সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

শিক্ষা আনন্দময় করতে প্রয়োজন মোটিভেশন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের খেলার ছলে শিক্ষাদানের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এটি কি আসলে নির্দেশের বিষয়? এটি অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা, ডেডিকেশন, মোটিভেশন, নিজ থেকে  আনন্দ পাওয়া আর গবেষণার বিষয়।সরকার থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলো, আর সবাই খেলার ছলে পড়াশোনা শেখানো শুরু করে দেবেন, বিষয়টি কি তাই? একজন শিক্ষক সেটি করতে পারেন, তিনি যখন এই পেশায়  প্রচুর সময় দিতে পারেন, প্রফেশনে নিজেকে ডেডিকেট করতে পারেন, নিজ আগ্রহে নতুন কিছু করার উদ্দীপনা তৈরি করতে পারেন। বিভিন্ন মেধার ও ক্যাটাগরির শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে একটি ক্লাসে। স্বাভাবিকভাবে তাদের পড়াতেই হিমশিম খেতে হয় শিক্ষককে, সেখানে নির্দেশ পেলেই আনন্দে পড়াশোনা শুরু করে দেওয়ার মতো কতজন শিক্ষক আছেন, সেটিও আমাদের দেখতে হবে।

 

আওয়ামী সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, কারিকুলাম পরিবর্তনের নামে, আর আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষার নামে সব স্কুলে রান্নার আয়োজন আর শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে মাঠে নাচানাচি আর গান গাওয়া চলেছে।দুই বছর শিক্ষকরা বুঝতে পারছিলেন না, তাঁদের কী করতে হবে। তাঁদের শুধু বলা হয়েছিল, লেখাপড়া হবে আনন্দের মাধ্যমে, চাপের মধ্যে নয়। তাই যিনি যেভাবে বিষয়টিকে বুঝেছেন, তিনি সেভাবেই দুটি বছর কাটিয়েছেন। একটি শ্রেণিকক্ষকে আনন্দময় করে তোলা  কি কোনো সাধারণ শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব?

 

শিক্ষা আনন্দময় করতে প্রয়োজন মোটিভেশনশিক্ষার্থীদের সময়মতো বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়া রোধে ছবি আঁকা, মাটির কাজ ও বিভিন্ন উপকরণ তৈরির মাধ্যমে ‘খেলার ছলে শেখা’ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।নির্দেশনায় বলা হয়, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বা আনন্দময় শিক্ষা’ কর্মসূচির আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রণীত প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির চারু ও কারুকলা বিষয়ে শিক্ষক সহায়িকা রয়েছে। এসব সহায়িকার আলোকে শ্রেণিভিত্তিক বিভিন্ন ছবি আঁকতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ তৈরি করাতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের তৈরি শিল্পকর্ম শ্রেণিকক্ষে প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করতে হবে, যাতে তারা উৎসাহিত ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, বিভাগীয় উপপরিচালক, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।এগুলো অনেকটা সমর্থনযোগ্য কাজ, কারণ স্পেসিফিক কিছু কাছ শিক্ষকদের করতে বলা হয়েছে।

 

শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিউরিসিটি বা অনুসন্ধানের ইচ্ছা কিন্তু একটি বড় মোটিভেশন, যেটি আমরা সুগাতা মিত্রের গবেষণা থেকে পাই। যাঁর গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে ‘মিনিম্যালি ইনভ্যাসিভ লার্নিং’। তিনি দিল্লির একটি বস্তির মুখে একটি দেয়ালের গর্তে একটি কম্পিউটার রেখে দিয়েছিলেন। সেটির সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল, কিন্তু ছিল না কোনো শিক্ষক। একটি গোপন ক্যামেরা ফিট করে রেখেছিলেন দেখার জন্য যে শিশুরা কী করে। শিশুরা নিজেরা নিজেরা এলোমেলো চালাচালি করে কম্পিউটার খোলা-বন্ধ, ইন্টারনেট সংযোগ ঘটানো এবং সেই সঙ্গে বিভিন্ন কিছু দেখা নিজেরা নিজেরাই শিখেছিল। ঘটনাটি ২০০০ সালের। শিশুদের আগ্রহ, কিউরিসিটি এবং নিজেরা নিজেরা সময় ব্যয় করে কোনো ধরনের শিক্ষক ছাড়াই শিখেছিল কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবহার। তারা কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশের এবং নেট চালাতে যেসব আইকন পর্দায় ভেসে উঠেছিল, সেগুলোর নাম নিজেরাই দিয়েছিল। কোনটাকে বলছে সুই, কোনটাকে ইঁদুর ইত্যাদি। এই মডেল তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বস্তিতে এবং পিছিয়ে পড়া এলাকায় সেট করে একই ফল পেয়েছেন।

