(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৯)
অন্যদিকে সুরা বাকারাহর ৬৭-৭১ আয়াতের নির্দেশনা কোরবানির পশু নির্বাচনের মানদণ্ড হতে পারে—মধ্যম বয়সী, হলুদ উজ্জ্বল গাঢ় বর্ণের, আকর্ষণীয় ও দর্শকনন্দিত, পরিশ্রম ক্লান্ত না হওয়া, সুস্থ ও নিখুঁত হওয়া।
গ্রহণযোগ্য মূল্যমানকে ন্যায্যমূল্য (ঋধরৎ ঠধষঁব) বলে। উৎপাদন খরচ ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের সঙ্গে এতে সামঞ্জস্যপূর্ণ মুনাফা (ত্বধংড়হধনষব ঢ়ত্ড়ভরঃ) এমনভাবে যুক্ত, যেখানে ক্রেতা বা বিক্রেতা কেউই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
মুক্তবাজার ব্যবস্থায় অতি মুনাফার প্রতিযোগিতা এবং সিন্ডিকেট বাণিজ্যে তৈরি হচ্ছে অস্থিতিশীলতা। অথচ আল-কোরআনের নির্দেশনা—‘হে বিশ্বাসীরা তোমাদের যে হালাল রিজিক দেওয়া হয়েছে তা থেকে খাও…।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৭২)
প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মুত্তাকি, সত্যবাদী ও পুণ্যবান ব্যবসায়ী ছাড়া অপর সব ব্যবসায়ী ফাসিক (দুরাচারী) হয়ে উঠবে।’ (তিরমিজি)
স্বাস্থ্যসম্মত মাংস উৎপাদন ও মোটাতাজাকরণে গবাদি পশুর প্রধান খাদ্য সবুজ ঘাস, খড়, খইল, ভুসি, ভুট্টা, মটর, খেসারি, যব, ঝোলাগুড় ইত্যাদি।
কোরবানির মৌসুমি ব্যবসায়ে অনৈতিকতার অন্যতম হলো : মিথ্যা শপথ, কালোবাজারি, কৃত্রিম সংকট তৈরি, সরবরাহ ধারায় বিঘ্ন সৃষ্টি ইত্যাদি। এসবই হারাম। মহান আল্লাহর নির্দেশ—‘হে ঈমানদাররা, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না, শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ।
(সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
ব্যবসায়ের মূলধন—সততা, বিশ্বস্ততা, সুনাম ও মানবকল্যাণ। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা ক্রেতাকে প্রতারিত করবার ইচ্ছায় দাম বাড়াবে না।’ (তিরমিজি)
তিনিই (সা.) বলেন, ‘যে অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করে, তার সবটুকু দান করে দিলেও কবুল হবে না…।’ (মেশকাত)
দাম চড়িয়ে মুনাফা লাভের অপকৌশল ‘ইহতিকার’ বা মজুদদারির ঘটনা ঘটে কোরবানির পশু কেনাবেচায়। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘পণ্যদ্রব্য আটক করে অধিক মূল্যে বিক্রয়কারী অবশ্যই পাপী।’ (মুসলিম)
তিনি (সা.) বলেন, ‘মজুদদার…জিনিসের দাম কমলে চিন্তায় পড়ে আর বাড়লে তার আনন্দ বাড়ে।’ (বাইহাকি)
ইসলাম দালালি বা মধ্যস্বত্বভোগ ও প্রতিবন্ধকতা সমর্থন করে না। আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কাছ থেকে খাদ্য ক্রয় করতাম। এতে রাসুলুল্লাহ (সা.) খাদ্য বাজারে পৌঁছানোর আগে আমাদের তা ক্রয় করতে নিষেধ করলেন।’ (বুখারি)
ইসলাম চায় না, ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ প্রসঙ্গে হাদিস, ‘একদা এক ব্যক্তি এসে রাসুল (সা.)-কে বলল, হে আল্লাহর রাসুল। আমাদের দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিন।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহই সংকোচন ও সম্প্রসারণকারী। আমি অবশ্যই এমনভাবে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই যে আমার পক্ষে কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম থাকবে না।’ (আবু দাউদ)
প্রিয় নবী (সা.) আরো বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহই হচ্ছেন মূল্য নির্ধারণকারী, তিনি সংকোচন ও সম্প্রসারণকারী এবং তিনিই রিজিকদাতা।’ (তিরমিজি)
পরিশেষে, কোরবানির পশুর ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.)-এর বক্তব্যটি বিবেচনার দাবি রাখে : ‘মূল্য নির্ধারণ করা ছাড়া যদি মানুষের কল্যাণ সাধন সম্ভব না হয়, তাহলে শাসক তাদের জন্য ন্যায়সংগত মূল্য নির্ধারণ করে দেবেন। কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বা কারো প্রতি অন্যায় করা যাবে না। আর মূল্য নির্ধারণ ছাড়াই যদি তাদের প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায় এবং কল্যাণ সাধিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান মূল্য নির্ধারণ করবেন না।’ (আত-তুরুকুল হুকুমিইয়াহ ফিস-সিয়াসাতিশ শারইয়্যাহ)
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর