ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বজুড়ে আবেগের এক বিশাল বিস্ফোরণ, কোটি হৃদয়ের স্পন্দন আর উন্মাদনার চূড়ান্ত রূপ। এই সীমাহীন উন্মাদনার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি সোনালি ট্রফি। সবুজগালিচায় ঘাম ও রক্ত ঝরিয়ে এ ট্রফিটি একবার উঁচিয়ে ধরা বিশ্বের প্রত্যেক ফুটবলারের আজীবনের আরাধ্য স্বপ্ন। তবে বর্তমানে আমরা পর্দার সামনে যে ঝলমলে ট্রফিটি দেখি, তার পেছনের ইতিহাস হার মানাবে যে কোনো শ্বাসরুদ্ধকর রহস্য উপন্যাস বা রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্রকেও।
১৯৩০ সালে সুদূর উরুগুয়েতে যখন প্রথম বিশ্বকাপের পর্দা ওঠে, তখন এই আরাধ্য মুকুটের নাম ছিল ‘ভিক্টরি’ বা বিজয়ের ট্রফি। পরে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমের অসামান্য অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে এর নামকরণ হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লেউরের নিপুণ হাতে গড়া এই ট্রফিতে খোদিত ছিল গ্রিক বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’-এর অপরূপ অবয়ব। সোনালি প্রলেপযুক্ত খাঁটি রুপা এবং মূল্যবান নীল রঙের ল্যাপিস লাজুলি পাথরের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো ট্রফিটির উচ্চতা ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার; আর ওজন প্রায় পৌনে ৪ কিলোগ্রাম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামায় এ মহামূল্যবান স্মারকটি প্রচণ্ড হুমকির মুখে পড়েছিল। আগ্রাসী নাৎসি বাহিনীর লুণ্ঠন থেকে বাঁচাতে তৎকালীন ইতালীয় ফুটবল কর্তা ওত্তোরিনো বারাসসি এক অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি ১৯৩৯ সালে রোমের একটি ব্যাংকের সিন্দুক থেকে ট্রফিটি গোপনে সরিয়ে নিজের বাড়ির বিছানার নিচে একটি জীর্ণ জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখেন। তাঁর এই অসামান্য উপস্থিত বুদ্ধির ফলেই বিশ্বযুদ্ধের নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটতরাজ থেকে রক্ষা পায় ফুটবলের প্রথম সোনালি ইতিহাস।
তবে ১৯৬৬ সালে আধুনিক ফুটবলের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপের মাত্র চার মাস আগে ঘটে এক বিপত্তি। লন্ডনের একটি সুরক্ষিত প্রদর্শনী কেন্দ্র থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। চারদিকে যখন তোলপাড়, পুলিশের ঘুম হারাম এবং চোররা মুক্তিপণ দাবি করে বসেছে, ঠিক এক সপ্তাহ পর ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। ডেভিড করবেট নামের এক ব্যক্তি তাঁর ‘পিকলস’ নামের কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হলে, পিকলসের প্রখর ঘ্রাণশক্তির জোরেই দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঝোপের নিচ থেকে উদ্ধার হয় কাগজে মোড়ানো বিশ্বকাপ! এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পর রাতারাতি তারকা বনে যায় পিকলস। জাতীয় সারমেয় প্রতিরক্ষা সংঘ থেকে পদক জয়ের পাশাপাশি সে পায় আজীবন বিনামূল্যে খাবারের সুযোগ এবং ইংল্যান্ড দলের রাজকীয় বিজয় উৎসবে অংশগ্রহণের বিরল সম্মান।
নিয়ম অনুযায়ী, ১৯৭০ সালে পেলে-জাদুতে তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়ে জুলে রিমে ট্রফিটি চিরতরে নিজেদের করে নেয় ব্রাজিল। লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল তীর্থের আনন্দ বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮৩ সালের শেষদিকে ব্রাজিলের ফুটবল সদরদপ্তরের দুর্ভেদ্য কাচ ভেঙে ট্রফিটি আবারও চুরি হয়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, তদন্তে জানা যায় চোররা এই ঐতিহাসিক ট্রফিটি গলিয়ে সোনার বার বানিয়ে ফেলেছিল। ফুটবলের সেই আদি মুকুটটি আর কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০১৫ সালে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদরদপ্তরের ভূগর্ভস্থ কক্ষ থেকে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে ট্রফিটির ১৯৩০ সালের পুরোনো পাথরের ভিত্তিটুকু উদ্ধার করা হয়; যা আজ সেই সোনালি অতীতের একমাত্র নীরব সাক্ষী।
জুলে রিমে চিরতরে হাতছাড়া হওয়ার পর ১৯৭৪ সাল থেকে চালু হয় বর্তমান নকশার বিশ্বকাপ। একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ৫২টি নকশাকে পেছনে ফেলে ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার তৈরি করা ট্রফিটি নির্বাচন করা হয়। ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এবং ম্যালাকাইট পাথরের দুটি সবুজ বলয়যুক্ত এই ট্রফিতে দেখা যায়, দুজন মানবমূর্তি পরম উল্লাসে দুই হাতে পৃথিবীকে তুলে ধরেছে। এর উচ্চতা সাড়ে ৩৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ কিলোগ্রামের সামান্য বেশি। মজার ব্যাপার হলো, এটি ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ফাঁকা। ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের মতে, পুরোটাই নিরেট সোনার হলে এর ওজন দাঁড়াত প্রায় ৭০-৮০ কিলোগ্রাম, যা দীর্ঘক্ষণ স্নায়ুক্ষয়ী খেলার পর কোনো ক্লান্ত খেলোয়াড়ের পক্ষে উঁচিয়ে ধরা একেবারেই অসম্ভব হতো।
১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই বিশ্বমঞ্চের ২২টি আসরে এ পর্যন্ত মাত্র আটটি দেশ শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছে। সর্বোচ্চ পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাজিল। এরপর জার্মানি ও ইতালি চারবার, বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তিনবার, ফ্রান্স ও উরুগুয়ে দুবার এবং ইংল্যান্ড ও স্পেন একবার করে এই মুকুট জয় করেছে। বিজয়ী দেশগুলোর নাম ট্রফির নিচের অংশে তাদের মাতৃভাষায় খোদাই করা থাকে। তবে এখানে ঘনিয়ে আসছে এক নতুন সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩৮ বা ২০৪২ সালের পর এই ট্রফিতে নতুন কোনো চ্যাম্পিয়নের নাম লেখার জায়গা আর অবশিষ্ট থাকবে না। তখন হয়তো এর ভিত্তি প্রসারিত করতে হবে অথবা সম্পূর্ণ নতুন ট্রফির কথা ভাবতে হবে।