আমাদের সরকার ক্লাসরুমে কম্পিউটার দিয়েছে, শিক্ষক আছে কিন্তু শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার শিখছে না। এখানে কয়েকটি বিষয় জড়িত। সুগাতা মিত্রের গবেষণাটি একটি প্রকৃত গবেষণার উদাহরণ। আমাদের শিক্ষকদের গবেষণার ফান্ড নেই, তাই গবেষণা করেন না! তাঁদের গবেষণা সব কাগজ-কলমভিত্তিক, বাস্তবে তেমন কোনো কাজ নেই—সবই কাগজপত্রে লেখা। দ্বিতীয় হচ্ছে, এসব গবেষক এবং অনেক কলামিস্টের শিক্ষাবিষয়ক লেখাও দেখি। তাঁরা সবাই শুধু সরকারকে এটি করতে হবে, সেটি করতে হবে—এ ধরনের  সাজেশন দেন। ভাবখানা এমন যে, সরকারে যাঁরা আছেন, তাঁরা এগুলো কিছুই বোঝেন না!

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জিপিএর পেছনে ছুটছে, কারণ জিপিএ দিয়েই তাদের মেধা যাচাই হচ্ছে, জিপিএ দিয়েই সামাজিক বিচার, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, চাকরি ইত্যাদি সবকিছুতেই, অর্থাৎ বাস্তবজীবনের সবকিছুই নির্ধারিত হচ্ছে জিপিএ ৫ দিয়ে। তাই শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দোষ দিয়ে লাভ কি? রাষ্ট্র যদি এমন জিপিএ পাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে পারে যে, জিপিএ ৫ পাওয়া মানে তাকে নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন নয়। সলিড নম্বর, সলিড জিপিএ, জিপিএ প্রাপ্তির দ্বারাই যেন বোঝা যায় একজন শিক্ষার্থী কতটা মানবিক, কতটা সৃজনশীল, কতটা উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন ও কতটা ইনোভেটিভ। আমাদের পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে এসবের কোনো সংযোগ নেই, মিল নেই। সেই সংযোগটি কিভাবে করতে হবে, আমাদের সেই পথ বাতলে দিতে হবে। শুধু ওপরে ওপরে সাজেশন দিলে হবে না। সীমিত  সম্পদ, হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যে যদি কার্যকরীভাবে নতুন কিছু কেউ করে দেখাতে পারেন, সেটিই হচ্ছে প্রকৃত ইনোভেশন, সেখানেই শিক্ষার্থীরা আনন্দ পাবে। সুগাতা মিত্র কিন্তু সরকারকে বলেননি যে, এই বস্তিতে এক শ কম্পিউটার দিতে হবে, একটি কম্পিউটার ল্যাব বানাতে হবে, পাঁচজন টেকনিশিয়ান দিতে হবে, দুজন ট্রেনার থাকতে হবে, তবেই না  বস্তির শিশুরা কম্পিউটার ও নেট চালানো শিখতে পারবে, যেটি তাদের নিজেদের এবং রাষ্ট্রের কাজে লাগবে।

