ফিফা বিশ্বকাপে গতকাল সকালে দলটি দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে গিয়েও ২-১ ব্যবধানে হেরে গেছে। হেরে যাওয়া এই দলকে কয়েক বছর আগে সবাই চেক প্রজাতন্ত্র (চেক রিপাবলিক) নামেই চিনত।
ফিফা বিশ্বকাপে গতকাল সকালে দলটি দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে গিয়েও ২-১ ব্যবধানে হেরে গেছে। হেরে যাওয়া এই দলকে কয়েক বছর আগে সবাই চেক প্রজাতন্ত্র (চেক রিপাবলিক) নামেই চিনত।
তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, মধ্য ইউরোপের এই দেশের আসল নাম কোনটি? উত্তর চেক প্রজাতন্ত্র এবং চেকিয়া, দুটি নামই সঠিক। তবে এদের ব্যবহার ও ইতিহাস ভিন্ন। এখন প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের দুটি নাম কেন? এ জন্য ফিরে যেতে হবে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসে।
কয়েক দশক একসঙ্গে থাকার পর ১৯৯৩
সালের ১ জানুয়ারি শান্তিপূর্ণভাবে চেক ও স্লোভাক জনগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া নামে দুটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে।
কেন এই দ্বৈত নাম? : আন্তর্জাতিকভাবে বেশির ভাগ দেশের দুটি নাম থাকে—একটি দাপ্তরিক, সাংবিধানিক বা দীর্ঘ নাম, আরেকটি ভৌগোলিক বা সংক্ষিপ্ত নাম। যেমন—বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। জার্মানির আনুষ্ঠানিক নাম ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি। এ ধরনের সংক্ষিপ্ত নাম আমরা প্রতিনিয়ত বলে থাকি।
বছরের পর বছর ধরে দেশটির নীতিনির্ধারকরা অনুভব করছিলেন যে বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং বা খেলাধুলার মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টে চেক প্রজাতন্ত্র নামটি দীর্ঘ ও খাপছাড়া মনে হয়। এর সমাধান হিসেবে তাঁরা চেকিয়া নামকরণের প্রস্তাব দেন।
২০১৬ সালে দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘে চেকিয়াকে তাদের সংক্ষিপ্ত নাম হিসেবে নিবন্ধিত করে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ ভৌগোলিক নামের তথ্যভাণ্ডারে চেকিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেশটিতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এমনকি চেক প্রবাসীরাও প্রতিবাদ জানায়। অনেকে তখন দাবি করে, চেকিয়া নামটি শ্রুতিমধুর নয়।
তবে বিপরীত পক্ষ দাবি করে, বহির্বিশ্বে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিচয় সহজ করার জন্য সংক্ষিপ্ত নাম থাকা অপরিহার্য। যৌক্তিক দাবি হিসেবে তারা সামনে আনে একসময় একত্র হয়ে থাকা স্লোভাকিয়াকে। স্লোভাকদের দেশ স্লোভাকিয়া আর চেকদের দেশ চেকিয়া।
তবু দেশটির সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে অনেক রাজনীতিবিদ চেকিয়া নাম গ্রহণ করতে অনীহা দেখান। আপত্তির কারণ হিসেবে সামনে আনা হয় কয়েকটি বিষয়—প্রায় ২৩ বছর ধরে মানুষ চেক প্রজাতন্ত্র নামটির সঙ্গে পরিচিত ছিল। হঠাৎ চেকিয়া নামের ব্যবহার অনেকের কাছে অস্বাভাবিক লাগতে পারে। যেমনটা আজ ফুটবলপ্রেমীদের মনে হয়েছে।
ইংরেজি ভাষাভাষীর অনেকে চেকিয়ার উচ্চারণ নিয়ে অনিশ্চিত ছিল। কেউ চেচিয়া, কেউ চেজিয়া, আবার কেউ অন্যভাবে উচ্চারণ করত।
অনেকের ধারণা ছিল, চেক প্রজাতন্ত্র নামটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। নতুন নাম চেকিয়া ব্যবহার করলেই বরং আন্তর্জাতিক পরিচিতি দুর্বল হতে পারে।
এত দ্বিধা সৃষ্টি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দুটিকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দাপ্তরিক নাম চেক প্রজাতন্ত্র, সংক্ষিপ্ত নাম চেকিয়া। ঐতিহাসিকভাবে দেশটি বোহেমিয়া নামেও পরিচিত।
তবে রাষ্ট্রীয় নথিপত্র, আইনি দলিল, চুক্তি বা পাসপোর্টে এখনো পূর্ণাঙ্গ নাম চেক প্রজাতন্ত্র ব্যবহার করা হয়। খেলাধুলার ক্ষেত্রে একটি দেশের সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করাই আন্তর্জাতিক রীতি। তাই কয়েক বছর ধরে চেকিয়া নামটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
মজার ব্যাপার হলো, এই নামকরণ করার পর দেশটি এবারই প্রথম ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলছে। তাই অনেকে গতকাল স্কোরলাইনে চেক প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে চেকিয়া দেখে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল। চেক প্রজাতন্ত্র নাম থাকতে দেশটি একবারই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে, ২০০৬ সালে।
তবে চেক ও স্লোভাকরা একত্র হয়ে চেকোস্লোভাকিয়া থাকা অবস্থায় তারা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছে ১৯৩৪ ও ১৯৬২ সালে। দুবারই রানার্স আপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।