অন্যান্য ক্যান্সারের মতো বয়সের সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে। এই ক্যান্সারে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীর বয়স পঞ্চাশের বেশি।তবে বিগত বছরগুলোতে ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যেও এই রোগ শনাক্ত হওয়ার হার বাড়ছে। তাই তরুণদেরও এই রোগের লক্ষণের বিষয়ে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তরুণদের মধ্যে কেন কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের হার বাড়ছে, সেটি এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
কেন বাড়ে ঝুঁকি
কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস জড়িত।এর মধ্যে আছে—
♦ অতিরিক্ত পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত মাংস ও লাল মাংস খাওয়া। এর মধ্যে রয়েছে সসেজ, ধূমায়িত (স্মোকড) মাংস, কোল্ড কাটস, গরু ও খাসির মাংস ইত্যাদি।
♦ ফল-সবজি কম খাওয়া, এতে শরীর প্রয়োজনীয় ফাইবার থেকে বঞ্চিত হয়।
♦ নিষ্ক্রিয় ও অলস জীবনযাপন
♦ দেহের অতিরিক্ত ওজন
♦ ধূমপান ও মদ্যপান।
জেনেটিক্যালি মডিফায়েড খাবার, মোবাইল-কম্পিউটারের বিকিরণ কিংবা শুধু হরমোনের ভারসাম্যহীনতাকেও অনেকে এই রোগের জন্য দায়ী করেন।অবশ্য এসব ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই।
পরিবারের নিকটাত্মীয়র কোলোরেক্টাল ক্যান্সার থাকলে, অন্ত্রে বিশেষ ধরনের পলিপ হওয়ার ইতিহাস থাকলে, দীর্ঘদিনের আলসারেটিভ কোলাইটিস বা ক্রোনস ডিজিজে কোলন আক্রান্ত হলেও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। লিঞ্চ সিনড্রোম ও ফ্যামিলিয়াল অ্যাডেনোম্যাটাস পলিপোসিসের মতো বংশগত সমস্যায় অপেক্ষাকৃত কম বয়সেও ক্যান্সার হতে পারে।
যে সব লক্ষণ অবহেলা নয়
প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক রোগীর কোনো লক্ষণই থাকে না। ক্যান্সার অগ্রসর হওয়ার পর একটানা কয়েক দিন বা সপ্তাহ ধরে ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। অনেক রোগীর মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা যায়। এর পাশাপাশি যোগ হয় মলত্যাগের পরও পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি, পেট ব্যথা বা পেট ফাঁপা, মলের সঙ্গে রক্ত, কারণ ছাড়া ওজন কমা, ক্লান্তি এবং আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা।
মলের সঙ্গে নিঃসৃত রক্তের রং উজ্জ্বল লাল, গাঢ় লাল বা কালচে মল হতে পারে। এর সঙ্গে পাইলসেরও মিল আছে। তাই রক্তের রং দেখে পাইলস ও ক্যান্সার আলাদা করা উচিত নয়। অনেকে মনে করেন, এটি আইবিএসের লক্ষণ। সাধারণত আইবিএস রোগীদের মলের সঙ্গে রক্তপাত হয় না। মলে রক্ত, বারবার পায়খানার অভ্যাস বদলে যাওয়া বা অকারণ রক্তশূন্যতা হলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
স্ক্রিনিং কখন করাবেন
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার থেকে নিরাপদ থাকার সেরা উপায় স্ক্রিনিং করা। এতে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ক্যান্সার বা ঝুঁকিপূর্ণ পলিপ খুঁজে পাওয়া যায়। ৪৫ বছর বয়স পার হওয়ার পর প্রত্যেকের উচিত নিয়মিত স্ক্রিনিং করা। মলের ফিক্যাল ইমিউনোকেমিক্যাল টেস্ট (এফআইটি) ও কোলনোস্কোপির মাধ্যমে ক্যান্সার স্ক্রিনিং করা হয়। মলের পরীক্ষায় অস্বাভাবিক ফল এলে তবেই কোলনোস্কোপি প্রয়োজন। যাদের পরিবারে রোগের ইতিহাস, পলিপ, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ বা বংশগত ঝুঁকি রয়েছে, তাদের আরো তরুণ বয়স থেকেই পরীক্ষা করাতে হবে। কোন পরীক্ষা কখন হবে, সেটি চিকিৎসক ঠিক করবেন। তবে উপসর্গ দেখা দিলে অতি দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে। মনে রাখতে হবে, যত দ্রুত ক্যান্সার শনাক্ত হবে, ততই বাড়বে সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা।
ঝুঁকি কমানো ও চিকিৎসা
ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খ্যাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। বেশি করে খেতে হবে ফল, সবজি, ডাল ও পূর্ণ শস্যের মতো আঁশসমৃদ্ধ খাবার। বাদ দিতে হবে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত পরিমাণ লাল মাংস গ্রহণ। নিয়মিত শরীর চর্চা ও দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। তামাক গ্রহণের অভ্যাস বর্জন ও মদ্যপান এড়িয়ে চললেও কমে ক্যান্সারের ঝুঁকি। তবে স্ক্রিনিং এড়ানো যাবে না। কেননা ঝুঁকি কমানো গেলেও কোলোরেক্টাল ক্যান্সার পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না।
ক্যান্সার ধরা পড়লে এর অবস্থান, বিস্তারের পরিমাণ ও টিউমারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, বিশেষায়িত ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমেও চিকিৎসা করা যেতে পারে। শুরুর দিকে শনাক্ত হলে চিকিৎসায় আরোগ্যের সম্ভাবনা বেশি। সময়মতো স্ক্রিনিং করা এবং নিয়মমাফিক জীবনযাপনের মাধ্যমে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
লেখক : মেডিক্যাল অফিসার
ডেলটা হেলথকেয়ার