সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১৮ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ইতিহাস ঐতিহ্যের স্কটল্যান্ড ভ্রমণ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

স্কটল্যান্ড- নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজ পাহাড়, প্রাচীন দুর্গ, কুয়াশা ঢাকা উপত্যকা, সাহসী যোদ্ধার গল্প আর স্বাধীনতার জন্য শতাব্দীব্যাপী সংগ্রামের ইতিহাস। সম্প্রতি তিন দিনের এক সফরে ঘুরে এলাম যুক্তরাজ্যের এই ঐতিহাসিক ভূখণ্ড। ভ্রমণটি ছিল শুধু নতুন জায়গা দেখার অভিজ্ঞতা নয়; বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ইতিহাসকে কাছ থেকে অনুভব করার এক অনন্য সুযোগ।

এই সফরকে আরও অর্থবহ করে তুলেছিলেন এডিনবরার স্থায়ী বাসিন্দা, লিবার্টন অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট কমিউনিটির কাউন্সিলর এবং স্কটল্যান্ডের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় কিশোরগঞ্জের সন্তান আবু মিরন। পুরো সফরজুড়ে তিনি শুধু পথপ্রদর্শক ছিলেন না, বরং ইতিহাসের জীবন্ত ব্যাখ্যাকার হয়ে প্রতিটি স্থানের গল্প, রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং স্কটিশ জাতিসত্তার বিবর্তন তুলে ধরেছেন অসাধারণ দক্ষতায়।

ইতিহাসের শহরে প্রথম পদচারণা

ট্রেনে করে এডিনবরা ওয়েভারলি স্টেশনে পৌঁছেই মনে হলো যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে অন্য এক যুগে এসে দাঁড়িয়েছি। স্টেশন থেকে বের হতেই চোখে পড়ে পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মহিমান্বিত এডিনবরা ক্যাসল। চারপাশে শত শত বছরের পুরনো পাথরের ভবন, সরু গলি, গথিক স্থাপত্য আর ইতিহাসের গাঢ় আবহ।

সন্ধ্যা নেমে আসায় প্রথম দিনটি কাটে আবু মিরনের আতিথেয়তায়। কিন্তু সেই সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় স্কটল্যান্ডের ইতিহাস, স্বাধীনতার আন্দোলন এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে দীর্ঘ আলাপ। মিরনের একটি কথা পুরো সফরের সারমর্ম হয়ে উঠেছিল- ‘স্কটল্যান্ডকে বুঝতে হলে শুধু জায়গা দেখলে হবে না, এর আত্মাকে বুঝতে হবে।’

এডিনবরা ক্যাসল : জাতিসত্তার প্রতীক

পরদিন সকালেই যাত্রা শুরু এডিনবরা ক্যাসলের পথে। আগ্নেয়গিরির কালো পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গ কেবল একটি পর্যটন আকর্ষণ নয়; এটি স্কটিশ জাতিসত্তা ও স্বাধীনতার প্রতীক। শত শত বছর ধরে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের সংঘাত, যুদ্ধ, অবরোধ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী এই দুর্গ। এখানেই সংরক্ষিত রয়েছে স্কটল্যান্ডের রাজমুকুট, রাজকীয় তলোয়ার এবং বিখ্যাত ‘স্টোন অব ডেসটিনি’, যার ওপর বসিয়েই একসময় স্কটিশ রাজাদের অভিষেক হতো। দুর্গের দেয়ালে দাঁড়িয়ে পুরো এডিনবরাকে দেখার অনুভূতি ছিল অবর্ণনীয়। মনে হচ্ছিল ইতিহাসের উচ্চতা থেকে বর্তমানকে দেখছি।

বিশ্বস্ততার এক অমর প্রতীক

এডিনবরার আরেকটি আবেগঘন আকর্ষণ গ্রেফ্রিয়ার্স ববি। ছোট্ট একটি স্কাই টেরিয়ার কুকুর, যার গল্প আজ কিংবদন্তি। মালিকের মৃত্যুর পর প্রায় ১৪ বছর ধরে সে প্রতিদিন মালিকের কবর পাহারা দিয়েছে। সেই ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততার স্মৃতিকে ধরে রাখতে নির্মিত হয়েছে তার ভাস্কর্য। আজও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা সেখানে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত হন।

 

হ্যারি পটারের জন্মভূমিতে

বিশ্বখ্যাত হ্যারি পটার সিরিজের সঙ্গে এডিনবরার সম্পর্ক গভীর। শহরের বিখ্যাত ক্যাফে ‘দ্য এলিফ্যান্ট হাউস’-এ বসেই লেখিকা জে কে রাউলিং তার জাদুকরী জগতের গল্প লেখা শুরু করেছিলেন। ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটের রঙিন দোকানপাট, রহস্যময় সরু গলি, পুরনো স্থাপত্য আর কুয়াশাচ্ছন্ন আবহ সহজেই বোঝায় কেন এই শহর তার কল্পনার জগৎকে এতটা প্রভাবিত করেছিল।

