সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

‘মানুষের বিজয় আঁকতে চেয়েছি’

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে যে কজন জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পী রয়েছেন এ মুহূর্তে, শিল্পী ও মানুষ হিসেবে যাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে এ দেশের ইতিহাস বিজড়িত, তাদের অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী। গত বছর ডিসেম্বরের তাঁর বাড়িতে কিছু সময়ের আলাপের উঠে আসে মহান মুক্তিযুদ্ধ, তাঁর ছবি আঁকা, লেখার প্রেরণা ও সাধনার নানান দিক। কথা বলেছেন হামিম কামাল

ঢাকার শেওড়াপাড়ায় তাঁর বাড়িটি নান্দনিক সবুজ। দরজা থেকে ছোট সিঁড়ি পর্যন্ত মাটি পেরিয়ে হেঁটে যেতে হয়। চারদিকে পা ফেলার মতো এমন মাটি ঢাকা শহরে দুর্লভ। বসার ঘরটি সুপরিসর, চারদিকের দেয়ালে তাঁর নিজের আঁকা ছবি শোভা পাচ্ছিল। ছবি সময় পরিভ্রামকের কাজ করে। কিছু ছবি ষাটের দশকের আঁকা, কিছু সম্প্রতি। কোনোটা ঢাকায় আঁকা, কোনোটা সুদূরে, পাহাড়ে। ছবি ছাড়াও ঘরে রয়েছে দৃষ্টিশোভন সব স্মৃতিস্মারক, ও শিল্প-সাহিত্যের বইপত্র। বড় আরামকেদারা বিশেষ একটি কোণে শিল্পী খানিকটা শরীর এলিয়ে বসেন সাধারণত, আজও বসলেন। অধ্যাপক রফিকুন নবী সবচেয়ে সরল-সুন্দর শব্দগুলো বেছে নিয়ে কথা বলেন। এ লেখায় তাঁর ক্ষুদ্র একটি সাক্ষাৎকার যুক্ত করব, সেখানে সেই ভালো লাগার সবটা সন্তোষ জাগানোর মতো ধরতে পারিনি, তবু আঁচ করা যায়। সময়টা যেহেতু ছিল ডিসেম্বর, মহান মুক্তিযুদ্ধ, তার বিজয়গাথা এবং বিজয়ের সঙ্গে অবধারিত শোকস্মৃতি ছিল আলাপের উপজীব্য। তবে এক ফাঁকে বিজয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে আঁকা ছবি, স্থাপত্যশিল্প, তাঁর সার্বিক ছবি-ভাবনার জগতের খানিকটা প্রকাশ হওয়ার মতো কিছু কথাও ঘরের নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমরা আদান-প্রদান করেছি। সেখান থেকে খেরোখাতার জন্য প্রাসঙ্গিক আলাপটুকু পত্রস্থ করছি।
মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগ প্রসঙ্গে বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে আলাপ চলছিল। রফিকুন নবীর যাদের সঙ্গে ওঠবোস, তাদের একটি বড় অংশকে তিনি, সেই সঙ্গে গোটা জাতি চিরতরে হারিয়েছে।  ইতিহাসের সলতে খাটো করে আলো খানিক কমিয়ে একসময় আলাপ শিল্প ও শিল্পীর রহস্যময় ভুবনের দিকে পথ কেটে নিয়ে এলাম।
২
মুক্তিযুদ্ধের পর ছবি আঁকার বিষয়বস্তুতে বেশ পরিবর্তন আসে আপনার। রঙের ব্যবহার, মুখাকৃতি প্রভৃতিতেও পরিবর্তন আসে। বিশেষ কোনো ভাবনা কি তখন মনে আকার পেয়েছিল?
বিশেষ কোনো ভাবনা থেকে পরিবর্তনগুলো আসেনি। এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে এসেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম। ছবিতে ও ভাষায় মানুষের বিজয় ধরতে চেয়েছি।  বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা আঁকায় জোর দিয়েছিলাম। শুধু আমি নই, তখনকার প্রায় সকল শিল্পীই স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ছবি এঁকেছেন। আমি তাদের একজন মাত্র। সময়-অসময়ে কাজ করার চর্চাটা তখন তৈরি হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মুহূর্তগুলো বেশি মূর্ত আপনার ছবিতে। শোকের আবহও তো মনে গভীরভাবে কাজ করেছে। আমি বধ্যভূমিগুলোয় আপনার গভীর, মন বিষণ্ন করা কাজ দেখেছি।
১৩ ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে কাজ আছে, মিরপুরের জল্লাদখানায় আমার কাজ আছে। জল্লাদখানার প্রক্রিয়াটি আরেক রকম ছিল। আমি ভাস্কর নই, কিন্তু আর্ট ফর্ম নিয়ে সহজাত ধারণা তো রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর যখন জায়গাটি সংস্কার করল, তখন মুফিদুল হক, তারেক আলী– তাদের মনে হলো এখানে একটা ম্যুরাল করা যায়। স্থপতি রবিউল হোসেন জায়গা রাখলেন। আমাকে ধরলেন তারা। আমি একদিন দেখতে গেলাম। ইতিহাসটা জানলাম। সেখানে একটা কুয়া আছে, একটা পাটাতন আছে যেখানে গলায় ছুরি দেওয়া হতো। তখনই একটা ড্রয়িং করলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল, সংস্কার করার জন্য যে ইট এনেছিল সেখানে বাতিল ইট ঝামা পড়ে আছে স্তূপ হয়ে। মনে হলো এই ঝামা ইটগুলোর আকৃতি, ধরন যা করতে চাইছি তার পক্ষে বেশ উপযুক্ত। পরে সেগুলোকে গাঁথুনি দিয়ে শহীদদের দৈহিক আকৃতি আধা-বিমূর্ত করে তৈরি করি। রংপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবনে যে ম্যুরাল আছে, সেটার কথাও মনে পড়ে। সেটা আমার করা সবচেয়ে বড় ম্যুরাল। সেটা উত্তরবঙ্গকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে কোন রং সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন, কেন?
এটা বলা কঠিন। তবে লাল রং বেশি এসেছে। এরপর সবুজ। এবং তা পতাকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। আর ড্রয়িংয়ের জন্য কালো। কালো তো অনেক কিছুই ফুটিয়ে তোলে। লাল, সবুজ, নীল, কালো। আমার মনোভাব অভিব্যক্তি প্রকাশে মূলত এই চারটি রং বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে হয়।
আপনার নীলের প্রতি বিশেষ কোনো দৃষ্টিভঙ্গি বা দুর্বলতা আছে কি?
হ্যাঁ, নীল তো একটা সুন্দর রং। আবার হরেক রকম নীল রয়েছে। আমি বেশি ব্যবহার করি ফ্রেঞ্চ আলট্রা মেরিন। এর সঙ্গে কোবাল্ট, টার্কিশ ব্লু। এগুলো মিশিয়ে নিয়ে আবার অন্য একটা নীল তৈরি হয়। সেগুলো নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। নীলের প্রতি একটা দুর্বলতার কারণ, ছবিতে নীল রং বিস্তৃতি, ভাস্টনেস নিয়ে আসে। এই বিস্তৃতি তৈরি করতে ভালো লাগে। তাই বলে যে সবসময় নীলই ব্যবহার করি তা কিন্তু নয়। অন্য রঙেও কাজ করি, তবে নীলটা প্রাধান্য পায়।

আলাপ কিন্তু এরপর বেশ শিথিল দিকে মোড় নেয়, তবে ভাবার কোনো কারণ নেই আলাপের আর কোনো লক্ষ্য ছিল না। জানতে চেয়েছিলাম, মনোজগতের কোন রহস্যময় শক্তি কোনো একটি শিল্পকে ‘শুরু’ করিয়ে দেয়। এরপর ‘শেষ’ করিয়ে ছাড়ে। এ কথা তো একজন সফল শিল্পীর কাছ থেকে জেনে নেওয়া ও লোককে জানিয়ে দেওয়া দায়িত্বের ভেতর পড়ে। ‘কহতব্য’, রফিকুন নবী একই সঙ্গে একজন কথাসাহিত্যিক তথা ভাষার শিল্পী। আত্মজীবনী, উপন্যাসে তাঁর স্মরণীয় কাজ রয়েছে। যেমন– ‘স্মৃতির পথরেখায়’, ‘টেরোডাকটাইল’। লেখাতেও তাঁর মানুষসত্তার বিজয় উদযাপিত। যেসব শিল্পী একাধিক পথের পথিক, তাদের সামগ্রিক পথচলায় উভয় পথেরই সম্মিলিত দীক্ষা ভূমিকা রাখে। রফিকুন নবীর ছবির প্রবণতা ও লক্ষ্য পুরো বোঝা যাবে না যদি তাঁর সাহিত্য অপঠিত থাকে। তাঁর সাহিত্যকেও পুরো বুঝতে হলে তাঁর ছবির অন্দরে প্রবেশ করতে হবে।
বোঝপড়ার দুরূহ গভীরে যেতে চাইনি। ছাদ থেকে মেঝে অব্দি একটা মাপকাঠির নামা জানালার ওপারে তখন একটা স্বপ্ন স্বপ্ন আলো। নদীর মতো নেমে আসা পর্দা যখন সরছে, সেই রহস্যময় আলো চোখে পড়ছে, চোখে পড়ছে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো গাছপালা। বাইরের সেই আলোয় একটা চড়ুই উড়ে গেল। শিল্পী বলছিলেন, তিনি যখন কোনো ছবি শুরু করবেন বলে মনে করেন, তখন চারপাশ থেকে একটা কোনো ইঙ্গিত গ্রহণ করেন। সেই ইঙ্গিত থেকে হয়তো একটা রেখা টানেন। এরপর সেই রেখাই বলে দেয় পরের রেখার সংস্থান। ধীরে ধীরে একটা গতি জড়তা তৈরি হয়। এবং রেখার পর রেখা আঁকা হতে থাকে। পথই যেভাবে পথিককে পথের সন্ধান দেয়, তেমনি রেখাও শিল্পীকে আকৃতি, প্রতিকৃতির সন্ধান দিতে থাকে। প্রকৃতি থেকে সেই ইঙ্গিত ও ইশারা সঞ্চয় করাই প্রথম কাজ। পরিকল্পনা? বেশির ভাগই শুরুর পর আপনাতে আসে। আর কখন বোঝা যায় ছবি শেষ? না, এই প্রশ্নের উত্তরকে ঠিক ভাষায় ধরা যায় না। ছবিও যে সাহিত্য! কখনও সে আপনাতেই থামে। কখনও তার রাশ টানা হয়। থামিয়ে দেওয়া হয়। তবে অতিবড় কিংবদন্তিও সব ছবিতে, সব লেখায় মনমতো রাশ টানতে পারেন না। এর অনুশোচনা পাঠক বা দর্শকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় না। একাই পুড়তে হয়।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com