা উঁচুতে রাখলে ব্যথা-ফোলা কমতে পারে। তবে হাঁটুতে ভর না দিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আংশিক ছিঁড়ে যাওয়া বা তুলনামূলক স্থিতিশীল হাঁটু অনেক ক্ষেত্রে ব্রেস, নিয়ন্ত্রিত ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব। চিকিৎসা নির্ভর করে কোন লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আঘাত কতটা গুরুতর, হাঁটু কতটা অস্থিতিশীল, অন্য কোনো স্ট্রাকচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না এবং রোগীর কাজ ও খেলাধুলার প্রয়োজনের ওপর।
সম্পূর্ণ এসিএল বা পিসিএল ছিঁড়ে হাঁটু বারবার বেঁকে গেলে, একাধিক লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে অথবা সক্রিয় খেলাধুলায় ফিরতে হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। আর্থ্রোস্কোপিক রিকনস্ট্রাকশনে ছোট কয়েকটি ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা ও সূক্ষ্ম যন্ত্রের সাহায্যে অস্ত্রোপচার করা হয়। সাধারণত রোগীর শরীরের অন্য অংশ থেকে নেওয়া টেন্ডনের গ্রাফট দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লিগামেন্ট পুনর্গঠন করা হয়। অস্ত্রোপচারই চিকিৎসার শেষ ধাপ নয়। হাঁটুর নড়াচড়া, পেশিশক্তি ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত পুনর্বাসন এবং নিয়মিত ফিজিওথেরাপি জরুরি। ধাপে ধাপে পুনর্বাসন সম্পন্ন করে চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে স্বাভাবিক কাজ ও খেলাধুলায় ফিরতে হয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং নিয়ম মেনে ব্যায়াম করলে বেশির ভাগ রোগী ভালোভাবে দৈনন্দিন কার্যক্রমে ফিরতে পারেন।
লেখক : অর্থোপেডিক, ট্রমা ও জয়েন্ট
রিপ্লেসমেন্ট সার্জন
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল