দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। দৈনিক গড়ে আক্রান্ত হচ্ছে এক হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ।
দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। দৈনিক গড়ে আক্রান্ত হচ্ছে এক হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামকে শুধু শিশুদের রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবারের এক সদস্য আক্রান্ত হলে দ্রুত অন্য সদস্যদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
সর্বশেষ গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে আরো সাতটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের চারজন ঢাকার, একজন চট্টগ্রামের, একজন ময়মনসিংহের এবং একজন খুলনার বাসিন্দা। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২৮৭ জন। গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার কালের কণ্ঠকে বলেন, আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমেই পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো শিশু আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে যথাযথভাবে আলাদা না রাখলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও দ্রুত আক্রান্ত হতে পারেন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে ৫২৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরো ৯১ শিশু। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২০ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৭৯ হাজার ১২ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এ সময় ৬৪ হাজার ২৬৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের ৬০ হাজার ৮৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ছয় হাজার ৯৩৪ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছে রাজধানীর ডিএনসিসি কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৪১ জন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ৩২৮ জন। হাসপাতালটিতে ভর্তি হওয়া পাঁচ হাজার ৮১১ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬৪ শতাংশ, এর মধ্যে ছয় মাসের কম বয়সী রোগী ছিল ৩৫৯ জন (৬.১৭ শতাংশ), ৭ থেকে ৯ মাস বয়সী ৬৯৪ জন (১১.৯৪ শতাংশ), ১০ মাস থেকে দুই বছর বয়সী এক হাজার ৪৭১ জন (২৫.৩১ শতাংশ), দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক হাজার ১৯৪ জন (২০.৫৪ শতাংশ)।
বিশ্লেষণে আরো দেখা গেছে, প্রতি তিন রোগীর একজনের বয়স পাঁচ বছরের বেশি। অর্থাৎ সংক্রমণ শুধু ছোট শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী ৭৬৮ জন (১৩.২১ শতাংশ) এবং ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৪১৭ জন (৭.১৭ শতাংশ)। অন্যদিকে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগী ছিল ৫৮৪ জন (১০.০৫ শতাংশ) এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী রোগী ছিল ৩২৪ জন (৫.৫৭ শতাংশ)। অর্থাৎ ১৫ বছরের বেশি বয়সী রোগীর সংখ্যা মোট রোগীর প্রায় ১৫.৬ শতাংশ, যা প্রতি ছয়জনে একজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১৩২ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তার আগের পাঁচ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। কয়েক মাসে আক্রান্ত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত নজরদারি তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৭ সালে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১০ শিশু, ২০১৮ সালে আরো ছয় শিশু এবং ২০২০ সালে বান্দরবানে সাত শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তবে এবারের মতো এত ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা আগে দেখা যায়নি।
জাতিসংঘ বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ মে পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলাতেই ৫৭ হাজার ৮৫৬ জন সন্দেহভাজন এবং আট হাজার ৬৭ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের ৮১ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখানে ৫৯৫ জন সন্দেহভাজন এবং ৬০ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
আক্রান্তদের ৬৩ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে ২০ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে, যারা নিয়মিত এমআর টিকার আওতায় ছিল না। কেন আক্রান্ত হচ্ছেন বড়রা : ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে বর্তমানে ৪২ জন প্রাপ্তবয়স্ক হাম রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বান্দরবানের লামা থেকে আসা ৩৫ বছর বয়সী হাসান মাহমুদ সুমনও আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। পরিবারের সদস্যরা জানান, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, অনেকেই মনে করেন হাম শুধু শিশুদের রোগ। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিত প্রাপ্তবয়স্ক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। তাঁর মতে, যারা শৈশবে টিকা নেননি, টিকার পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করেননি, আগে কখনো হামে আক্রান্ত হননি অথবা যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাদের ঝুঁকি বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, আইসোলেশনে রাখা এবং পরিবারভিত্তিক সতর্কতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় শিশুদের পাশাপাশি বড়দের মধ্যেও হামের বিস্তার আরো বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ঈদের আগে ও পরে সংক্রমণের হার কিছুটা কমেছে, যা ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। সম্প্রতি পরিচালিত টিকাদান কর্মসূচির পূর্ণ প্রভাব দেখতে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ টিকা নেওয়ার পর শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে।