সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

মহিমার ঘুরে দাঁড়ানো

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৩২ বার পড়া হয়েছে

সারাদেশে যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারের পাশাপাশি নারীর সাইবার বুলিং ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, ঠিক তখন ভোলার সদর উপজেলায় এক অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মহিমা বেগম। সমাজের চেনা পুরুষতান্ত্রিক ছক ভেঙে ‘মোবাইল সার্ভিসিং’-এর মতো একটি পেশা বেছে নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রান্তিক নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার এক অনন্য উদাহরণ।
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল পরিসরে নারীর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হলো ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্যের গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী নারী ও কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হন। এ বিপত্তির শুরুটা অনেক ক্ষেত্রেই হয় স্মার্টফোন মেরামত করতে গিয়ে।

ইলেকট্রনিক্স বা গ্যাজেট মেরামতের বাজার সাধারণত পুরুষপ্রধান। ফলে কোনো নারী যখন তাঁর নষ্ট ফোনটি সারাতে নিয়ে যান, তখন মেকানিককে ফোনের লক বা পাসওয়ার্ড দিতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। মেকানিকের হাত ঘুরে ব্যক্তিগত ছবি বা ডেটা ‘পাবলিক’ হয়ে যাওয়ার ভয় তাদের তাড়া করে ফেরে। ঠিক এ সংকটজনক জায়গাতেই ভোলার নারীদের কাছে এখন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ঠিকানা হয়ে উঠেছেন নারী মোবাইল মেকানিক মহিমা বেগম। ফোন সচল করার পাশাপাশি তিনি নিশ্চিত করছেন নারীর ব্যক্তিগত তথ্যের শতভাগ গোপনীয়তা। মহিমার ভাষায়, ‘ইলেকট্রনিক্স বাজারে এসে নারীরা যখন আমার ওপর আস্থা রাখেন, তখন সেই বিশ্বাসটুকু রক্ষা করতে পারাটাই আমার বড় প্রাপ্তি। স্থানীয় মেয়েদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষায় পাশে থাকতে পেরে আমার মধ্যে একটা অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে।’

ভোলার ধনিয়া ইউনিয়নের চেউয়াখালী গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্ম মহিমার। পাঁচ বোন ও দুই ভাইয়ের বড় পরিবারে ২০২০ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। করোনাকালে পারিবারিক সংকটে থমকে যায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা। মহিমার স্বপ্ন ছিল স্বাবলম্বী হওয়ার। তিনি সেলাই ও বিউটি পার্লারের কাজ শিখলেও তাতে আশানুরূপ সাফল্য পাননি। এমনকি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করতে গিয়েও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পশ্চাৎপদতা আর উপহাস পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাতে দমে যাননি তিনি।
মহিমা জানান, অনেকের কাছ থেকেই তাঁকে হতাশাজনক কথা শুনতে হয়েছে। তিনি সেগুলো কানে তোলেননি। মহিমার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে এবং গ্রামীণ জনউন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত ‘আরএআইএসই’ বা ‘রেইস’ প্রকল্প। পাশের বাড়িতে উঠান বৈঠকের কথা শুনে সেখানে যান তিনি। এখানেই প্রথম বিনামূল্যে কারিগরি প্রশিক্ষণের খোঁজ পান। মোবাইল টেকনিশিয়ান হওয়ার কথাও তখনই তাঁর মাথায় আসে। ছয় মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পাঁচ দিনের ‘জীবন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ’ মহিমার ভেতরের সুপ্ত আত্মবিশ্বাস অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। এতে তিনি জয় করেন মানসিক বাধা ও সামাজিক চাপ।

মহিমার একাগ্রতা ও কাজের দক্ষতার কারণে তাঁর ওস্তাদ আব্দুস সাত্তার নিজে যে দোকানের হেড টেকনিশিয়ান, সেখানেই তাঁর কাজের ব্যবস্থা করেন। দোকানের মালিক আক্তার হোসেনও উচ্ছ্বসিত। মহিমার কারণেই ভোলা শহরের ‘আক্তার টেলিকম’ নারীর কাছে একটি আস্থাশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
স্মার্টফোন মেরামত করে বর্তমানে মাসে তাঁর গড় আয় প্রায় ১৭ হাজার টাকা। তবে মহিমার স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। ভবিষ্যতের কথা বলতে গিয়ে তাঁর চোখেমুখে ফুটে ওঠে দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন, আমি নিজে একটি বড় মোবাইল ফোন সার্ভিসিং সেন্টার দেব। সেখানে আমার মতো অসংখ্য নারীকে কাজ শিখিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলব।’
মহিমা বেগম নিজেকে কেবল একজন সফল মেকানিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেননি, তিনি হয়ে উঠেছেন পরিবর্তনের অনুঘটকও। নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিকোণ থেকে মহিমার এই মডেলটি বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শুধু আইন দিয়ে সাইবার স্পেস নিরাপদ করা সম্ভব নয়। মহিমার মতো প্রান্তিক নারীদের যদি প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় উৎসাহিত করা যায়, তবে নারীর জন্য সাইবার জগৎ বহুগুণ নিরাপদ হয়ে উঠবে। এমন সফল ও টেকসই মডেল যদি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে তৃণমূলের নারীর সাইবার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা হাত ধরাধরি করে চলবে; যা হতে পারে এক উন্নত ও সুরক্ষিত ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তি।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com