নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর একসময় ছিল দেশীয় মাছের প্রধান আধার। বেশির ভাগ জলাশয়ে সহজেই পাওয়া যেত নানা প্রজাতির মাছ।সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পানি থাকলেও মাছ নেই। এর অন্যতম কারণ নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর জালের অবাধ ব্যবহার।
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিষিদ্ধ জালের ক্ষতি সম্পর্কে দেশের ৯৩ শতাংশ জেলের মধ্যে স্বচ্ছ ধারণা নেই।যে কারণে লোভে পড়ে তাঁরা এই জাল অবাধে ব্যবহার করছেন। এতে জলাশয়গুলো মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। আর জলাশয়ে মাছ না থাকায় জেলেরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। তাই জেলেদের অনেকেই বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।এ অবস্থায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে অভিযানের পাশাপাশি উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ, কঠোর নজরদারি, জেলেদের সচেতনতা এবং নিষেধাজ্ঞাকালে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মৎস্য গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, চায়না দুয়ারি, কারেন্ট, বেহুন্দি, খুঁটা ও মশারি জালের মতো নিষিদ্ধ ও বিধ্বংসী জালের ব্যবহার শুধু মাছের পোনা ও মা-মাছ নিধন করছে না, এর ফলে পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।অবৈধ জাল, দখল-দূষণ, জলাভূমি ভরাট, নির্বিচারে মাছ আহরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশের জলজ বাস্তুতন্ত্র এখন গভীর সংকটে। বর্তমানে দেশের ৬৪ প্রজাতির মাছ বিভিন্ন মাত্রায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইইউসিএন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে চায়না দুয়ারি বা ‘মরণ জাল’। স্থানীয়ভাবে এটি চায়না জাল, রিং জাল কিংবা ম্যাজিক জাল নামেও পরিচিত। এর সূক্ষ্ম ফাঁসের কারণে মাছের পোনা থেকে বড় মাছ, কাঁকড়া, শামুক, ব্যাঙ, সাপ ও কচ্ছপসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী আটকা পড়ে।
চায়না দুয়ারি জালের নাম আইনে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী সাড়ে চার সেন্টিমিটার বা তার চেয়ে কম ফাঁসের জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ। এ ধরনের জাল মজুদ, আমদানি, বাজারজাত, পরিবহন, নিজের কাছে রাখা, প্রদর্শন কিংবা ব্যবহারও দণ্ডনীয়। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হলেও উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণনের উৎস পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মাদারীপুর জেলার শিবচর, রাজৈর, কালকিনি, ডাসার ও সদর; হবিগঞ্জের বানিয়াচং, লাখাই, আজমিরীগঞ্জ ও নবীগঞ্জ এবং কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ দেশের বহু এলাকায় বিভিন্ন নদ-নদীতে প্রকাশ্যেই এসব জাল ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
মাগুরার শালিখা উপজেলার ফটকি নদী থেকে সৃষ্ট একটি বিলে গবেষণার সময় দেখা গেছে, ৩০ থেকে ৪০ ফুট দীর্ঘ একটি চায়না দুয়ারি জালে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজি কাঁকড়া ও শামুক ধরা পড়ে। এর সঙ্গে আটকা পড়ে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী। মাছ ছাড়া অন্য প্রাণীগুলোর বড় অংশই জাল থেকে বের করে রাস্তা বা জলাশয়ের পাশে ফেলে দেওয়া হয়।
জেলেরা জানিয়েছেন, কম দাম, সহজলভ্যতা এবং কম পরিশ্রমে বেশি মাছ পাওয়ার কারণে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বাড়ছে। একটি চায়না দুয়ারি জালের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩০ থেকে ৮০ ফুট এবং উচ্চতা এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত হয়। আকার ও মানভেদে দাম দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বড় আকারের ‘মরণ জাল’ কিনতে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। পাঁচ-ছয় বছর আগে এই জাল চালু হওয়ার পর থেকে মাছ দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
জেলের জীবন-জীবিকা নিয়ে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘কোস্ট ফাউন্ডেশন’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, জীবিকার তাগিদে অনেকে কারেন্ট, মশারি, প্লাস্টিক, বিন্দি, ঠেলা ও খুঁটা জালসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার করেন। দেশের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ জেলে পরিবার নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করছে। আর এর কারণে নদী ও সাগরের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং মাছের উৎপাদন ও প্রজনন কমে যাওয়ার বিষয়ে ৯৩ শতাংশ জেলের স্বচ্ছ ধারণা নেই।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের গবেষণায় ভোলার ক্ষুদ্র জেলে পরিবারের সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। ভোলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৮১ হাজার জেলের পরিবার এখনো সরকারি সহায়তার বাইরে। মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞার সময় ৮৭ শতাংশ জেলে পরিবারের আয় একেবারেই কমে যায়। একজন জেলের মাসিক আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা থেকে প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ৮৭ শতাংশ পরিবার কোনো প্রশিক্ষণ বা আয়বর্ধক কর্মসূচির সুবিধা পায়নি। মাত্র ৫ শতাংশ পরিবার অন্য পেশায় যেতে পেরেছে। ৬৫ শতাংশ জেলে পরিবার ঋণ শোধ করতে আবার দাদনদারের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এমনকি এক পর্যায়ে কর্মহীন হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে অনেক পরিবার।
অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে বলে জানান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ জাল শুধু জব্দ ও ধ্বংস নয়, উৎপাদন, বাজারজাত ও সরবরাহের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাছের পোনা ও মা-মাছ রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে নজরদারি জোরদার করা হবে। প্রকৃত জেলেদের জীবিকা সুরক্ষা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।