আইন, ধর্ম ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের গল্প

সেন্ট জাইলস ক্যাথেড্রাল, শেরিফ কোর্ট, হাইকোর্ট এবং অ্যাডভোকেটস ক্লোজ ঘুরতে ঘুরতে জানা যায় স্কটল্যান্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, তাদের নিজস্ব আইনব্যবস্থা। ইংল্যান্ডের সঙ্গে রাজনৈতিক ইউনিয়নে আবদ্ধ হলেও স্কটল্যান্ড আজও তার স্বতন্ত্র আইনি কাঠামো ধরে রেখেছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্মীয় সংস্কারের ইতিহাসেও সেন্ট জাইলস ক্যাথেড্রালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই জন নক্স স্কটিশ রিফরমেশন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

সফরের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল স্কটিশ পার্লামেন্ট ভবন পরিদর্শন

 

স্কটিশ পার্লামেন্ট : পুনর্জাগরণের প্রতীক

সফরের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল স্কটিশ পার্লামেন্ট ভবন পরিদর্শন। ১৭০৭ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড একীভূত হয়ে যুক্তরাজ্য গঠনের পর স্কটল্যান্ডের নিজস্ব সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রায় তিন শতাব্দী পর দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের ফল হিসেবে ১৯৯৯ সালে পুনরায় চালু হয় স্কটিশ পার্লামেন্ট।

ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে স্পষ্ট বোঝা যায়, এটি কেবল প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং স্কটিশ আত্মপরিচয় ও গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের প্রতীক। কাছেই অবস্থিত হলিরুডহাউস প্রাসাদ, যা স্কটল্যান্ডে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সরকারি বাসভবন। রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সহাবস্থান এখানে বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

আর্থারস সিট : শহরের বুকের ওপর এক আগ্নেয়গিরি

এডিনবরার হৃদয়ে অবস্থিত আর্থারস সিটে উঠে পুরো শহরকে যেন পোস্টকার্ডের ছবির মতো লাগে। প্রাচীন আগ্নেয়গিরির এই পাহাড় ঘিরে রয়েছে নানা কিংবদন্তি। অনেকে মনে করেন, কিং আর্থারের নাম থেকেই এর নামকরণ হয়েছে। পাহাড়ের চারপাশে কুইন্স ড্রাইভ ধরে ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ে ছোট ছোট হ্রদ, রাজহাঁস আর সবুজ প্রকৃতির অপূর্ব সমাহার।

রয়্যাল মাইল : মধ্যযুগের পথে হাঁটা

রয়্যাল মাইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় যেন মধ্যযুগীয় ইউরোপে ফিরে গেছি। এডিনবরার ওল্ড টাউন আর নিউ টাউন যেন দুটি ভিন্ন সময়ের প্রতিচ্ছবি। ওল্ড টাউন বহন করছে মধ্যযুগের স্মৃতি, আর নিউ টাউন তুলে ধরছে আঠারো শতকের আধুনিক নগর পরিকল্পনার সৌন্দর্য। এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণেই পুরো এলাকা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

সাহিত্য ও দর্শনের শহর

এডিনবরা শুধু রাজনীতি কিংবা ইতিহাসের শহর নয়; এটি সাহিত্য ও চিন্তারও শহর। বিখ্যাত লেখক ওয়াল্টার স্কটের স্মরণে নির্মিত স্কট মনুমেন্ট শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থাপনা। তার সাহিত্য স্কটিশ ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছে। একইভাবে শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েলের স্মৃতিও এই শহরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

প্রকৌশলের বিস্ময় : ফলকার্ক হুইল ও কেলপিস

তৃতীয় দিনে যাত্রা করি ফলকার্ক অঞ্চলে। সেখানে অবস্থিত ফলকার্ক হুইল পৃথিবীর একমাত্র ঘূর্ণায়মান বোট লিফট, যা আধুনিক প্রকৌশলের এক অনন্য বিস্ময়। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে ‘দ্য কেলপিস’Ñ বিশাল দুটি স্টিলের ঘোড়ার মাথা। স্কটিশ লোককাহিনী, শিল্পবিপ্লব এবং ঘোড়ানির্ভর পরিবহন ইতিহাসের প্রতীক হিসেবে এগুলো আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

স্বাধীনতার বীর উইলিয়াম ওয়ালেস

স্টার্লিং ক্যাসল স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কাছেই অবস্থিত উইলিয়াম ওয়ালেস স্মৃতিস্তম্ভ। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য তার আত্মত্যাগ আজও স্কটিশ জনগণের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। ‘ব্রেভহার্ট’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার সংগ্রামের গল্প বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে।

ফোর্থ নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ‘থ্রি ব্রিজেস’ এর সামনে লেখক

 

তিন সেতুর গল্প

ফোর্থ নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ‘থ্রি ব্রিজেস’ যেন তিন যুগের প্রকৌশল ইতিহাসকে এক ফ্রেমে ধারণ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর রেলসেতু, বিংশ শতাব্দীর সড়ক সেতু এবং আধুনিক যুগের নতুন সেতু- সব মিলিয়ে এটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক অনন্য প্রতীক। ফেরার পথে এডিনবরা বিমানবন্দরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, এই সফর শুধুই একটি ভ্রমণ ছিল না। এটি ছিল ইতিহাস, স্বাধীনতা, সাহিত্য, রাজনীতি এবং মানুষের আত্মপরিচয়কে কাছ থেকে দেখার এক বিরল সুযোগ।

শেয়ার করুন-      

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com