সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য মানে অন্ধকারে যাত্রা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬
  • ২২ বার পড়া হয়েছে
মানুষের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের জন্য আমরা কমবেশি প্রস্তুতি গ্রহণ করি। শিশুর জন্মের আগে পরিবার প্রস্তুতি নেয়, শিক্ষাজীবনের জন্য পরিকল্পনা করা হয়, কর্মজীবনের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়, এমনকি অবসরজীবনের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও অনেকে সঞ্চয় করেন।

কিন্তু জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ অধ্যায়—বার্ধক্যের জন্য আমাদের প্রস্তুতি খুবই সীমিত। ফলে অনেকের কাছে বার্ধক্য যেন অন্ধকারে যাত্রার শামিল হয়ে দাঁড়ায়। 

আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ বার্ধক্যকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দেন। কেউ মনে করেন, পর্যাপ্ত অর্থ-সম্পদ থাকলেই বার্ধক্যের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

আবার কেউ সন্তানদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে থাকেন। বাস্তবতা হলো, অর্থ কিংবা পারিবারিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো বার্ধক্যের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার নিশ্চয়তা নয়। সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি এবং সক্রিয় জীবনযাপনের মানসিকতা। 

সক্রিয় বার্ধক্যের অন্যতম শর্ত হলো শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা।

আমরা শারীরিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে যতটা আগ্রহী, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে ততটাই উদাসীন। অথচ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একাকিত্ব, অবসাদ, উদ্বেগ, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মসম্মানবোধের সংকট অনেক প্রবীণের জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। এসব বিষয়ে সচেতনতা ও প্রস্তুতির অভাব তাঁদের জীবনকে আরো কঠিন করে তোলে। 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি শিশুকে আমরা ছোটবেলা থেকেই নানা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করি। তাকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ একযোগে কাজ করে।

কিন্তু একজন মানুষ যখন বার্ধক্যে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর জন্য কোনো নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং বা প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি প্রায় নেই বললেই চলে। কিভাবে বয়সজনিত পরিবর্তন মেনে নিতে হবে, কিভাবে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে, কিভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে কিংবা কিভাবে একাকিত্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে—এসব বিষয়ে খুব কম মানুষই কোনো দিকনির্দেশনা পান। 

আমাদের মনে রাখতে হবে, বার্ধক্য একটি ব্যক্তিগত যাত্রা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু বার্ধক্যের অনেক বাস্তবতা একজন মানুষকে নিজেকেই মোকাবেলা করতে হয়। তাই বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বিলাসিতা নয়, বরং জীবনের অপরিহার্য দায়িত্ব।

সম্প্রতি মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং শাস্তির দাবি জানিয়েছে। প্রবীণদের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতনের ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগজনক এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে মা-বাবার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ বিদ্যমান। আইন অনুযায়ী কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার বিচার হওয়া উচিত। তবে কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও সব পক্ষের বক্তব্য শোনার আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া সমাজের জন্য ইতিবাচক নয়। যদি প্রতিটি পারিবারিক সংকটকে আমরা শুধু সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হলে তার প্রভাব সমাজের ওপরও পড়ে, যা দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি প্রবীণ মানুষ পরিবারে বসবাস করেন। অন্যদিকে বৃদ্ধাশ্রম ও প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী প্রবীণের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে আমাদের সমাজে পরিবার এখনো প্রবীণদের প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে পারিবারিক সম্পর্ককে সার্বিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না করে পরিবারকে আরো সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

সময়ের দাবি হলো বার্ধক্যকে শুধু বয়সের বিষয় হিসেবে না দেখে জীবনব্যাপী প্রস্তুতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। আর্থিক সঞ্চয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যসচেতনতা, মানসিক প্রস্তুতি, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং পারিবারিক সম্পর্কের যত্ন। আজকের প্রস্তুতিই আগামী দিনের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের ভিত্তি। কারণ প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য সত্যি অন্ধকারে যাত্রার শামিল।

 

লেখক : প্রবীণ বিষয়ে লেখক ও সংগঠক

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com