সবাই আশা করছেন শিক্ষাকে আনন্দময় করবে সরকার। সরকার তাই নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে শিক্ষা আনন্দময় করতে হবে। শিক্ষাকে আনন্দময় করার সব উপাদান বা অনুষঙ্গই যে আমাদের হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত এবং এটি একটি বাস্তবতা, সেদিকে আমরা কেউ খেয়াল করছি না। একজন লেখক তাঁর কলামে লিখেছেন, ‘শ্রেণিকক্ষকে আনন্দময় করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষকদের শুধু পাঠ্যবই শেষ করার দায়িত্ব দিলে হবে না, তাঁকে হতে হবে অনুপ্রেরণার কারিগর। ইন্টারেক্টিভ পেডাগজি, দলভিত্তিক কাজ, গল্পভিত্তিক শিক্ষা, খেলাভিত্তিক শেখা, নাটক, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠকে যুক্ত করতে হবে।’

শিক্ষকদের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন সূত্র থেকে শিক্ষার বিভিন্ন টেকনিক জেনে নেওয়া। শিক্ষাবিষয়ক লেখাগুলো নিয়মিত পড়া, শিক্ষাবিষয়ক জার্নাল পড়া, নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজ শিক্ষার্থীদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এগুলোই এক ধরনের আনন্দ। আমরা যদি শিক্ষকদের এ ধরনের মোটিমেশন দিতে পারি, তাহলে কাজ কিছুট হয়তো হবে। শিক্ষার্থীরা না পড়ে পড়ে, কোনো ধরনের কাজ না করে করে প্রতিটি বিষয় থেকে তারা অনেক দূরে অবস্থান করছে। সেই অবস্থায় পড়াশোনায় তাদের কোনো আনন্দ নেই। যাঁরা পড়াচ্ছেন, তাঁদের কাছে একটি শ্রেণিতে ক্লাস নেওয়া মানে পাহাড়সম সমস্যার মতো, কারণ শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই বোঝে না, বুঝতে চায় না— তাদের সংখ্যাই বেশি। দেশের তথাকথিত নামকরা দুই-চারটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে, সেগুলোতে ধরে বেধে পড়ানো হচ্ছে, মুখস্থ করানো হচ্ছে, বিষের মতো পড়া গেলানো হচ্ছে, যা শিক্ষার কোনো বিজ্ঞানে পড়ে না! বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব করা ছাড়া তাদের কোনো উপায়ও নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত কিছু একটা করছে। বাকিগুলোর অবস্থা করুণ। এই বাস্তবতায় আমরা কেউ কেউ শুধু সারমন দিয়ে যাচ্ছি, উপদেশ দিয়ে যাচ্ছি বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে আনন্দময় পড়ার কোনো বিকল্প নেই। কে বাস্তবায়ন করবে? কিভাবে করবে?

সবাই শুধু অপেক্ষায় থাকে শিক্ষকদের বিশাল প্রশিক্ষণ হবে, আর সব পরিবর্তন হয়ে যাবে। যে পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণগুলো হয় দেশে, তাতে শ্রেণিকক্ষের কোনো পরিবর্তন হয় না। শুধু টাকা ছিটানো ছাড়া খুব একটা লাভ হয় না অন্তত শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষার। যেসব শিক্ষক নিজেদের প্রচেষ্টায় অনেক কিছু জানার চেষ্টা করেন, জানেন এবং নিজ শিক্ষার্থীদের ওপর সেগুলো প্রয়োগ করেন, তাঁরাই প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারেন। এমন কিছুসংখ্যক শিক্ষক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আছেন যাঁরা নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আমাদের জানাচ্ছেন যে, তাঁরা এভাবে ক্লাসে করছেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে কী কী পরিবর্তন আসছে, আসতেছে ইত্যাদি। এটিই প্রকৃত কাজ। প্রশিক্ষণে গিয়ে নিজের কিছু অর্থপ্রাপ্তি ঘটে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে তেমন কিছু ঘটে না।

লেখক:  শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবংপ্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com